Published : 03 Feb 2026, 12:57 PM
বলিউডি নির্মাতা রোহিত শেঠির মুম্বাইয়ের বাসভবন ‘শেঠি টাওয়ারের’ গুলিবর্ষণের ঘটনার সঙ্গে তারকা অভিনেতা সালমান খানের বাড়িতে গুলি এবং মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ‘মিল পেয়েছে’ পুলিশ।
কারণ তিনটি ঘটনার নেপথ্যেই আছে গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের দল।
মুম্বাইয়ের জুহু এলাকার শনিবার রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে রোহিত শেঠির আবাসন ‘শেঠি টাওয়ার’ লক্ষ্য করে বাইরে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। এ ঘটনায় কেউ আহত হননি। পরে হামলার দায় স্বীকার করে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়েছে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের কথিত সদস্য শুভম লোনকর।
তাকে ধরতে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে মুম্বাই পুলিশ ও মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চের ১২টি বিশেষ দল। শুভমকে ‘ওয়ান্টেড’ ঘোষণা করেছে পুলিশ।
ক্রাইম ব্রাঞ্চের একজন ঊর্দ্ধতম কর্মকর্তা বলেন, “তিনটি ঘটনার সরাসরি কোনো যোগসূত্রতা নেই। কিন্তু হত্যাকাণ্ড এবং দুটি হামলার স্বীকারোক্তি এসেছে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের গ্যাংয়ের পক্ষ থেকে। সাদ্যশ্য আছে দেখা যাচ্ছে।”
সবগুলো ঘটনা বিবেচনায় নিয়ে তদন্তে নেমেছে পুলিশ।
এনডিটিভি এবং টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, সোশাল মিডিয়ায় দেওয়া পোস্টে ‘জয় বজরংবলী’ বলে শুভম লিখেছেন, “আজ আমরা শুভম লোনকর, আরজু বিষ্ণোই, হরি বক্সার ও হারামান শান্ডু পরিচালক রোহিত শেঠির মুম্বাইয়ের বাড়িতে গুলির ঘটনার দায় স্বীকার করছি। আমরা তাকে (রোহিত শেঠি) একাধিকবার বার্তা পাঠিয়েছি, আমাদের কাজে হস্তক্ষেপ না করার জন্য। কিন্তু তিনি আমাদের কথা কানে তোলেননি।
“এ তো কেবল একটা ঝলক ছিল। আমাদের কথা না শুনলে পরের গুলিটা তার বাড়ির বাইরে নয়। শোবার ঘরে চলবে, বুক লক্ষ্য করে গুলি চালানো হবে। গোটা বলিউডকে এটা আমাদের হুঁশিয়ারি। নিজেদের পথ ঠিক করো, না হলে তোমাদের অবস্থা বাবা সিদ্দিকীর চেয়েও খারাপ হবে। লুকানোর জায়গা থাকবে না”
ওই পোস্টে বিশেষ দ্রষ্টব্যে আরও বলা হয়েছে, “ছিল, আছে ও থাকবে, সেটা হল লরেন্স বিষ্ণোইয়ের গ্রুপ।”
এ ঘটনায় পুলিশ পুনের ধয়ারী ও কার্ভেনগর এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
তারা হলেন- আমন আনন্দ মারোতে (২৭), স্বপ্নিল সকত (২৩), সিদ্ধার্থ দীপক ইয়েনপুরে (২০), আদিত্য জ্ঞানেশ্বর গায়কি (১৯) এবং সমর্থ শিবশরন পোমাজি (১৮)। তাদের মধ্যে চারজন কলেজ ছাত্র আর পঞ্চম জন বেকার।
এই পাঁচ জনের বিরুদ্ধে জুহু থানায় খুনের চেষ্টা ও অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে। আদালত তাদের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, এই পাঁচজন রোহিতের বাসভবনে মূল হামলাকারীকে আশ্রয় ও তথ্য সরবরাহকরাসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন।
আর হামলার দায় স্বীকার করে পোস্ট দেওয়া শুভম বাবা সিদ্দিকী হত্যা মামলার পলাতক আসামি। পুলিশের ধারণা করছে, শুভম দেশের নেপাল বা অন্য কোনো দেশে আত্মগোপনে আছেন। এর আগে সালমানের বাড়িতে গুলির ঘটনার সময়ও পুলিশ শুভমকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তবে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ওই রাতে যা ঘটে
