শাফিন নেই এক বছর: ‘খারাপ সময়ে মনে হয় পাপাকে ফোন দিই’
“বাইরে থেকে উনাকে দেখতে সিরিয়াস মনে হলেও উনি ছিলেন দারুণ মজার মানুষ, একদম প্রাণবন্ত।”
দেশের ব্যান্ডসংগীতে শাফিন আহমেদ যেমন স্মরণীয় একটি নাম, তেমনি পরিবারে সন্তানদের কাছে তিনি ছিলেন এক নির্ভরতার জায়গা এবং একজন সাহস জোগানো বাবা।
শাফিনকে নিয়ে এই মন্তব্য তার মেয়ে রানিয়া দোলা আহমেদের।
বৃহস্পতিবার গায়কের প্রথম প্রয়াণ দিবসে গ্লিটজকে দোলা বলেছেন, তার বাবাই ছিলেন তার সবকাজের অন্যতম একজন ‘সমর্থক’, যার অনুপস্থিতি তিনি এখনো মেনে নিতে পারেননি।
শাফিনের তিন সন্তানের মধ্যে দোলা একমাত্র মেয়ে। গ্লিটজকে দোলা বলেছেন, তার খারাপ সময়ে ভরসা পেতে দুই মিনিটের জন্য হলেও বাবাকে ফোন করতেন তিনি।
“এমনও হয়েছে ওয়াশরুমে গিয়েও পাপাকে কল করেছি। দুই মিনিট কথা বললেই মনে হত, সব ঠিক হয়ে যাবে। এখনো মাঝে মাঝে ফোনটা হাতে নিই, মনে হয় পাপাকে ফোন দিই, কিন্তু আর তো সেই কণ্ঠটা শুনতে পাই না। আমার জীবনে উনার এই পাওয়ারটা খুব বেশি কাজে দিত।”
কনসার্ট করতে গেল বছরের জুলাইয়ের ৯ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন শাফিন। সেখানে একটি কনসার্টে গানও করেন। ২০ জুলাই ভার্জিনিয়াতে আরেকটি কনসার্টে পরিবেশনার কথা ছিল শাফিনের। কিন্তু হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে সেখানকার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চারদিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল তাকে, কিন্তু জীবনে ফেরানো যায়নি।
কফিনবন্দি হয়ে শাফিন দেশে ফেরেন ২৯ জুলাইয়ে। পরদিন ৩০ জুলাই বনানী কবরস্থানে শায়িত হন শাফিন।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বড় কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, ঘরোয়া আয়োজনে, নিজেদের মত করে বাবাকে স্মরণ করতে চাইছেন তার ছেলে-মেয়েরা।
দোলা বলেন, “পাপাকে সবাই যেভাবে চেনে, আমার কাছে উনি একদম অন্যরকম ছিলেন। তিনি ছিলেন আমার সেইফ স্পেস, আমার সবচেয়ে বড় সাপোর্ট। আমি সেই সাপোর্টটা খুব মিস করি। কাজগুলো যখন করতে যাই তখন আমার মনে হয় পাপার সাপোর্টটা যদি থাকত।"
দোলার চোখে তার বাবা ছিলেন রসিক এবং প্রাণবন্ত একজন মানুষ, যা হয়ত বাইরের মানুষের কাছে অজানা।
“পাপা সবাইকে প্রচণ্ড হাসাতে পারতেন। বাইরে থেকে উনাকে দেখতে সিরিয়াস মনে হলেও উনি ছিলেন দারুণ মজার একজন মানুষ, একদম প্রাণবন্ত। উনি আমাদের সঙ্গে অনেক মজা করতেন। আমাদের সকালটা শুরু হত তার সঙ্গে খুনসুটিতে।”
শৈশবের একটি ঘটনা মনে করে দোলা বলেন, “আমার বয়স তখন পাঁচ-ছয়। ঘুম থেকে উঠে আমি আর পাপা বিছানায় উল্টো হয়ে নিচে থাকা একটা কাঠের ড্রয়ারে ঠুকঠাক শব্দ করে পুরো বাসা জাগিয়ে তুলতাম। সেই ড্রয়ারে বেলের মত আওয়াজ হত, যা শুনে সবাই ঘুম থেকে উঠত। সেই স্মৃতিটা আমার কাছে অনেক প্রিয়। আমার প্রায়ই মনে পড়ে।”
