৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

দীর্ঘায়ু ও সুস্থ বার্ধক্যের বিষয়ে প্রচলিত ৬টি ভুল ধারণা

বয়স বাড়লেই শরীর-মন দুর্বল হবে এমন বিষয় যেমন সত্য না তেমনি দামি ‘ওয়েলনেস রুটিন’ বা কৃত্রিম সাপ্লিমেন্টেরও প্রয়োজন পড়ে না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 31 Oct 2026, 04:05 PM

Updated : 31 Oct 2026, 04:05 PM

বয়স বাড়লেই কম ঘুম, দুর্বল পেশি বা একাকিত্ব অনিবার্য নয়। দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে প্রয়োজন নিয়মিত, শরীরচর্চা, সুষম খাবার ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ।

বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীর ও জীবনে নানান পরিবর্তন আসে। আগের মতো দ্রুত চলাফেরা করা কঠিন হতে পারে, ঘুমের ধরন বদলাতে পারে, আবার কর্মজীবন থেকে অবসর বা প্রিয়জনকে হারানোর কারণে সামাজিক যোগাযোগও কমে যেতে পারে।

তবে এসব পরিবর্তনের সবই যে অনিবার্য, তা নয়। 

বয়স বাড়লে কম ঘুমালেই চলে, এ ধারণা ভুল

অনেকে মনে করেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের প্রয়োজন কমে যায়। তবে বয়স্কদেরও প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।

বয়স বাড়লে ঘুমের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। ঘুমাতে বেশি সময় লাগা, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা ভোরে তাড়াতাড়ি জেগে ওঠার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

শরীরে ঘুম নিয়ন্ত্রণে প্রভাব রাখা মেলাটোনিন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়াও এর একটি কারণ হয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রবীণদের চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ ট্রেসি লিপার্ড রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “বয়স বাড়ছে বলে ঘুমের সমস্যা হওয়াকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পর্যাপ্ত ঘুম স্মৃতি সংরক্ষণ ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। ঘুমের সময় মস্তিষ্কের বর্জ্য পদার্থ অপসারণের প্রক্রিয়াও প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও হৃদযন্ত্রের সমস্যার সঙ্গেও অপর্যাপ্ত ঘুমের সম্পর্ক রয়েছে।”

বয়স বাড়লেই পেশি দুর্বল হবে,এমন নয়

বয়সের সঙ্গে পেশির ভর ও শক্তি কমতে পারে। সাধারণত ত্রিশের পর থেকে এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে শুরু হয়।

তারমানে এই নয় যে, বয়স বাড়লে সবাইকে দুর্বল হয়ে পড়তেই হবে। শারীরিক সক্রিয়তা, খাবারের ধরন, সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার ওপর পেশির শক্তি অনেকটাই নির্ভর করে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইএইচই হেলথের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা রবার্ট নিল মিলস এই বিষয়ে বলেন, “বয়স বাড়ার সঙ্গে পেশির শক্তি কমে যাওয়ার গতি অনেকাংশে জীবনযাপনের অভ্যাসের মাধ্যমে ধীর করা সম্ভব।”

এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আমিষ গ্রহণ এবং নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ। পেশির গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণে আমিষ প্রয়োজন। তাই খাবারে মাছ, ডিম, দুধ, ডাল ও অন্যান্য উপযুক্ত আমিষসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে।

শক্তি ধরে রাখতে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যায়াম শুরু করা দরকার। বসা থেকে উঠে দাঁড়ানো, শরীরের ওজন ব্যবহার করে ব্যায়াম করা বা উপযুক্ত হালকা ভার তুলে অনুশীলন করা যেতে পারে।

বসে থাকার সময় কমিয়ে নিয়মিত হাঁটাও উপকারী। কাঁধ ও বাহুর পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়ামের পাশাপাশি পায়ের পেশির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

তবে আগে থেকেই কোনও রোগ বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলে ব্যায়ামের ধরন চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা ভালো।

