Published : 20 May 2025, 11:49 AM
এক কাপ গরম কফি কিংবা এক গ্লাস এনার্জি ড্রিংক— দিনের ক্লান্তি বা ঘুম ভাব কাটাতে অনেকেরই প্রথম পছন্দ।
তবে কখনও ভেবে দেখেছেন, প্রতিদিন কতটুকু ক্যাফিইন শরীরের জন্য নিরাপদ?
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেইশন’ বলছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪শ’ মিলিগ্রাম ক্যাফিন গ্রহণ নিরাপদ।
আর চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, এই পরিমাণ সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়।
ক্যাফিন যে কারণে উত্তেজনা তৈরি করে
ক্যাফিন মূলত ‘অ্যাডেনোসিন’ নামের একটি রাসায়নিককে বাধা দেয়, যা ক্লান্তি ও ঘুম ভাব তৈরি করে। তাই সকালের এক কাপ কফি মন-মেজাজ চাঙ্গা করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকান বোর্ড অফ ফ্যামিলি মেডিসিন’ এবং ‘আমেরিকান একাডেমি অফ ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানস’-এর সদস্য ডা. নিকোলাস চার্চ ওয়েলঅ্যান্ডগুড ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “মাঝারি পরিমাণে ক্যাফিন মনোযোগ, মেজাজ ও শারীরিক কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে এটি হৃদস্পন্দন বাড়াতে পারে, উচ্চ রক্তচাপ বা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।”
তিনি আরও জানান, ক্যাফিনের প্রভাব সাধারণত এক ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে। আর শরীরে কয়েক ঘণ্টা থেকে যেতে পারে।
হঠাৎ ক্যাফিন বন্ধ করলে মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
যেভাবে বুঝবেন নিজের উপযুক্ত ক্যাফেইনের মাত্রা
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেইশন’ ৪শ’ মিলিগ্রাম নির্দেশিকা একটি গড় হিসাব।
তবে সবার শারীরিক গঠন ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা আলাদা হওয়াতে ব্যক্তিভেদে এই মাত্রা কম বা বেশি হতে পারে।
মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘ইথোস নিউট্রিশন’য়ের প্রধান কর্ণধার ও পুষ্টিবিদ টাইলার মিন্টন বলেন, “শরীরের ওজন অনুযায়ী হিসাব করলে ক্যাফিনের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিকারী মাত্রা প্রতি পাউন্ডে ১.৩৬ মিলিগ্রাম (৩–৬ মি.গ্রা./কেজি)।”
“তবে প্রতি পাউন্ডে ৪.০৮ মিলিগ্রাম (৯ মি.গ্রা./কেজি) গ্রহণ করলে উদ্বেগ, ঘুমে ব্যাঘাত, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমনকি প্রতি পাউন্ডে ৬৮–৯০ মিলিগ্রাম (১৫০–২০০ মি.গ্রা./কেজি) গ্রহণ করলে তা মারাত্মক হতে পারে”- বলেন এই পুষ্টিবিদ।
ডা. চার্চ বলেন, “কেউ কেউ অনেক কম ক্যাফিনেই উপসর্গ অনুভব করে। গর্ভবতী নারী, হৃদরোগ বা উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য ২শ’ মিলিগ্রামের নিচে থাকা শ্রেয়।”
শরীরের জন্য উপযুক্ত মাত্রা নির্ভর করে কিসের ওপর?
জিন
‘সিওয়াইপিওয়ানএ-টু’ নামের জিন, ক্যাফিন কত দ্রুত শরীর থেকে বের হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে।
অভ্যাস
নিয়মিত গ্রহণ করলে সহনশীলতা বেড়ে যায়। যা অনেকটাই পরিমাণ নির্ধারণ করতে সহায়ক।
পানি পান ও সার্বিক স্বাস্থ্য
হাইড্রেইটেড বা আর্দ্র না থাকলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বাড়তে পারে।
রোগ
উচ্চ রক্তচাপ,‘ অ্যাসিড রিফ্লাক্স’ বা উদ্বেগের ওপর মাত্রা নির্ভর করে।
টাইলার মিন্টন আরও বলেন, “ঘুম থেকে ওঠার ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যে শরীরে কর্টিসল হরমোন স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। এই সময় কফি খেলে শরীরের প্রাকৃতিক জাগরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে। বরং ঘুম থেকে ৯০ থেকে ১২০ মিনিট পর কফি খাওয়া উত্তম।”
যে সময়ে ক্যাফিন গ্রহণ করা উচিত নয়
এক কাপ কফির ক্যাফিন শরীরে থেকে যেতে পারে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। অর্থাৎ বিকেল ৩টার পর কফি পান করলে রাতে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। ঘুম কম হলে শরীর ও মস্তিষ্কের পুনরুদ্ধার ব্যাহত হয়।
ক্যাফিনের লুকানো উৎস
সব কফির ক্যাফিন সমান নয়। ‘রোবাস্তা’ জাতের কফিতে ক্যাফিনের পরিমাণ বেশি, ‘অ্যারাবিকা’তে কম। যেমন ৮ আউন্স ড্রিপ কফিতে ৯৫ থেকে ১৬৫ মিলিগ্রাম, ফ্রেঞ্চ প্রেসে ৮০ থেকে ১০৭ মিলিগ্রাম, আর এক শট এসপ্রেসোতে ৪৭ থেকে ৭৪ মিলিগ্রাম ক্যাফিন থাকতে পারে।
ডা. চার্চ বলেন, “এনার্জি ড্রিংকসে সাধারণত ৩শ’ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফিন থাকে। আবার চকলেট, ডার্ক চকলেট, কফি-স্বাদযুক্ত ডেজার্ট, এমনকি ডিক্যাফ কফি ও কিছু চা-তেও সামান্য ক্যাফিন থাকে।”
অনেক সিট্রাস বা টক স্বাদযুক্ত সোডা, এনার্জি বার, সাপ্লিমেন্ট ও মাথাব্যথার ওষুধেও ক্যাফিন থাকতে পারে।
বিশেষ সতর্কতা: গুঁড়া ক্যাফিনের ভয়াবহতা
বাজারে ক্যাফিন পাউডার বা ট্যাবলেট আকারে পাওয়া যায়, যা অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
আমেরিকার ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেইশন’ জানায়, আধা চা-চামচেরও কম ক্যাফিন পাউডারে থাকে ১২শ’ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফিন, যা খেলে খিঁচুনি বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
দেহে ক্যাফিন অতিরিক্ত হওয়া উপসর্গ
ডা. চার্চ বলেন, “যদি একাধিক কাপ কফির পর অস্বস্তি, অস্থিরতা বা হৃদস্পন্দন অনুভব করেন, তবে সেটা অতিরিক্ত ক্যাফিনের লক্ষণ।”
আরও পড়ুন
খালি পেটে কফি পান আসলেই কি ক্ষতিকর?