২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

স্মৃতিভ্রংশ রোগের ঝুঁকি কমাতে ৬ নিয়ম

মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয় থেকে রক্ষা পেতে চাইলে, সময় থাকতেই সাবধান হতে হবে।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 21 Sep 2026, 10:45 AM

Updated : 21 Sep 2026, 11:58 AM

বার্ধক্যের কোঠায় পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের মাঝে এক নীরব ও মারাত্মক চিকিৎসাগত জটিলতা দেখা দেয়, যার নাম ‘ডিমেনশা’ বা স্মৃতিভ্রম রোগ।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি কেবল সাধারণ ভুলে যাওয়ার রোগ নয়; বরং এটি হল মস্তিস্কের এমন এক দীর্ঘমেয়াদি অবক্ষয় যা মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা, জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া, সাধারণ হিসাবনিকাশ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক স্নায়ুতন্ত্রকে পুরোপুরি অবশ করে দেয়।

অনেকেই ভাবেন, বয়স বাড়লে ডিমেনশা হওয়া একটি অবধারিত নিয়তি, যা আধুনিক নিউরোসায়েন্সের দৃষ্টিতে ভুল ধারণা।

মস্তিস্কের কোষ বা নিউরনের যত্ন নেওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত গভীর ঘুম এবং কায়িক শ্রমের মাধ্যমে মস্তিস্কের ক্ষয় রুখে, প্রখর রাখা সম্ভব।

স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি কমাতে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে মস্তিস্ক তরুণ রাখার ৬টি নিয়ম নিচে তুলে ধরা হল।

সামগ্রিকভাবে সুস্থ জীবনযাপন করা: মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য অনেকটাই সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, ওজন ও হৃদ্-স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

ভালো মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য বলতে শুধু স্মৃতিশক্তি ভালো থাকাকে বোঝায় না। সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান, শেখা, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা, অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও এর অংশ।

তাই প্রতিদিনের জীবনে স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খাওয়া: মস্তিষ্ক ভালো রাখতে খাবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের ফল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ রাখতে পারেন। মাছসহ ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস-সমৃদ্ধ খাবারও উপকারী।

বিশেষ করে বিভিন্ন রংয়ের ফল ও শাকসবজিতে থাকা ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে জারণজনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্য-ধারার মতো খাদ্যাভ্যাস— যেখানে বেশি থাকে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, মাছ ও স্বাস্থ্যকর চর্বি; এগুলো মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

অন্ত্রের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া: অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে বলা হয় অন্ত্র-মস্তিষ্ক অক্ষ।

অন্ত্রের উপকারী জীবাণুগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলে শরীরে প্রদাহসহ বিভিন্ন পরিবর্তন হতে পারে। এ কারণে অন্ত্রের সুস্থতা সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং সম্ভবত মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

অন্ত্র ভালো রাখতে খাদ্যতালিকায় আঁশযুক্ত খাবার বাড়াতে হবে। শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ নিয়মিত খেতে পারেন। দই ও অন্যান্য উপকারী ফারমেন্টেড খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

তবে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ও ডিমেনশা’র সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান। তাই এটিকে স্মৃতিভ্রংশ প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা: নিয়মিত ব্যবহারের মাধ্যমে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে। নতুন কিছু শেখা, বই পড়া, লেখালেখি করা, বাদ্যযন্ত্র শেখা, নতুন ভাষা শেখা বা বুদ্ধিবৃত্তিক খেলায় অংশ নেওয়া মস্তিষ্ককে চ্যালেঞ্জ দিতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নিউরোপ্লাস্টিসিটি— অর্থাৎ অভিজ্ঞতা, শেখা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগ পরিবর্তন ও নতুন সংযোগ তৈরির ক্ষমতা।

তাই বয়স বাড়লেও শেখা বন্ধ করা যাবে না। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করা উপকারী।

নিয়মিত শরীরচর্চা করা: ব্যায়াম শুধু শরীরের জন্য নয়, মস্তিষ্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার, হালকা দৌড় বা অন্যান্য নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম রক্তসঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছায় ভালোমতো।

নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের কার্যকারিতা ভালো রাখতে এবং স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি ধরে রাখতে সহায়ক।

তাই দীর্ঘ সময় বসে না থেকে প্রতিদিন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটা বা অন্য কোনও ব্যায়াম করার অভ্যাস গড়া উপকারী।

পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুম নিশ্চিত করুন: ঘুম মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের শেখা ও অভিজ্ঞতার কিছু স্মৃতি সংহত করে। একই সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বর্জ্য অপসারণ প্রক্রিয়াতেও ঘুম ভূমিকা রাখে।

প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে ৭–৯ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। শুধু কত ঘণ্টা ঘুমালেন তা নয়, ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও জাগা, রাতে অতিরিক্ত মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহার কমানো এবং আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ তৈরি করা ভালো ঘুমে সাহায্য করতে পারে।

আজ থেকেই শুরু হোক ছোট পরিবর্তন

‘ডিমেনশা’ বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করার নিশ্চয়তা কোনও জীবনযাপন পদ্ধতি দিতে পারে না। তবে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মস্তিষ্কের পাশাপাশি হৃদ্-যন্ত্র ও পুরো শরীরের জন্যই উপকারী।

তাই একসঙ্গে সবকিছু পরিবর্তন করার চেষ্টা না করে ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়ে শুরু করতে হবে। প্রতিদিন একটু হাঁটা, খাবারে বেশি শাকসবজি যোগ করা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নতুন কিছু শেখার মতো অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

মস্তিষ্কের যত্ন মানে শুধু স্মৃতি ধরে রাখা নয়, সুস্থ ও স্বনির্ভর জীবনকে দীর্ঘায়িত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।

পুরানো খবর:

মধ্যবয়সের মানসিক সংকট সামলানোর তিন পন্থা

পুরানো খবর:

একসঙ্গে খেলে যে উপকার মেলে

পুরানো খবর:

মস্তিষ্ক তরুণ রাখার সহজ ৫টি অভ্যাস