শত ব্যস্ততার মাঝেও শাফিন আহমেদ বিশেষ দিনগুলোতে সময় দিতেন সন্তানদের।
"পাপা মিউজিক নিয়ে সবসময় ব্যস্ত থাকতেন, তবুও যতটুকু সময় পেতেন উনি আমাদের তিন ভাইবোনকে নিয়ে বের হতেন। খেতে নিয়ে যেতেন, ঘুরতে নিয়ে যেতেন৷ গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো উনি কখনো মিস করতেন না। দিনটা আমাদের জন্য রেখে দিতেন।"
পেশাগত জীবনে গান নিয়ে পথচলা হয়নি দোলার, কিন্তু বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মত।
তিনি বলেন, "আমার ভাই অজি যেরকম পাপার সঙ্গে গানের দিক থেকে, কাজের দিক থেকে একটা সম্পর্ক মেইনটেইন করে যেতে পারতেন। আমার দিক থেকে তো সেটা ছিল না, যেহেতু আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশায়। আমাদের যখন দেখা হত পাপার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতাম। চিন্তা, অনুভূতি পরিকল্পনা সবকিছু শেয়ার করতাম। উনি আমার মাইন্ড সেট আপ করে দিতে পারতেন।"
দোলা বলেন,"পাপা অনেক অনেক বুদ্ধিমান ছিলের এবং তার কাছ থেকে প্রতিটা মুহূর্ত ছিল লার্নিংয়ের। সব কাজ আমাকে কনফিডেন্সের সঙ্গে করাটা শিখিয়েছেন। নিজেকে ভালো রাখা, ফিট রাখা এবং সব কিছু ম্যানেজ করে চলার এক অদ্ভুত শক্তি ছিল পাপার।"
নিজের তৈরি ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘রনো’ নিয়ে কাজ করছেন দোলা। প্রতিদিনের পথচলায় বাবার অনুপস্থিতি অনুভব করেন সবচেয়ে বেশি। কারণ দোলা মনে করেন, তার জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে শাফিনের উপস্থিতি ছিল।
মেয়ের প্রথম ফ্যাশন শোতে উপস্থিত ছিলেন শাফিন আহমেদ। সেই স্মৃতি মনে করে রানিয়া বলেন, "আমার প্রথম ফ্যাশন শো যেদিন হয়েছিল পাপা তখন সামনের সারিতে বসে ছিলেন। আমি যখন র্যাম্পে হাঁটছিলাম পাপা তখন চিৎকার করে বলছিলেন ‘রানি, ইউ আর দ্য বেস্ট’। আমি এখনো সেই ভিডিওটা দেখি, কল্পনায় সেই দিনটা ফিরে আসতে চাই। খুব শান্তি লাগে এটা ভেবে যে, বাবার জীবদ্দশায় তিনি আমার প্রথম শোটা দেখে গিয়েছিলেন।”
শাফিন আহমেদের গান আরো অনেক শ্রোতার মত তার মেয়ের জীবনের অংশ হয়ে আছে।
“ছোটবেলা থেকেই পাপার গান শুনে বড় হয়েছি, একদম সব গান মুখস্থ। উনার সব গানই আমার পছন্দের, কিন্তু ‘প্রথম প্রেমের মত’, ‘শেষ ঠিকানা’ এই গানগুলো বেশি পছন্দের। কনসার্টে পাপার প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা দেখতাম, তা ছিল অসাধারণ।”
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে কী করা হচ্ছে প্রশ্নে শাফিন আহমেদের ছেলে রাফিন আহমেদ অজি গ্লিটজকে বলেন, “পরিবারের সবাই মিলে মিলাদের আয়োজন করেছি। আমরা একসঙ্গে হয়ে বাবার জন্য দোয়া করব।"