একসঙ্গে কঠিন ব্যায়াম শুরু না করে অল্প থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তোলাই নিরাপদ।

শরীরের সব ধরনের প্রদাহ ক্ষতিকর নয়

প্রদাহ শব্দটি শুনলেই অনেকে একে শরীরের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন। অথচ প্রদাহ শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি অংশ।

আঘাত লাগলে, সংক্রমণ হলে বা পেশিতে টান পড়লে শরীর প্রদাহের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানকে রক্ষা করার চেষ্টা করে।

এই প্রক্রিয়ায় রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, ক্ষতিগ্রস্ত কোষ পরিষ্কার হয় এবং সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ডহাউস ওয়েলনেসের প্রতিষ্ঠাতা ও চিকিৎসক সহকারী জিল ভিলা’র মতে, “সমস্যা দেখা দেয় যখন শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে মৃদু প্রদাহ চলতে থাকে। এমন প্রদাহ সব সময় স্পষ্ট লক্ষণ তৈরি করে না। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তা হৃদরোগ ও ‘টাইপ টু ডায়াবেটিস’-এর মতো অসুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।”

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, অপর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান, পেটের ভেতরে অতিরিক্ত চর্বি জমা এবং বিপাকক্রিয়ার সমস্যাও এ ধরনের প্রদাহের সঙ্গে যুক্ত।

বয়স বাড়লে সামাজিক পরিসর ছোট হবেই, এই ধারণা ঠিক নয়

অবসর গ্রহণ, জীবনসঙ্গী বা বন্ধুদের মৃত্যু বা শারীরিক অসুস্থতার কারণে বয়স বাড়ার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ কমে যেতে পারে। তবে একাকিত্বকে বার্ধক্যের অবধারিত অংশ বলে মেনে নেওয়া উচিত নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩ সালে পরিচালিত একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, পঞ্চাশ থেকে আশি বছর বয়সিদের ৩৭ শতাংশ একাকিত্ব অনুভব করার কথা জানিয়েছেন।

চিকিৎসক ট্রেসি লিপার্ডের মতে, “একাকিত্বের সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও চিন্তাশক্তির অবনতির ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। তাই পরিচিতদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ তাই গুরুত্বপূর্ণ।”

এ জন্য খুব বড় সামাজিক পরিসর গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই। সপ্তাহে একদিন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, কোনও ব্যায়ামের দলে যোগ দেওয়া বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া যেতে পারে।”

ব্যস্ততা বা দূরত্বের কারণে সরাসরি দেখা সম্ভব না হলে, ফোনে কথা বলা বা বার্তা পাঠানোর মাধ্যমেও যোগাযোগ ধরে রাখা যায়।

বেশি বেশি ‘সাপ্লিমেন্ট’ খেলেই স্বাস্থ্য ভালো থাকে, ধারণাটা ঠিক নয়

বাজারচলতি হরেক রকম ভিটামিন ট্যাবলেট খেলে দীর্ঘায়ু মেলা সম্ভব, এটি বর্তমান সময়ের বড় বাণিজ্যিক ভুল ধারণা।

ডা. রবার্ট নিল মিলস বলেন, “অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট কখনই সুষম খাবারের বিকল্প হতে পারে না।”

বয়স্কদের শরীরে ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে। তবে মূল পুষ্টির জোগান সবসময় প্রাকৃতিক খাবার থেকেই আসা উচিত।

যেকোনো ভিটামিনের বড়ি নিয়মিত সেবনের আগে অবশ্যই রক্তের পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শে নেওয়া উচিত।

পুরনো খবর:

মানসিক চাপ থেকে পেট খারাপ? রয়েছে সমাধান
স্মৃতিশক্তি ও মস্তিস্ক তীক্ষ্ণ রাখার উপায়
ওজন কমছে না? জেনে নিন ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ৮টি ভুল অভ্যাস