Published : 03 May 2026, 02:01 PM
দুই বছর আগে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় বলিউডের সালমান খানের বাসভবনে গুলির ঘটনা ছিল অভিনেতাকে ‘পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি চেষ্টা’।
বহুল আলোচিত এই মামলার শুনানিতে আদালতে দাঁড়িয়ে এ কথা বলছেন সালমান খানের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী। দেহরক্ষীর নাম প্রকাশ না করে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, তিনি মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে শনিবারের শুনানিতে এই অভিযোগ করেছেন।
২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল ভোরে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সালমানের বাসভবনে গুলি করে পালিয়ে যায় মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি।
পরে ঘটনার দায় স্বীকার করে আলোচিত গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই বলেন, “এরপর গুলি আর বাড়ির সামনে হবে না। এবং সালমান নিজেকে বাঁচাতে আর কোনো সুযোগও পাবেন না।”
পুলিশও জানিয়েছিল ২০২১ সাল থেকে জেলবন্দি বিষ্ণোই যে ১০ জনকে ‘খতমের তালিকায়’ রেখেছে, তাদের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে সালমানের নাম। এরপর পুলিশ এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।

এরপর থেকে বুলেটপ্রুফ গাড়ি ব্যবহার করেন সালমান। বাড়িয়েছেন নিরাপত্তা রক্ষীর সংখ্যাও এবং সঙ্গে রাখেন আগ্নেয়াস্ত্র।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে দেহরক্ষী আদালতকে জানিয়েছেন তিনি আগের দিন ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাতের পালার ডিউটি শুরু করেন ।
তিনি বলেন, “ভোর ৪টার দিকে আমরা পটকা ফাটার মত শব্দ শুনতে পাই। পরে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিওতে দেখি, হেলমেট পরা দুজন ব্যক্তি একটি বাইকে করে ভবনটির দিকে গুলি চালাচ্ছে।”
আদালতে তিনি আরও বলেছেন হামলাকারীরা চার থেকে পাঁচ রাউন্ড গুলি চালিয়েছিল।
“ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আমি এবং অন্য রক্ষীরা প্রধান ফটক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি।”
এই সাক্ষী আরও বলেছেন, হামলাকারীরা ‘আই লাভ বান্দ্রা’ পয়েন্টের দিকে পালিয়ে যায় এবং তারপর মেহবুব স্টুডিওস রোডের দিকে রওনা হয়।

বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি মহেশ মুলের নেতৃত্বে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সিসিটিভির ভিডিও উপস্থাপন করেন, যেখানে গেটের বাইরে একটি মোটরসাইকেলকে আসতে দেখা যায়, যা সাক্ষী শনাক্ত করেছিলেন।
দেহরক্ষীর বয়ানে উঠে এসেছে, ওই সময় সালমান খান বান্দ্রার গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের নিচতলায় তার শোবার ঘরে ছিলেন।
তার দাবি, “সালমানকে হত্যা করার জন্যই গুলি গুলি চালানো হয়েছিল।”
এই মামলার আরেক সাক্ষী এবং বাসভবনের সামনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন পুলিশ প্রহরী আদালতকে জানিয়েছেন যে ঘটনার সময় তারা ওই অ্যাপার্টমেন্টের লবিতে ছিলেন। তারা গুলি চালাতে না দেখলেও পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে গুলির খোসা দেখতে পান।
আর তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলেছেন, আসামি মুহম্মদ রফিক সরদার চৌধুরী ওই ঘটনার দুই দিন আগে ভবনটি পরিদর্শন করে একটি ভিডিও রেকর্ড করেন এবং সেটি পলাতক অভিযুক্ত ও লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ভাই আনমোল বিষ্ণোইয়ের কাছে পাঠান।
আমাদের ঘুমন্ত অবস্থায় মারতে চেয়েছিল
হামলার ঘটনার সাড়ে তিন মাস পর পুলিশ এই মামলায় এক হাজার ৭৩৫ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেয় মুম্বাইয়ের বিশেষ আদালতে। ওই অভিযোগপত্রে গত ১৪ এপ্রিল ভোরে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় অভিনেতার বাসভবনে গুলির ঘটনার পুলিশের কাছে দেওয়া সালমানের জবানবন্দি আছে।
সালমানের ভাষ্য, ১৪ এপ্রিল ভোরে তার ঘুম ভাঙে আতশবাজির মত একটি শব্দ শুনে। যে শব্দে তিনি চমকে ওঠেন। অভিনেতার দেহরক্ষী ভোর ৪টা ৫৫ মিনিটে তাকে জানান যে একটি মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের দোতলার (সালমানের বাসভবন) ব্যালকনি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।
“পরিবারের সদস্যদের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠেছে ভেবে আমি অস্থির হয়ে যাই।”
সালমান আরো বলেছেন এর আগেও তার ও তার পরিবারের ক্ষতি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে পুলিশের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই ও তার ভাই আনমোল বিষ্ণোই ফেইসবুক পোস্টে ওই হামলার দায় স্বীকার করেছেন।

