Published : 19 Jul 2026, 09:38 AM
জনপ্রিয়তা আর রূপালি পর্দার আলোকবৃত্তে যার পরিচয় ‘মিষ্টি মেয়ে’, পর্দার বাইরে সেই কবরীর জীবনের প্রতিটি বাঁক যেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক-একটি সংগ্রামের পর্ব। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক আইকন, ছিলেন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের এক অকুতোভয় সাক্ষী ও একাত্তরের নির্ভীক কণ্ঠস্বর। চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজারের 'মিনা পাল' থেকে কিশোর বয়সে চলচ্চিত্রের 'মিষ্টি মেয়ে' কবরী হয়ে ওঠার গল্পটা মৃত্যু পর্যন্ত রোমাঞ্চকর।

এই গল্পটা তিনি তার 'স্মৃতিটুকু থাক' আত্মকথনমূলক বইয়ে অনবদ্য ভঙ্গিমায় বর্ণনা করেছেন; আলমগীর কুমকুম পরিচালিত এবং তারই অভিনীত ‘স্মৃতিটুকু থাক’ চলচ্চিত্রের নামানুসারে বইটির নামকরণ করা হয়েছে। বইটির ভূমিকা অংশে কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, ‘পাণ্ডুলিপি পড়ে আমার মনে হলো, আমি কোনো কবির রচিত আত্মজৈবনিক গদ্য পাঠ করছি’। বইটির প্রকাশনা সংস্থা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর পাবলিশিং লিমিটেড (বিপিএল); এর প্রকাশক লিখেছেন, ‘শিল্পের আর জীবনের দায় যখন এক বিন্দুতে জ্বলে, সেই দায়ের কাছে সংসার-জগৎ তুচ্ছ হয়ে যায়, সাহস তখন মানুষকে পথ দেখায়। পথ দেখিয়েছে কবরীকেও’।
রাজনৈতিক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধ
ছোটবেলা থেকেই তার পারিবারিক পরিবেশে রাজনীতির উত্তাপ ছিল। তার বাবা নিয়মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সভা-সমাবেশে অংশ নিতেন। একবার তো ভিড়ের চাপে পাঞ্জাবি ছিঁড়ে, জুতা হারিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে বাসায় ফিরতে হয়েছিল তাকে। এমন এক রাজনৈতিক আবহেই বেড়ে ওঠা কবরীর রক্তে মিশে ছিল বায়ান্ন থেকে একাত্তরের উত্তাল চেতনার বীজ।

তিনি মুক্তিযুদ্ধের আগেই ‘সুতরাং’, ‘বাহানা’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘ময়নামতি’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘দ্বীপ নেভে নাই’ ইত্যাদি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে হয়ে উঠেছিলেন জননন্দিত একজন নায়িকা। তখন তিনি থাকতেন ঢাকার ইস্কাটনের একটা ভাড়া বাসায়। মুক্তিযুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে শুভাঙ্ক্ষীদের পীড়াপীড়িতে তিনি নতুন কেনা টয়োটা গাড়ি আর মাইক্রোবাস নিয়ে চলে এলেন চট্টগ্রাম শহরে মা-বাবার কাছে। কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা; সবার মধ্যেই আতঙ্ক। এরপর কয়েকটা বাসা বদল করে তিনি উঠলেন আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান বাবুর ছোট বোন পুটি আপার সেনানিবাসস্থ বাসভবনে। কিছুদিন পর সেখানেও গোলাগুলি শুরু হলো।
একদিন ভোরে রাস্তায় বেরিয়ে দেখেন, চারিদিকে ট্রেঞ্চ, রাস্তা কেটে ব্যারিকেড। সেখানে কয়েকজন তরুণের সঙ্গে দেখা হলে, তারা বলল, ‘আপা, একটা গাড়ি আমাদের দিন, রসদ আনতে হবে। তেলের কোটা করে দিয়েছে—গাড়িটা আমাদের দিলে যুদ্ধে কাজে লাগবে’। কবরী তার মাইক্রোবাসটা সেই মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে দিলেন।
পরবর্তীতে তিনি টয়োটা গাড়ি নিয়ে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলে এলেন চট্টগ্রামেই নিজেদের গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু এখানকার অবস্থাও খারাপ হতে থাকে। বিশেষ করে ছিল রাজাকারদের উৎপাত। কবরী গ্রামে এসেছে একথা রটে যাওয়ায় নিরীহ গ্রামবাসীও ভয় পেতে শুরু করে; তাই তিনি গ্রাম ছেড়ে চলে যান—এটাই অনেকের চাওয়া ছিল। ১৯ এপ্রিল রাতে দুই শিশুপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে ৮/১০ জনের একটি কাফেলায় পায়ে