Published : 14 Jul 2026, 10:59 PM
কক্সবাজারে বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তবে পানি নেমে যাওয়ার পর নতুন করে সামনে এসেছে ত্রাণ বণ্টন নিয়ে অসন্তোষের চিত্র।
সোমবার কক্সবাজার সদর উপজেলার চাঁদেরপাড়া এলাকায় সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বন্যাদুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন।
কিন্তু সেখানে আগে থেকেই জড়ো হওয়া কয়েকশ মানুষের মধ্যে মাত্র ১০০টি পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। এরপর ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শেষ হলে খালি হাতে ফিরে যেতে হয় অপেক্ষমাণ অনেক মানুষকে।
ত্রাণ না পেয়ে ফিরে যাওয়া মানুষের অনেকেই অভিযোগ করেন, বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তারা কার্যকর কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। কেউ কেউ বলছেন, কয়েকদিন আগে একটি বিরিয়ানির প্যাকেট পেয়েছিলেন, কিন্তু পরিবার চালানোর মতো চাল, ডাল কিংবা প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী এখনো তাদের হাতে পৌঁছেনি।
ত্রাণের আশায় আসা মরিয়ম বেগম বলেন, “আমাদের ঘরে এখনো পানি। গরু-ছাগল ঘরের ভেতরে রাখতে হচ্ছে। গ্যাস নেই, রান্না করতে পারছি না। অনেক কষ্টে আছি। ত্রাণ পাব এই আশায় এসেছিলাম। কিন্তু আমার কই, কিছুই পেলাম না।”
শাহীন আলম বলেন, “বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে একটা বিরিয়ানির প্যাকেট ছাড়া আর কিছু পাইনি। অনেকে পেয়েছে, কিন্তু আমরা পাইনি।”
চাঁদেরপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ত্রাণ বিতরণ শেষ হওয়ার পরও অনেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা এসে অল্প কিছু মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে চলে যান, কিন্তু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বড় একটি অংশ সহায়তার বাইরে থেকে যায়।
এই চিত্র শুধু কক্সবাজার সদরেই সীমাবদ্ধ নয়।
চকরিয়ার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের হাজিরপাড়া এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার আলম বলেন, তাদের এলাকায় এখনো কোনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছায়নি।
“আমরা ছয়জনের পরিবার। সরকারি কোনো কিছুই পাইনি,” বলেন তিনি।
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা ফরিদুল আলম বলেন, তারা যে সহায়তা পেয়েছেন, তা দুই দিনের বেশি চলার মত নয়।
“চিড়া, মুড়ি, চিনি আর এক বোতল পানি দিয়েছিল। এগুলো দিয়ে কয়দিন চলবে,”- প্রশ্ন তার।

প্রশাসন যা বলছে
ত্রাণ বিতরণে উপস্থিত স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. নাছির উদ্দিন বলেন, প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে ১০০টি পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। যারা পাননি, তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বরাদ্দ এলে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, উপকারভোগীদের নির্বাচন করা হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে।
তার ভাষায়, “যারা পানিবন্দি এবং দুঃস্থ ছিলেন, তাদের তালিকা করা হয়েছে। আপাতত ১০০ জনকে দেওয়া হয়েছে। আরও বরাদ্দ এলে আরও দেওয়া হবে।”
তবে মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, তালিকার বাইরে থাকা বহু দুর্গত পরিবার দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কোনো সহায়তা পাননি।
‘সব ঘরেই পানি উঠেছে, শুরুতে বুঝতে পারিনি’
ত্রাণ বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, “শুরুতে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা পুরোপুরি বোঝা যায়নি। আজ এসে দেখলাম প্রায় সব ঘরেই পানি উঠেছে।”
তিনি বলেন, জেলা, উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যরা বন্যার প্রথম দিন থেকেই মাঠে কাজ করছেন। সরকারের লক্ষ্য, কোনো পরিবার যেন ত্রাণ সহায়তা থেকে বঞ্চিত না থাকে।
প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে বিলম্বের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, দুর্গম এলাকায় প্রশাসন বিজিবি, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সহায়তা নিচ্ছে।
তার দাবি, “অধিকাংশ জায়গায় আমরা পৌঁছে গেছি। কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে সেটিও পূরণ করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাকে ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতিটি গ্রামের তথ্য সংগ্রহ করে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়।”
তিনি বলেন, সরকার এখন পুনর্বাসন পরিকল্পনার তথ্য সংগ্রহ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘর, কৃষিজমি, গবাদিপশু, মৎস্য খামারসহ বিভিন্ন খাতের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বন্যায় নিহত পরিবারগুলোর দায়িত্বও সরকার নেবে বলে জানান তিনি।
মাঠপর্যায়ে যা দেখা গেল
তবে গত কয়েকদিন ধরে চকরিয়া, পেকুয়া ও কক্সবাজার সদরের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন একটি চিত্র পাওয়া গেছে।
অনেকেই বলছেন, প্রধান সড়কসংলগ্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ হলেও ভেতরের গ্রামগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা পৌঁছেনি। কোথাও কোথাও মানুষ নিজেদের সঞ্চিত খাবার শেষ করে ধার-দেনা করে দিন পার করছেন। আবার অনেকে এখনো আশ্রয়কেন্দ্র বা আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করছেন।
বন্যার পানি কমে গেলেও কাদা, নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার, পানীয় জলের সংকট এবং আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারের জন্য সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চকরিয়ার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের হাজিরপাড়া এলাকার বাসিন্দা ক্ষতিগ্রস্ত নুরুল আলম বলেন, “সহযোগিতা খুবই কম পেয়েছি। পরিবারে ছয়জন সদস্য। যে সহায়তা পেয়েছি, তা দিয়ে কোনোভাবেই সংসার চলে না।”

কৃষির ক্ষয়ক্ষতি
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রাথমিক হিসাবে কক্সবাজারে অন্তত চার হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, শীতকালীন সবজি এবং পানের বরজ।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। তখন আর্থিক ক্ষতির হিসাবও প্রকাশ করা সম্ভব হবে।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন দুর্গত মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা- খাদ্য সহায়তা, পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে দ্রুত ফিরে যাওয়ার সুযোগ।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে থাকা টানা অতি বৃষ্টিতে ৩১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এ সময় পানিবন্দি থাকে অন্তত সাড়ে ৪৮ হাজার পরিবার আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় দুই লাখ মানুষ।