সালমান বলেছিলেন, “আমি বিশ্বাস করি যে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সহায়তায় তার দলের সদস্যরা গুলি চালিয়েছিলেন। যখন আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে ছিলাম। তারা আমাকে ও আমার পরিবারের সদস্যদের ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন।”
জবানবন্দিতে সালমান আরো জানিয়েছিরেন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি ও তার পরিবার বেশ কয়েকবার হুমকি পেয়েছেন।
অভিযোগপত্রে যা আছে
আদালত গুলির ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে জানিয়েছে, গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ প্রমাণ আছে।
এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ভিকি কুমার গুপ্ত, সাগর শিরিযোগেন্দ্র কুমার পাল, সনু কুমার বিষ্ণোই, অনুজ কুমার থাপন, মুহম্মদ রফিক চৌধুরী ও হরপাল সিং।
এর মধ্যে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে আত্মহত্যা করেন অনুজ কুমার।
কারাবন্দী গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই এবং তার ভাই অনমোল বিষ্ণোইকে এই মামলায় পলাতক আসামি হিসেবে নাম দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, সালমানের বাড়িতে গুলির আগে আনমোল বিষ্ণোইয়ের সঙ্গে ওই বাইকে থাকা ভিকি সাহেব গুপ্ত এবং সাগর শিরিযোগেন্দ্র পালের কথোপকথের অডিও ক্লিপ পুলিশের হাতে এসেছে। ওই কথাবার্তায় জানা গেছে, ভিকি এবং সাগরকে আনমোলই সালমানের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন।
ওই দুইজনের প্রতি আনমোলের নির্দেশ ছিল তারা যেন ওই ঘটনার সময় সিগারেট খেতে থাকেন একং তাদের মাথায় যেন হেলমেট না থাকে। এর কারণ হিসেবে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিওতে ভিকি এবং সাগরকে যাতে যথেষ্ঠ বেপরোয়া হিসেবে চোখে পরে সেটাই আনমোল চেয়েছিলেন।
পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়েছে, গুলি করার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত ভিকি এবং সাগরের সঙ্গে আনমোল সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছেন। এছাড়া কারাগারে থাকে এবং এই ঘটনার মূল হোতা আনমোলের ভাই গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইও ভিকি এবং সাগরের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেছেন।
আনমোল ওই দিন ভিকি এবং সাগরকে বলেছিলেন, যদি তারা তাদের কাজে সফল হয় তাহলে ‘ইতিহাস তৈরি হবে’ এবং সংবাদমাধ্যমে তাদের নাম ছড়িয়ে পড়বে। পুলিশের ধারণা আনমোল কানাডায় আত্মগোপনে আছেন।
আরও পড়ুন
রোহিতের বাড়িতে গুলি: সালমান ও বাবা সিদ্দিকীর ঘটনার সঙ্গে মিল কোথায়?
এবার হুমকি নয়, সালমানের বাড়ির সামনে গুলি
সালমানের বাড়ির সামনে গুলি, গ্রেপ্তার ২
সালমানকে 'হত্যাচেষ্টা': অভিনেতার জবানবন্দি ও অভিযোগপত্রে যা আছে
মুম্বাইয়ের তিনবারের এমএলএ বাবা সিদ্দিকী খুনে বিষ্ণোই গ্যাং?