Published : 20 Jul 2026, 12:52 AM
দেশে গত দুই বছরে কারাবন্দি অবস্থায় যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ‘অধিকাংশেরই হৃদরোগে’ আক্রান্ত হওয়ার কথা বলেছে কারা কর্তৃপক্ষ।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে ‘২২৭ কারাবন্দির’ মৃত্যুর তথ্য সামনে আসার পর মৃত্যুর কারণ হিসেবে কারা কর্তৃপক্ষের এমন বক্তব্য পাওয়া গেল।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অধিকাংশ মৃত্যুই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট থেকে।
“মাদকসেবী বন্দি যারা আসেন, তারা এখানে মাদক না পাওয়ার একটা বিষয় আছে। আর অনেকেই এখানকার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় ডিপ্রেশনে বা ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েন। এসব কারণে তারা ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাছাড়া চিকিৎসক সংকটও আমাদের বড় সমস্যা।”
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন— এমএসএফ বলেছে, গেল দুই বছরে মারা যাওয়া ২২৭ জনের মধ্যে ৪০জন আওয়মী লীগের নেতাকর্মী।
আবার আইন ও শালিস কেন্দ্র— আসক কোনো দলীয় নেতাকর্মী পরিচয় না দিয়ে বলেছে, প্রায় একই সময়ে কারাবন্দি ১৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আর কারা কর্তৃপক্ষ দলীয় পরিচয় না দিয়ে বলেছে, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৩৪২ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
এমএসএফের হিসাবে, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে এ বছর ৬ জুলাই পর্যন্ত কারাবন্দি ২২৭ জনের সঙ্গে ৩০ জন মারা যান পুলিশ হেফাজতে।
অন্যদিকে ২০২৪ এর অগাস্ট থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত আসকের হিসাবে ২২জন গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনে মারা গেছেন।
এমএসএফ কারাবন্দির ব্যাপারে বলেছে, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর ওই বছর ৩ জন, ২০২৫ সালে ২২ জন এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ১৫ নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। আর এ সময়ে পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন আওয়ামী লীগের ৩ জন।
আইন ও শালিস কেন্দ্রের হিসাবে, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৪ জন কারাবন্দির মৃত্যু হয়েছে। এরপর ২০২৫ সালে ১০৭ জন এবং এ বছর জুন পর্যন্ত ৬১ জন মারা গেছেন। তবে তাদের কোনো দলীয় পরিচয় দেয়নি সংগঠনটি।
পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা তদন্ত হয়ে থাকে উল্লেখ করে পুলিশ সদর দপ্তরের সহাকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “এ ক্ষেত্রে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তদন্ত করে দেখা হয়। কারো কোনো গাফলতি থাকলে তার বা তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।”
আসক তাদের পরিসংখ্যানে বলছে, সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ডিসেম্বর গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনে ৭ জন এবং একই সময় কারাগারে ২৪ জন মারা গেছেন।
২০২৫ সালে গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনে মারা যান ১১ জন এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মারা যান ৪ জন। এ সময়ে কারাবন্দি মারা গেছেন যাথাক্রমে ১০৭ এবং ৫৯ জন।
এমএসএর পরিসংখ্যান হচ্ছে, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন ৩০ জন। আর এই সময়ে কারা হেফাজতে ২২৭ জন।
কারা কর্তৃপক্ষ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ২০২৪ সালে ১৮৯ জন, ২০২৫ সালে ১৩৬ এবং এ বছর জুলাই পর্যন্ত ১৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালের আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ২৩২ জনে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে বলে জানান এমএসএফ প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান।
“প্রায় প্রতিটি জেলায় আমাদের প্রতিনিধি আছে। তাদের দেওয়া তথ্য এবং জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকশিত তথ্য যাচাই করে তারপর আমরা প্রতিবেদন তৈরী করি।”
তার ভাষ্য, অনেক ঘটনাই প্রকাশ পায় না বা জানা যায় না। ফলে যে সংখ্যা প্রকাশিত হয় হেফাজতে মৃত্যু তার চেয়ে বেশী।
বগুড়া কারাগারে থাকা পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু বেশ অলোচিত হয়েছিল। তাদের অধিকাংশই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে কারা কর্তৃপক্ষ সে সময় বলেছিল।
গত সপ্তাহে কারাগারে বন্দি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মনির নামে এক যুবলীগ নেতার মৃত্যুর পেছনে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তোলে দলীয় নেতাকর্মীরা।
তাদের ভাষ্য, মনিরের বিরুদ্ধে ডজন খানেক মামলা দেওয়া হয়। এক একটি মামলায় জামিন পেলেও আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে রাখা হয়। প্রায় ১৭ মাস ধরে তিনি কারাগারে ছিলেন এবং মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়টির ব্যাপারে আমরা আশা করেছিলাম ৫ অগাস্টের পর কমে আসবে, আমরা পরিত্রাণ পাব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এটা কমছে না এবং কমানোর ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।”