Published : 01 Feb 2026, 09:50 PM
ঘরের ভিটার একপাশে স্তূপ করে রাখা পোড়া টিন, স্টিলের আলমারি। গাছের পুড়ে যাওয়া পাতাগুলোতেও ফেরেনি প্রাণ। সেগুলো দেখিয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছেন আরতি শীল।
মাস পেরুলেও পঞ্চাশোর্ধ্ব এই নারী ভুলতে পারছেন না তার ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া সেই রাতের ঘটনা। সেই কথা মনে করে বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আরা বছর দুক্কে দুক্কে দিন কাডায়। কী আঁর অপরাদ? কিয়া ন আয়ের আঁর সুখ? (সারা বছর দুঃখে দুঃখে দিন গেল। কী আমার অপরাধ? কেন আসছে না আমার সুখ?)“
গত ২৩ ডিসেম্বর ভোর রাতে রাউজানের সুলতানপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আরতি শীল ও সুলাল শীল ওরফে সুখ শীল দম্পতির বাড়িতে দরজা আটকে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। আগুনে পুড়ে যায় বাড়ির সবকিছু। ঘরের বেড়া কেটে বের হয়ে আসতে পারায় বেঁচে যান বাড়িতে থাকা লোকজন।
রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় ওই সময় আরও বেশ কয়েকটি ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। যেগুলোর প্রত্যেকটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি।
রাউজান-রাঙামাটি সড়কের কুণ্ডেশ্বরী থেকে উত্তরপাশে সুলতানপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ক্ষতিগ্রস্ত সুখ শীলের বাড়ি। মূল সড়ক থেকে মাটির পথ ধরে অল্পকিছু দূরে এ বাড়ির অবস্থান। টিন ও বাঁশের বেড়ার তৈরি এ ঘরের পাশে বিস্তীর্ণ বিল। আশেপাশে কোনো ঘর নেই। সড়কের অপর পাশে একটি পাকা দোতলা বাড়ি।
রোববার সেই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল চার কক্ষের বাড়িটির পূর্ব দিকে মূল দরজা। আগুনে ঘরের দরজার সামনে বড় শিশু গাছ, উত্তর পাশে কাঁঠাল গাছ পুড়ে গেছে। এখনও গাছগুলোতে রয়ে গেছে পোড়ার ক্ষত।
আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরটি মাস পার হলেও গড়ে উঠেনি। ঘরের পাশে টিন শেড একটি কক্ষ তৈরি করে সেখানে করা হয়েছে পূজার ঘর। বাড়ির বাসিন্দারা সবাই এক মাস ধরে ছিলেন প্রতিবেশী একটি বাড়িতে। রোববার থেকে আরেকটি ঘর ভাড়া নিয়েছেন বাড়ির কাছে।
রোববার পোড়া ওই বাড়িতে ওই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সুখ শীলের স্ত্রী আরতি শীল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সে রাতে কীভাবে ঘরের বেড়া কেটে দেড় বছর বয়সি নাতনিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বের হয়ে এসেছিলেন।
ঘরের মূল দরজা আটকে পেছন দিকে আগুন দেওয়ার দাবি করে তিনি বলেন, আগুন দেখে তারা দ্রুত বের হওয়ার চেষ্টা করলেও বের হতে পারেনি। পরে ঘরের বেড়া কেটে বের হয়ে আসেন।
“রাতে আমি আমার ছেলের বৌ ও দুই নাতনি নিয়ে ঘুমিয়েছিলাম এক ঘরে। দরজার পাশের ঘরে ছিলেন আমার ননদ, তার স্বামী অনিল শীল ও আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসা এক নাতনি।
“ভোর রাতে আমার ছেলের বৌ হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন আগুন। চিৎকারে সবাই দরজা খুলে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও দরজা খুলছে না। এসময় দা দিয়ে বেড়া কেটে আমরা বের হয়েছি।”
