Published : 09 Jul 2026, 09:57 PM
টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিতে পাহাড় ধস ও সড়ক যোগাযোগ সাময়িক বিছিন্নতার মধ্যে পাহাড়ি এলাকার মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট পাওয়া যাচ্ছে না।
বান্দরবানে কোনো কোনো উপজেলায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। শহর এলাকাতেও কিছু মোবাইল নেটওয়ার্কের সিগন্যাল দেখালেও ফোন করা যাচ্ছে না। কোনো রকমে সংযোগ পাওয়া গেলেও কথা বলা যায় না বলে গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন।
ফলে দুর্যোগের সময় তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে জরুরি খবরাখবর পাঠানো যাচ্ছে না। কোনো তথ্য ঠিকভাবে সংগ্রহ করতে পারছে না সংবাদকর্মীরা।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শহরে টেলিটক ও রবি নেটওয়ার্ক ছিল না। পাহাড়ি এলাকার যে কোনো জায়গায় আনাচে-কানাচে আগে থেকে এই দুটি মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু রয়েছে। এর গ্রাহকও বেশি। কিন্তু এবার ভারি বৃষ্টির দিন থেকে শহর এলাকা ও কয়েকটি উপজেলায় বেশ ভোগান্তিতে পড়েছেন এর গ্রাহকরাও।
ভোগান্তির কথা তুলে ধরে সমকালের সাংবাদিক উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “বুধবার রাত থেকে শহরে বালাঘাটা এলাকায় কোনো বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ না থাকলে মোবাইল ইন্টারনেট ও ওয়াইফাইয়ের মত সব যোগাযোগের মাধ্যম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জরুরি প্রয়োজনে শহরে এসে যে কাজ করবে সে উপায়ও নেই।
“বালাঘাটার সড়কে পুলিশ লাইন্স ও ব্রিগেড এলাকায় বুকসমান পানি। নৌকায় করে চলাচল করতে হচ্ছে। আজকে সকালেও অর্ধেক ভ্যান আর অর্ধেক নৌকায় করে ইন্টারনেট না থাকায় শহরে এসে কাজ করতে হয়েছে।”

দুপুরের পর রবি নেটওয়ার্ক আসলেও হঠাৎ করে চলে যায়; আবার হঠাৎ সচল হয়। সারাদিন এভাবে ছিল রবি মোবাইল নেটওয়ার্কটি।
শহর ছাড়া সবকটা উপজেলাতে রয়েছে গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক। এবার উপজেলা ছাড়া শহর এলাকাতে পুরাপুরি সচল ছিল গ্রামীণ ফোনের নেটওয়ার্কটি। বাংলালিঙ্ক মোবাইল নেটওয়ার্কও শুধু শহরে পৌর এলাকাতেই রয়েছে। শহরের বাইরে কোথাও এর নেটওয়ার্ক নেই। তবে দুর্যোগের সময় থেকে শহর এলাকায় গ্রামীণফোন ও বাংলালিঙ্কের মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি সচল রয়েছে। ইন্টারনেটও সচল ছিল।
কিন্তু শুরু থেকে নেটওয়ার্কজনিত সমস্যায় পড়েছে কয়েকটি উপজেলার টেলিটকের গ্রাহকরা। এখনও পর্যন্ত রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদম উপজেলায় টেলিটক নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কয়েক দিন ধরে এসব উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে টেলিটক নম্বরে কোনোভাবে মোবাইলে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। কারও সঙ্গে অন্য কোনো মোবাইল নেটওয়ার্কে যোগাযোগ করতে পারলেও পরে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
শহর থেকে সবচেয়ে কাছের উপজেলা রোয়াংছড়ি। জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব ১৯ কিলোমিটার। উপজেলা সদরে রবি, টেলিটক, এয়ারটেল ও গ্রামীণফোন নেটওয়ার্ক চালু রয়েছে। বৈরি আবহাওয়ার কারণে টানা তিন দিন ধরে সেখানে কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। শহরের কাছে কালাঘটা ও রামজাদি এলাকায় সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়ায় কোনো যানবাহনও চলাচল করতে পারছে না সেখানে।
রোয়াংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহ্লাঅং মারমা দুপুরে বলেন, “মঙ্গলবার থেকে গোটা উপজেলার কোথাও মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। কোথায় কী হয়েছে, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। একদম বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