আমি আর চাচা (হামিন আহমেদ) মিলে বাবার কবর জিয়ারত করতে যাব।”
শাফিন আহমেদের জন্মদিন ঘিরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছিল, তবে মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটি তারা পারিবারিকভাবে পাড়ি দিতে চান বলে জানিয়েছেন অজি।
“মৃত্যুবার্ষিকীটা পরিবার নিয়ে ছোট করে নিজেদের মধ্যে করতে চাই। বাবার স্মৃতিগুলো মনে করে আবেগটা নিজেদের মধ্যে রাখতে চাই।”
অজি নিজেও গান করেন। বাবার সঙ্গে মঞ্চে একসঙ্গে 'জাদু' গানটি গেয়েছেন তিনি। সেই গানটি নতুন আয়োজনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে অজির।
তিনি বলেন,"“বাবা আর আমি ‘জাদু’ গানটা সবসময় একসঙ্গে গাইতাম। সেই গানটি নিয়ে আমি নতুন বিটসের উপর কাজ করেছি। গানটি অগাস্টের শেষের দিকে প্রকাশ করতে পারি।”
ফেইসবুকে এক পোস্টে শাফিনকে স্মরণ করেছে তার বড় ভাই ও ‘মাইলসের’ ভোকালিস্ট হামিন আহমেদ।
তিনি লিখেছেন, শাফিন অনন্তলোকে চলে গেলেও তিনি বেঁচে আছেন পরিবার, বন্ধু, ভক্ত এবং শুভাকাঙ্খীদের মনে।
বাংলাদেশের সংগীত অঙ্গনের দুই মহারথী সংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগম এবং সুরকার কমল দাশগুপ্তের ছেলে শাফিন নিজে ছিলেন বেইজ গিটারিস্ট, সুরকার এবং গায়ক।
পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে ছোটবেলা থেকেই গানের আবহে বেড়ে উঠেছেন শাফিন। বাবার কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত আর মায়ের কাছে নজরুলগীতি শিখেছেন।
ফরিদ রশিদের হাত ধরে ১৯৭৯ সালে বড় ভাই হামিন আহমেদ ও শাফিন গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘মাইলস’। প্রথম কয়েক বছর তারা বিভিন্ন পাঁচতারা হোটেলে ইংরেজি গান গাইতেন।
এরমধ্যেই প্রকাশিত হয় দুইটি ইংরেজি গানের অ্যালবাম ‘মাইলস’ ও ‘এ স্টেপ ফারদার’। পরে মাইলসের বাংলা গানের প্রথম অ্যালবাম ‘প্রতিশ্রুতি’ বের হয় ১৯৯১ সালে।
ওই অ্যালবামের জনপ্রিয়তার পর বিটিভিতে বিভিন্ন গানের অনুষ্ঠানে দেখা যেতে থাকে মাইলসকে। ধীরে ধীরে মাইলস দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ডে পরিণত হয়।
মাইলসের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘চাঁদ তারা সূর্য’, ‘প্রথম প্রেমের মতো’, ‘গুঞ্জন শুনি’, ‘সে কোন দরদিয়া’, ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘ধিকি ধিকি’, ‘পাহাড়ি মেয়ে’, ‘নীলা’, ‘কি যাদু’, ‘কতকাল খুঁজব তোমায়’, ‘হৃদয়হীনা’, ‘স্বপ্নভঙ্গ’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘শেষ ঠিকানা’, ‘পিয়াসী মন’, ‘বলব না তোমাকে’, ‘জাতীয় সঙ্গীতের দ্বিতীয় লাইন’ ও ‘প্রিয়তমা মেঘ’।
কয়েক বছর আগে মাইলস থেকে আলাদা হয়ে শাফিন আহমেদ গড়ে তোলেন ‘ভয়েস অব মাইলস’ নামের তার নিজস্ব একটি ব্যান্ড। তবে সেই ব্যান্ডটিরও আর কোনো অস্তিত্ব নেই।