রোহিত শেঠির আবাসন ‘শেঠি টাওয়ার’ এর বাইরে থেকে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় শনিবার রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে।

ওই আবাসনের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও পর্যালোচনা করে তদন্তকারী পুলিশ বলছে, ওই সময়ে একজন ব্যক্তি ধরা পড়েছেন ভিডিওতে। গুলি চালানোর আগে তিনি ধূমপান করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি এই ঘটনার কয়েক দিন আগে পুনে থেকে একটি মোটরসাইকেল কিনেছিলেন। তবে মোটরসাইকেলটি যা অন্য একজনের নামে নিবন্ধিত ছিল বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
আর হামলার আগে তিনি এলাকা পরিদর্শন করে পালানোর পথের একটি নকশা তৈরি করে রাখেন বলেও ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার কয়েকদিনের ভিডিওতে ধরা পড়েছে।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, শনিবার ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে অভিযুক্ত ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে রোহিতের আবাসনের পাশের একটি ভবনের সামনে সেটি পার্ক করেন। এরপর হেঁটে গিয়ে ‘শেঠি টাওয়ার’ এর সামনে দাঁড়িয়ে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়েন।
পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, “একটি গুলি বারান্দার সেফটি গ্লাসে, দুটি প্রথম তলার দেয়ালে এবং বাকি দুটি প্রবেশপথের দেয়ালে লাগে।”
আবাসনের নিরাপত্তা কর্মীরা গুলিবর্ষণের ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছেন। ওই ভবনের তিনজন রক্ষীর মধ্যে ওই সময় ভবনের ভেতরে ছিলেন একজন। আর একজন বাথরুমে গিয়েছিলেন।
গুলি চালানোর পর অভিযুক্ত ব্যক্তি মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান। তবে টিউলিপ স্টার হোটেল মোড়ে পুলিশের গাড়ি দেখে তিনি দিক পরিবর্তন করে জুহু চার্চের দিকে যান।
এরপর চার্চের কাছে মোটরসাইকেল ফেলে রেখে দিয়ে একটি অটোতে ওঠেন। পরে একাধিক যানবাহন বদলে তিনি সান্তাক্রুজ স্টেশন হয়ে ট্রেনে করে কল্যাণ এবং সেখান থেকে পুনে পালিয়ে যান বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছ।
পুলিশ জুহু চার্চের কাছ থেকে পরিত্যক্ত মোটরসাইকেলটি জব্দ করেছে। এরপর নম্বর প্লেটের সূত্র ধরে এর আসল মালিককে খুঁজে বের করে। মালিক পুলিশকে বলেছেন, তিনি কিছুদিন আগে মোটরসাইকেলটি ওই হামলাকারীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।
এই তথ্যের ভিত্তিতে পুনে পুলিশের সহায়তায় পাঁচজনকে আটক করা হয়।
হামলার কারণ কী
পুলিশের ধারণা মুম্বাইয়ের সাবেক পুলিশ কমিশনার রাকেশ মারিয়ার জীবনের ওপর নির্মাণাধীন একটি চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করেই রোহিত বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নিশানায় এসেছেন।
তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সরাসরি যোগসূত্রের প্রমাণ পুলিশের হাতে আসেনি।
সাবেক পুলিশ কমিশনারের জীবনের ওপর নির্মিতব্য সিনেমাটি রোহিত প্রযোজনা ও পরিচালনা করতে চলেছেন। পুলিশ কর্মকর্তা রাকেশ মারিয়ার চরিত্রে অভিনয় করছেন জন আব্রাহাম।
নিরাপত্তা
দশতলাবিশিষ্ট শেঠি টাওয়ার ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