হেঁটে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ঘুটগুটে অন্ধকারে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে তারা নারায়ণহাটে এসে উপস্থিত হন; জায়গাটা তখনও ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। সেখানে বাঙালি এক ক্যাপ্টেন, নাম কাদের, তিনি তাকে চিনে ফেলেন। ক্যাপ্টেন কাদের জিপে করে তাদের পৌঁছে দেন সীমান্তে। কবরী লিখছেন, ‘ধূলা উড়িয়ে চলে যাচ্ছে ক্যাপ্টেন কাদেরের গাড়ি। বুকের ভিতর হু হু করে ওঠে অজানা ভয়’। তার এই ভয় অমূলক ছিল না। পরদিন সকালেই তিনি খবর পান, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাপ্টেন কাদেরসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে মেরে ফেলেছে।
খবরটি শোনার পর কবরীর আর্তনাদ ছিল একাত্তরের সেই সকল লাখো শহীদের প্রতি এক সম্মিলিত শোকধ্বনি, যাদের একজন নিজের জীবন দিয়ে এক বিপন্ন নারীর পথ নিরাপদ করেছিলেন।
শরণার্থী জীবন
এভাবেই আরও অগণিত শরণার্থীর সঙ্গে শুরু হয় কবরীর শরণার্থী জীবন। বাসে করে আগরতলা এসে উঠলেন এক সস্তার হোটেলে। সম্বল সামান্য কিছু কাপড় আর টাকা। দুই বাচ্চাকে নিয়ে ওই হোটেলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন; এমনকি গোসলের পানির অভাবও ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। এমন সংকটাপন্ন মুহূর্তে ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সম্পাদক অনিল ভট্টাচার্য তাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিলেন; যদিও সেখানেও অনেক শরণার্থীর ভিড় ছিল। তার কাছেই হয় কবরীর বক্তৃতা দেওয়ার হাতেখড়ি। এরপর পাড়ায় পাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বক্তৃতা করতে করতে তার মুখের জড়তা কাটতে থাকে।
একসময় তিনি চলে এলেন কলকাতায়, দেশপ্রিয় পার্কের কাছে ডা. দে-র বোনের বাড়িতে। তাদের ছেলে ডাক্তার দীপঙ্কর পরবর্তীতে অভিনয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তারা খালেদ মোশাররফসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে সাহায্য করতেন। ওই বাড়িতে এসে মানসবাবু, যিনি নিজে ১৯৬৪ সালের দাঙ্গায় সর্বস্ব হারিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তিনি নিজের অভাবের মধ্যেও কবরীকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। এই মমত্ববোধ কবরীকে শিখিয়েছিল যে, যুদ্ধ কেবল সীমানায় নয়, যুদ্ধ প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের ভেতরেও।
এরপর এর বাড়ি ওর বাড়ি আশ্রয়ে তার দিন কাটতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি শোভা মাসির বাড়িতে উঠলেন; তাদের বাড়ি ছিল কুমিল্লায়, দাঙ্গার সময় কলকাতায় চলে এসেছিলেন।
কবরী একপর্যায়ে পেলেন নতুন ঠিকানা—পার্ক সার্কাসের সামনে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন; হাইকমিশনার হোসেন আলী আগেই মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশের জননন্দিত অভিনেত্রী শরণার্থী হয়ে সেখানে আছেন—খবরটা চারিদিকে বেশ চাউর হয়ে যায়। একবার বাংলাদেশ মিশনের সামনে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলে, সেখানে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। আয়োজকরা কবরীকে বক্তৃতা দিতে মঞ্চে উঠিয়ে দেন। তখন বিহ্বল কবরী পাকিস্তানিদের কবল থেকে বাঙালিদের রক্ষা করতে বিশ্ববাসীকে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েই জ্ঞান হারিয়ে মঞ্চে পড়ে যান। সেই ভাষণ আকাশবাণী থেকে বারবার প্রচারিত হয়েছিল।
এরপর থেকে যেখানেই ডাক আসত, সেখানেই তিনি বক্তৃতা দিতে চলে যেতেন। তিনি শরণার্থীদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং তাদের সীমাহীন ব্যথায় সমব্যথী হয়েছেন। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তিনি নিজে রক্তদানও করেছেন।
তাছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্রের দিকপালদের সঙ্গে দেখা করে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে আলোকপাত করেছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সত্যজিৎ রায়, উত্তম কুমার, ধর্মেন্দ্র, দেব আনন্দ, শক্তি সামন্ত, যশ চোপড়া, অনিতা দত্ত প্রমুখ। তহবিল সংগ্রহের জন্য তিনি নার্গিস দত্তের সঙ্গে দিল্লি গিয়েছিলেন; ‘জয় জোয়ান নাইট’ শীর্ষক সে অনুষ্ঠানে সুনীল দত্ত, রেখাসহ আরও অনেকে অংশ নেন। ‘ফিল্মফেয়ার’ কবরীকে নিয়ে কভার স্টোরি করে; এমনকি ‘স্টারডাস্ট’ ও ‘দ্য মিরর’ পত্রিকায় তার সাক্ষাৎকার ছাপা হয়।

ভারত সরকারের সহযোগিতায় আই. এস. জোহরের পরিচালনায় ‘জয়বাংলা’ ছবিতে অভিনয় করে তিনি যে ২০ হাজার রুপি সম্মানি পেয়েছিলেন, তার অর্ধেকই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের তহবিলে দান করে দিয়েছিলেন। তবে ছবিটিতে মুক্তিযুদ্ধকে বিকৃত করা হয়েছে জানিয়ে, পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি তা রিলিজ না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
মেগাফোন কোম্পানি প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরীর লেখা ও সংগীতে ৪৫ আরপিএম ফরম্যাটে একটি রেকর্ড প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল ‘আমি মুজিবের মা বলছি’। এই রেকর্ডে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা ও নির্যাতনের কথা ফুটে উঠেছিল। প্রথমে সুচিত্রা সেনকে দিয়ে এটি করানোর কথা থাকলেও, সলিল চৌধুরী কবরীকে দিয়েই তা করিয়েছিলেন। কবরী লিখেছেন, তিনি অকৃত্রিম আবেগে, চোখের জল ফেলে আবৃত্তি ও অভিনয় করেছিলেন। রেকর্ডটি বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। একবার সলিল চৌধুরী বিরাট এক হোটেলে মান্যবর ব্যক্তিদের নিমন্ত্রণ করে এনে মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সাহায্য চেয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে রোরুদ্যমান কবরী শুধু সলিল চৌধুরীর কবিতা আবৃত্তি করেননি, শাড়ির আঁচল পেতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভিক্ষা চেয়েছিলেন।
রণাঙ্গনের সাংস্কৃতিক যোদ্ধা
কবরীর জীবনপঞ্জিতে একাত্তরের শরণার্থী জীবন ছিল একজন শিল্পীসত্তার ‘রূপান্তরপর্ব’। ক্যামেরার সামনে কৃত্রিম কান্না নয়, বাস্তবের আর্তনাদ তার অভিনয়ের গভীরতাকে বদলে দিয়েছিল এক নতুন দর্শনে। শিল্পী কবরী বুঝেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ কেবল রণাঙ্গনের লড়াই নয়, বিশ্ববিবেকের কাছে সত্য তুলে ধরার লড়াইও। তখন তিনি কেবল একজন অভিনেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন তৎকালীন বাঙালি নারীত্বের ও স্বপ্নের প্রতীক, তথা মুক্তিকামী বাঙালি জাতির কণ্ঠস্বর। কবরী তার রূপালি পর্দার ভুবনভুলানো হাসিকে একাত্তরের রণাঙ্গনে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অমোঘ অস্ত্রে পরিণত করতে; যেখানে তার শব্দগুলো ছিল পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী উচ্চারণ। বক্তৃতা দিতে তিনি যখন সাধারণ মানুষের সামনে দাঁড়াতেন, তখন জনতা দেখত তাদের প্রিয় নায়িকাকে। কিন্তু সেই অভিনেত্রী যখন যুদ্ধের ভয়াবহতা আর পাকিস্তানিদের নৃশংসতার বর্ণনা দিতেন, তখন সাধারণ দর্শক এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা খেত। তার গ্ল্যামার তখন আর বিনোদনের বিষয় ছিল না, বরং তা পরিণত হয়েছিল স্বাধীনতার দাবির সংলাপে। এভাবেই তিনি মানুষের মনে যুদ্ধের নৈতিক বৈধতা গেঁথে দিয়েছিলেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাংবাদিকরা যখন তার অনুভূতি জানতে চাইলেন, তিনি কেবল কাঁদতেই পেরেছিলেন—কারণ সেই কান্নায় মিশে ছিল দীর্ঘ নয় মাসের প্রতীক্ষার মুক্তি এবং প্রিয় স্বদেশের ঘ্রাণ। বোম্বের হাতছানি তাকে ভারতে আটকে রাখতে পারেনি; তাই তিনি দ্রুতই ফিরে এসেছিলেন এফডিসির প্রিয় প্রাঙ্গণে। এরপর তিনি দর্শকদের একের পর এক উপহার দিয়েছেন সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র—‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘অনির্বাণ’, ‘মাসুদ রানা’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘সুজন সখী’, ‘সারেং বৌ’, ‘বধূ বিদায়’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘দেবদাস’ ইত্যাদি।