“প্রশাসনের দুর্যোগকালীন কাজ সব থেমে আছে। এখন কথা বলার জন্য বৃষ্টির মধ্যেও বাইক চালিয়ে উপজেলার সদরের বাইরে দূরে একটা পাহাড়ে চলে আসছি। এখানে টেলিটক নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে। চিম্বুক পাহাড় টাওয়ার দিয়ে বোধহয় কোনো রকমে নেটওয়ার্ক কাজ করছে।”
রুমা সাঙ্গু কলেজের অধ্যক্ষ স্ইুপ্রুচিং মারমা বলেন, রুমা উপজেলায় রবি, টেলিটক ও গ্রামীণ ফোনের নেটওয়ার্ক রয়েছে। তবে কয়েক দিন হল টেলিটক নেটওয়ার্ক খুব সমস্যা করছে। নেটওয়ার্ক হঠাৎ করে আসে, আবার হঠাৎ করে চলে যায়। টেলিটকে নেটওয়ার্ক থাকলেও ঠিকমত কথা বলা যায় না।
আলীকদম উপজেলার কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “ভারি বৃষ্টির কারণে এখানেও একই অবস্থা। নিজের ঘর পর্যন্ত পানি ওঠেছে। মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও টেলিটক নেটওয়ার্ক নাই। ইন্টারনেট না থাকায় এলাকার কোনো নিউজ পর্যন্ত পাঠানো যাচ্ছে না। এখন আপাতত বৃষ্টি হচ্ছে না। আজকের মধ্যে বৃষ্টি না হলে পানি নেমে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।”
থানচি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “দুর্যোগের মধ্যে উপজেলার সব কাজ স্থবির হয়ে আছে। নিজেরাই দৌড়াদোড়ি করে খবর নিতে হচ্ছে। কেউ কোনো সমস্যায় আছে কিনা সশরীরে গিয়ে দেখতে হচ্ছে। কোথাও নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না। টেলিটক মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। যেখানে নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে আমাদেরর পক্ষেও কিছু করার নেই।

“গতকাল বলিপাড়ায় গেলাম নদীপথে। যাওয়ার আগে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। সেখানে দুইটা জায়গায় পাহাড়ধস হয়েছে। ত্রাণবাহী গাড়ি ছিল। সড়কপথে গিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের নিয়ে নদীপথে গিয়ে দিতে হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ১০ কেজি চাল, এক লিটার তেল, লবণ, হলুদ এবং মরিচ দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে যারা উপস্থিত ছিল তাদের সাবইকে দেওয়া হয়েছে। গতকাল বলিপাড়া এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রে ৮০ পরিবারের মত ছিল।”
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বৃহস্পতিবার দুপুরে একটু করে বিদ্যুৎ আসছিল। আধঘণ্টার বেশি ছিল না। আবার চলে গেছে। অফিসে আপাতত মোবাইল পাওয়ার ব্যাংক ও একটা আইপিএস আছে। সেটা দিয়ে মোবাইল চার্জ দিয়ে কোনোরকমে সামলাতে হচ্ছে। অন্য অফিসের অনেকেই এখানে এসে মোবাইল চার্জ করে কাজ সামলাচ্ছেন।”
মোবাইল নেটওয়ার্কজনিত সমস্যার ব্যাপারে বৃহস্পতিবার দুপুরে কথা হয় বান্দরবান অঞ্চলে টেলিটক মোবাইল নেটওয়ার্ক অপরাশেনের দায়িত্বে থাকা শহিদুল ইসলামের সঙ্গে।
তিনি বলেন, “বান্দরবানে চিম্বুক পাহাড়ের টাওয়ারে পাওয়ার সমস্যার কারণে গ্রাহকরা নেটওয়ার্ক পাচ্ছেন না। এগুলো নিয়ে কারিগরি টিম কাজ করছে। দুর্যোগ পরিস্থিতির কারণে আমাদেরও কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। চিম্বুক টাওয়ারটা ঠিক হয়ে গেলে রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদমের নেটওয়ার্ক পেতে আর সমস্যা হবে না। তবে দুর্গম এলাকায় পুরোপুরি টেলিটক নেটওয়ার্ক পেতে আরও কিছু দিন সময় লাগবে।”