রোহিত তার সব পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করেছেন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অনুরোধ করেছেন, অন্তত ৪৮ ঘণ্টা কেউ যেন তার সঙ্গে দেখা করতে না আসেন।
যোগসূত্র
১৯৯৮ সালে কৃষ্ণসার হরিণ শিকারে সালমানের নাম জড়িয়েছিল। পরে হরিণ হত্যা মামলা থেকে সালমান রেহাই পেলেও সেই থেকে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ‘নিশানার তালিকায়’ তিনি রয়ে যান।
কারণ বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ কৃষ্ণসার বা চিংকার হরিণকে পবিত্র বলে মনে করে, বলতে গেলে তারা পূজা করে।

এই ঘটনার ‘বদলা নিতে’ ২০১১ সালে ‘রেডি’ সিনেমার শুটিংয়ের মাঝে সালমান খানকে হত্যার হুমকি দিয়ে আলোচনায় আসেন লরেন্স বিষ্ণোই।
এই গ্যাস্টারের নাম ফের সামনে আসে ২০১৮ সালে। সে সময় সালমানকে হত্যার জন্য বিষ্ণোই তার সহযোগী সম্পত নেহরাকে দায়িত্ব দেন, যদিও তা ভেস্তে যায়। এরপর ২০২১ সাল থেকে সালমান নিয়মিত হত্যার হুমকি দিয়ে আসছে বিষ্ণোই। কখনো চিঠিতে, কখনো ই-মেইলে। হামলার লক্ষ্য ছিল সালমানের পানভেলের খামারবাড়ি। তবে প্রতিবারই পুলিশের তৎপরতায় হামলার ছক প্রকাশ্যে এসেছে।
তবে পরে সালমানকে হত্যার হুমকি কেবল আর কথার কথা হয়ে থাকেনি। ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল ভোরে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সালমানের বাসভবনে গুলির করে পালিয়ে যায় মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি।
ঘটনার দায় স্বীকার বিষ্ণোই বলে দেন “এরপর গুলি আর বাড়ির সামনে হবে না। এবং সালমান নিজেকে বাঁচাতে আর কোনো সুযোগও পাবেন না।”

পুলিশও জানিয়েছে ২০২১ সাল থেকে জেলবন্দি বিষ্ণোই যে ১০ জনকে ‘খতমের তালিকায়’ রেখেছে, তাদের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে সালমানের নাম।
এরপর থেকে বুলেটপ্রুফ গাড়ি ব্যবহার করেন সালমান। বাড়িয়েছে নিরাপত্তা রক্ষীর সংখ্যাও এবং সঙ্গে রাখেন আগ্নেয়াস্ত্র।
সালমানের বাড়িতে গুলির ছয়মাস পরই মুম্বাইয়ের শহরতলি বান্দ্রায় দশেরার বাজি ফোটানোর সময় তিনবারের বিধায়ক সালমানের ঘনিষ্ঠজন বাবা সিদ্দিকীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই রাজনীতিককে লক্ষ্য করে মোট ছয়টি গুলি ছোড়া হয়, যার মধ্যে চারটিই তার বুকে লাগে। ওই হত্যাকাণ্ডের দায়ও স্বীকার করে বিষ্ণোইয়ের দল।

এ ছাড়া অভিনেত্রী দিশা পাটানির উত্তর প্রদেশের বাড়ির বাইরে গুলির ঘটনার বিষ্ণোই গ্যাংই ঘটিয়েছিল। জনপ্রিয় কৌতুকশিল্পী কপিল শর্মার কানাডার ক্যাফেতেও তিন দফা গুলির ঘটনার দায় স্বীকার করেছে এই সন্ত্রাসী দলটি।
পুলিশ সূত্রের বরাতে এনডিটিভি লিখেছে, বিষ্ণোই চক্রে ৭০০ জনেরও বেশি ‘শুটার’ রয়েছে, যারা ভারতজুড়ে ছোট-বড় অপরাধী হিসেবে কাজ করে। সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনায় বিষ্ণোইয়ের দলের যোগ পেয়েছে পুলিশ, যার মধ্যে র্যাপার সিধু মুসেওয়ালা এবং দিল্লির একটি জিম মালিকের হত্যাকাণ্ড আছে, যিনি আফগান বংশোদ্ভূত ছিলেন।
এবার হুমকি নয়, সালমানের বাড়ির সামনে গুলি
সালমানের বাড়ির সামনে গুলি, গ্রেপ্তার ২
সালমানকে 'হত্যাচেষ্টা': অভিনেতার জবানবন্দি ও অভিযোগপত্রে যা আছে
মুম্বাইয়ের তিনবারের এমএলএ বাবা সিদ্দিকী খুনে বিষ্ণোই গ্যাং?