সক্রিয় রাজনীতির ময়দানে

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নতকরণে তিনি ছিলেন সতত সোচ্চার। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যখন তাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘কবরী, প্রেসক্লাবের সামনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আমরা সভা ডেকেছি, আসবে কিন্তু’; তিনি তাতে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি সেই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং প্রেসক্লাবে বক্তৃতাও করেছিলেন।
শৈশব থেকেই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বেড়ে ওঠা কবরীর সক্রিয় রাজনীতিতে আসা—বিশেষ করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের মতো সদা-সরগরম শিল্পাঞ্চলে সরাসরি ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া—ছিল সেই একাত্তরেরই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা। কেন তিনি নারীদের 'সংরক্ষিত আসন' নামক নিরাপদ পথটি বেছে নেননি? কারণ, তিনি জানতেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে সহজ সুবিধাভোগ নয়, বরং সরাসরি লড়াই। তিনি জানতেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে কেবল স্মৃতি রোমন্থন নয়, বরং দেশের নীতিনির্ধারণি পর্যায়ে নিজের আদর্শের জায়গা করে নেওয়া। রূপালি পর্দার জৌলুসকে তিনি কখনোই রাজনীতির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং অভিনয়ের সেই জনপ্রিয়তাকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন আদর্শিক রাজনীতির মঞ্চে। বইতে তিনি লিখছেন, ‘আমার অভিনয় জগতে রাজনীতি করিনি, আবার রাজনীতিতে কোনো অভিনয় করিনি’। তিনি এই নির্বাচনে 'একাত্তরের কবরী'কে জনগণের কাছে নতুন করে উপস্থাপন করেছিলেন। পারিবারিক গৃহদাহের জ্বালা এবং প্রকাশ্য প্রতিপক্ষের প্রদাহসূচক বিষোদগার অগ্রাহ্য করে শেষ পর্যন্ত বিপুল ভোটের ব্যবধানে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
নিজেকে যেভাবে দেখতেন
বইয়ের শেষ প্রচ্ছদে তিনি কাব্য করেছেন:
নারী-শিশুদের আধিকারে আমি সোচ্চার
বাল্যবিবাহ রোধে আমি অনড়
মানুষের ভালোবাসা আমার উচ্ছ্বাস
স্বাধীনতার জন্য আমি লড়াকু
মায়ের চরণে আমি নত
প্রিয়র ঠোঁটে আমি চুম্বন
আলিঙ্গনে আমি উষ্ণ
বিষাদে আমি রোদন
হাসিতে আমি অমলিন।
শেষ বিচারে কবরীর মতো শিল্পীরা কেবল ক্যামেরা আর আলোর কারিগর নন, বরং তারা সময়ের দর্পণ। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ যখনই কোনো সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াবে, আমরা কবরীর জীবনের সেই দ্বিধাহীন দেশপ্রেম ও সাহসের কথা স্মরণ করব।
‘স্মৃতিটুকু থাক’—এই শিরোনামটি এখন আমাদের কাছে কেবল একটি বইয়ের নাম নয়, বরং এক মহান শিল্পীর রেখে যাওয়া চিরন্তন আহ্বান।
১৯ জুলাই তার জন্মদিনে আজ আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের সেরা উপায় হলো—কবরীর ছড়িয়ে দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের বিকিরণকে হৃদয়ে ধারণ করা। তিনি বেঁচে থাকবেন তার শিল্পে, তার ত্যাগে এবং প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের চেতনার গভীরে।
বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ গবেষক ও লেখক। ই-মেইল: [email protected]