Published : 14 Jul 2026, 10:46 PM
গ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকার কর মওকুফ এবং মামলা প্রত্যাহারের খবর ‘ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর’ বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “মুহাম্মদ ইউনূস (অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে) ক্ষমতায় থাকাকালে তার পক্ষে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়েছে—এমন সংবাদ প্রায় সব গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মামলা মামলার জায়গাতেই আছে। এটি এখনো বিচারাধীন এবং বিভিন্ন সময়ে আমরা নিজেরাই শুনানির জন্য কার্যতালিকাভুক্ত করেছি।"
তিনি জানান, বর্তমানে বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের হাই কোর্ট বেঞ্চে মামলাটি শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
কর বিরোধের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মামুন বলেন, "গ্রামীণফোন থেকে লভ্যাংশ দেওয়ার সময় উৎসে ১৫ শতাংশ কর কেটে রাখা হয়। সেই কর পরিশোধের পর আবার কেন অতিরিক্ত কর ধার্য করা হবে—এই প্রশ্নেই আমরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি। অথচ বিষয়টি 'কর ফাঁকির মামলা' হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।"
সাংবাদিকদের উদ্দেশে এ আইনজীবী বলেন, "মামলাটি এখনো বিচারাধীন এবং নিয়মিত কার্যতালিকায় রয়েছে। তাই এ বিষয়ে জনমনে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা দূর করাও গণমাধ্যমের দায়িত্ব।"
মামলার সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসের সম্পৃক্ততার বিষয়ে মামুন বলেন, তিনি একসময় গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন।
“বর্তমানে মামলাটি প্রতিষ্ঠানের নামে চলছে এবং বর্তমান কর্মকর্তারাই আইনগতভাবে এটি পরিচালনা করছেন।"
কর বিরোধের পটভূমি
আইনজীবী মামুন জানান, কোম্পানি আইনের ২৮ ধারার অধীন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণ কল্যাণ 'এন্ডোমেন্ট ফান্ড' গঠন করে। তহবিলের অর্থ বাড়ানোর লক্ষ্যে গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে গ্রামীণফোনের ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ শেয়ারে বিনিয়োগ করা হয়।
তার ভাষ্য, ওই বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত মুনাফার ৪২ শতাংশ পেত গ্রামীণ কল্যাণ এবং ৫৮ শতাংশ পেত গ্রামীণ টেলিকম।
মামুন বলেন, ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ কল্যাণ নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছে। ২০১৭ সালে কর গোয়েন্দা বিভাগের উদ্যোগে চার বছরের কর নথি পুনরায় খোলা হয়। পরে জয়েন্ট কমিশনার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন।
আদালতে আসার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "কমিশনারের অনুমোদিত বিষয় পুনরায় খোলার এখতিয়ার জয়েন্ট কমিশনারের ছিল না। রিটে দুটি প্রশ্ন তোলা হয়েছে—উৎসে কর পরিশোধের পর আবার ৬৬৬ কোটি টাকা কর আরোপ কতটা বৈধ এবং কমিশনারের অনুমোদিত বিষয়ে জয়েন্ট কমিশনার কীভাবে পুনরায় ব্যবস্থা নিলেন।"
আগের রায় কেন প্রত্যাহার হয়েছিল
গ্রামীণ কল্যাণের আরেক আইনজীবী খাজা তানভীর বলেন, একই বিষয়ে দুটি রিট মামলা একসঙ্গে শুনানি হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট প্রথম রায় দেওয়া হয়। পরে ৩ অক্টোবর হাই কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সেই রায় প্রত্যাহার করে নেয়।
তিনি বলেন, "রায় লেখার সময় বেঞ্চের একজন বিচারপতি লক্ষ্য করেন, তিনি একসময় এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। স্বার্থের সংঘাত এড়াতে আইনি বিধান অনুযায়ী রায়টি প্রত্যাহার করা হয়। এরপর মামলাটি প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে নতুন বেঞ্চে পাঠানো হয়।"
কর আরোপের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, একই আয়ের ওপর একদিকে উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সেটিকে 'আউটসোর্সিং ইনকাম' হিসেবে দেখিয়ে আবার কর আরোপ করা হয়েছে।
“যদি পুনরায় কর আরোপ করা হয়, তাহলে গ্রামীণ টেলিকমের পরিশোধ করা করের বিষয়টিও সমন্বয়ের আওতায় আনা উচিত ছিল।"
এ আইনজীবী বলেন, গ্রামীণ কল্যাণের সম্পদের কোনো অংশ ব্যক্তিগত মালিকানায় যায় না। প্রতিষ্ঠানের সব আর্থিক কার্যক্রম নিরীক্ষা ও কর রিটার্নের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক না থাকলেও গ্রামীণ কল্যাণ দরিদ্র নারী সদস্য ও তাদের পরিবারের কল্যাণে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করে আসছে বলে তিনি দাবি করেন।