একসঙ্গে খেলে যে উপকার মেলে
শুধু একাকিত্বই দূর করে না, খাবার থেকে ভালোমতো পুষ্টি শোষণেও সাহায্য করে।
ব্যস্ত নাগরিক জীবনে সময়ের অভাব এবং নিঃসঙ্গ জীবনযাত্রার কারণে একা একা খাবার খাওয়ার অভ্যাস এখন এক সাধারণ প্রবৃত্তি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় দলবেঁধে বা একই টেবিলে বসে অনেকের সঙ্গে খাবার ও পানীয় ভাগ করে নেওয়ার বিশেষ সংস্কৃতিকে ‘কমেনসালিটি’ বলা হয়।
আপাতদৃষ্টিতে একা একা খাওয়াকে কিছুটা স্বাধীন বা আত্মবিশ্বাসী মনে হলেও, পুষ্টি ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত একা খাওয়ার এই দীর্ঘমেয়াদী বিচ্ছিন্নতা শরীর ও মনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
পক্ষান্তরে, পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে বসে খাবার খাওয়া অবচেতন স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে প্রশান্তি এনে দিতে পারে।
জীবনযাপন বিষয়ক পোর্টাল ‘রিয়েল সিম্পল’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের সোমাটিক ট্রমা থেরাপিস্ট ক্লোই বিন বলেন, “মানুষের মস্তিস্ক ও স্নায়ু প্রাকৃতিকভাবেই অন্যের সঙ্গে সামাজিক মেলবন্ধন বা যোগাযোগের জন্য তৈরি।”
একাকিত্ব কমায়
থেরাপিস্ট ক্লোই বিন বলেন, “আদিমকাল থেকেই মানুষ দলবদ্ধ জীব। দীর্ঘদিন একা থাকলে বা একা খাবার খেলে স্নায়ুতন্ত্র অদৃশ্য বড় বিপদ বা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে অবচেতনে শরীরে ক্ষতিকর ‘স্ট্রেস রেসপন্স’ বা মানসিক চাপ তৈরি হয়।”
তিনি আরও বলেন, “বৈজ্ঞানিক রিভিউ অনুযায়ী, প্রিয়জনদের সঙ্গে বসে খাবার খেলে মস্তিস্কের সেই বিপদ সংকেত শান্ত হয়ে যায়। যে কারণে রক্তে ক্ষতিকর হরমোন কমে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি প্রাকৃতিকভাবেই হ্রাস পায়।”
হরমোনের ত্রিমুখী উচ্চমাত্রায় তাৎক্ষণিক ফুরফুরে মেজাজ
মানসিক স্বাস্থ্য-বিষয়ক নিবন্ধিত মার্কিন পরামর্শক পাম স্কোপ ব্যাখ্যা করেন, “একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার সময় মস্তিস্কের রিওয়ার্ড সেন্টার বা পুরষ্কার পাওয়ার আনন্দের জায়গাটি একযোগে ৩টি বিশেষ ভালোলাগার রাসায়নিক উপাদান বা হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়।
ডোপামিন, অক্সিটোসিন এবং এন্ডোরফিনস: সুস্বাদু খাবার খাওয়ার কারণে মগজে ‘ডোপামিন’ নিঃসৃত হয় যা আনন্দ দেয়। আর সেই সময়ে মুখোমুখি বসে চোখের পলক মেলানো, গল্প করা ও হাসির কারণে মগজে ‘অক্সিটোসিন’ এবং ‘এন্ডোরফিনস’ হরমোনের বন্যা বয়ে যায়। যা পারস্পরিক বিশ্বাস, সামাজিক বন্ধন ও ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে তোলে।
পারস্পারিক সম্পর্ক ও আরামের সঙ্গে হজম
পাম স্কোপ বলেন, “একসঙ্গে খাওয়ার সময় শরীরে ‘কো-রেগুলেশন’ বা পারস্পারিক সম্পর্ক-বিষয়ক এক বিশেষ জৈবিক প্রক্রিয়া ঘটে। মানুষ যখন তার চারপাশের টেবিলের লোকজনের মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর, মৃদু হাসি ও আন্তরিক উপস্থিতি দেখে নিরাপদ বোধ করে, তখন তার শরীর তাড়াহুড়ো থেকে বের হয়ে আসে।”
এটি স্নায়ুকে শিথিল করে শরীরে ‘রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট’ বা আরামের সঙ্গে হজমের প্রক্রিয়া চালু করে দেয়, যা পরিপাকতন্ত্রকে সচল রেখে খাবারের পুষ্টি উপাদান কোষে সহজে শোষণ করতে সাহায্য করে।
কম ঝুঁকিতে সামাজিক যোগাযোগ ও সীমানা নির্ধারণের শিক্ষা
অনেকের ক্ষেত্রে সরাসরি নতুন কারও সঙ্গে কথা বলতে সামাজিক জড়তা কাজ করে।
পাম স্কোপের মতে, “খাবার টেবিল হল মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানোর নিরাপদ ও স্বাভাবিক জায়গা। এখানে গল্প বলা, প্রশ্ন করা, অন্যের রুচি মনে রাখা এবং খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে মানুষের মনে নিজস্বতার গভীর অনুভূতি তৈরি হয়।”
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, “একই সঙ্গে ‘না, ধন্যবাদ, আমি আর খাবার নেব না’ বলা বা ‘খাওয়ার সময় মোবাইল ফোন দূরে রাখা’র মতো বিষয়গুলোর মাধ্যমে জীবনের বাস্তবসম্মত সীমানা নির্ধারণ করার মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাস লাভ করে।
আরও পড়ুন