গ্রামীণ ফোনের জেলা ডিস্ট্রিবিউটর আজহারুল ইসলাম বাবুল বলেন, “দুর্যোগকালে এবার গ্রামীণ ফোনই সবচেয়ে ভাল সার্ভিস দিচ্ছে। বিদ্যুৎ সমস্যা ছাড়া নিরবচ্ছিন্নভাবে নেটওয়ার্ক সচল রয়েছে। শহরে বালাঘাটা এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় আপাতত বন্ধ রয়েছে। অন্যান্য উপজেলাতেও শুধু বিদ্যুতের কারণে নেটওয়ার্ক বন্ধ। অন্য কোনো সমস্যা নাই। ২০২৩ সালের পর থেকে গ্রামীণ ফোনের নেটওয়ার্কের মেশিনারি সবকিছু আপডেট করা হয়েছে।”
পিডিবির বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন বলেন, রুমা মুরুংগু বাজার এলাকায় বিদ্যুতের খাম্বা ও তার পড়ে আছে। পাহাড় ধসে রাস্তা বন্ধ হওয়ায় সেখানে যাওয়া যাচ্ছে না। থানচিতে একই অবস্থা। তবে রোয়াংছড়িতে সীমিত আকারে বিদ্যুৎ চালু আছে। শহরে বালাঘাটা এলাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। অনেকের মিটার ও বিদ্যুতের তার পানি নিচে আছে। সে কারণে চালু করা যাচ্ছে না। একই কারণে শহরে ইসলামপুর ও আর্মি পাড়া এলাকাতেও বিদ্যুৎ বিতরণ বন্ধ রয়েছে।

সড়ক যোগাযোগও বন্ধ
এদিকে টানা চার দিন ভারি বৃষ্টির পর বৃহস্পতিবার সকালে শহরে ঝলমলে রোদ দেখা যায়। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে আবার বৃষ্টি নেমে আসে। শহরে নিম্নাঞ্চল এলাকা বালাঘাটা পুলিশ লাইন, ব্রিগেড এলাকা ও কালাঘাটার রোয়াংছড়ি ব্রিজ ডুবে আছে। ফলে জেলা শহর থেকে রাঙ্গামাটি এবং রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
বালাঘাটা এলাকায় স্থানীয়দের ভ্যান ও নৌকায় করে চলাচল করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় জেলা শহর থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার সড়ক যোগাযোগও সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। দূরপাল্লার কোনো যানবাহন চলাচল করছে না। তবে অনেককেই অর্ধেক নৌকায় করে, অর্ধেক গাড়িতে করে ভেঙে ভেঙে যেতে দেখা গেছে।
রুমা-থানচি বাস পরিবহনের লাইনমন্যান নুরুল ইসলাম মিলন বলেন, বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় এবং কোথাও কোথাও পানি বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। শহর থেকে রুমা গাড়ি চলাচল দুদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বুধবার থানচিতে বাস গেছে। কোনোরকমে বলিপাড়া পর্যন্ত গেছে। সেখানে বাগান পাড়ায় এলাকা পানির কারণে যাত্রীরা নৌকায় করে পার হতে হয়েছে। বৃষ্টি বন্ধ হলেও রাস্তা ভাল না হওয়া পর্যন্ত আপাতত বাস চলাচল করতে পারবে না।
সার্বিক বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক মো. সামিউল ফেরদৌসকে টেলিটক নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।