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছিলেন, “আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে গেছে তা দেখলে বোঝানো যাবে না। আমার দেড় বছর বয়সি নাতনিকে বুকে জড়িয়ে আমি বের হয়ে আসছি। আমাদের চিৎকারে অন্য বাড়ির লোকজন ছুঁটে এসে পানি দিয়ে আগুন নেভায়। ততক্ষণে সবকিছু পুড়ে শেষ।”
আরতী বলেন, ঘরের কোনো কাপড়, জিনিস কিছুই বের করা যায়নি। শুধু মানুষগুলো প্রাণ নিয়ে বের হয়ে এসেছি। মানুষের দেওয়া কাপড় পরে দিন কাটছে।
সুখ শীল ও তার বড় ছেলে কাতার প্রবাসী। ছোট ছেলে থাকেন দুবাইয়ে। ছোট ছেলের পরিবার চট্টগ্রাম শহরে। বাড়িতে থাকেন সুখ শীলের বোন ও বোন জামাই। বোনের ছেলে মিঠুন শীল গত সেপ্টেম্বরে পাঁচ মাসের জন্য এসেছেন দুবাই থেকে। গত নভেম্বরে বিয়ে করেছিলেন।
ছোট বেলা থেকে মামা বাড়িতে বড় হয়েছেন মিঠুন শীল। বাবা-মা আর দুই বোন সবাই এ বাড়িতে থাকতেন। দুই বোনের বিয়ে দেওয়ার পর সুখের আশায় ২০২১ সালে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। সেখানে সেলুনে কাজ করেন।

মিঠুন বলেন, সাড়ে পাঁচ বছর পর তিনি দেশে এসেছেন গত ২০ সেপ্টেম্বর। ৭ নভেম্বর বিয়ে করেছিলেন। আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি তার চলে যাবার কথা।
“আমার পাসপোর্ট, দুবাইয়ের ওয়ার্ক পারমিট কার্ড, সবকিছুই একসাথে ছিল। কিন্তু আগুনে সব পুড়ে গেছে। হাতের কাছে থাকা মোবাইল ফোন ছাড়া আর কিছুই বের করতে পারিনি।
“পাসপোর্টটা তৈরি করেছি আবার। ভিসার জন্য আবেদন করেছি। এখনও হাতে পাইনি। বলতে পারছি না ৬ তারিখে যেতে পারব কিনা।”
বাড়িতে আগুন লাগার খবর পেয়ে কাতার থেকে দেশে ফিরেছেন সুখ শীলের ছেলে দীপক শীল।
তিনি বলেন, “আগুন লাগার খবর পেয়ে তিন দিন পর দেশে এসেছি। সবকিছুই শেষ। অন্যের বাড়িতে উঠেছি। আজ থেকে আমরা একটা ঘর ভাড়া নিয়েছি থাকার জন্য।”
রাউজানে যে বাড়িগুলোতে আগুন দেওয়া হয় সেগুলোর কাছেই হাতে লেখা ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে লেখা ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম।
এ ঘটনায় মোট সাতজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছিল পুলিশ।
গ্রেপ্তারের পর চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ সরাসরি কোনো সংগঠনের নাম না নিয়ে বলেছিলেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাই ‘নিষিদ্ধ সংগঠনের’ সক্রিয় নেতা ও কর্মী।

ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পরিদর্শন
রাউজানের বাড়িগুলোতে একই কায়দায় বাইরে থেকে দরজা আটকে আগুন দেওয়ায় তা আলোচনায় আসে। এ ঘটনার মাস খানেক পর রোববার ওই এলাকা পরিদর্শন করে বিভিন্ন পেশাজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধি দল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌসের নেতৃত্বে ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, কবি ও সাংবাদিক হাফিজ রশিদ খান, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সতেজ চাকমা, ব্লাস্ট চট্টগ্রাম ইউনিটের স্টাফ আইনজীবী তাসনিয়া আল সুলতানা, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুসন্ধান কর্মকর্তা তাওহীদ আহমেদ রানা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক প্রিয় জ্যোতি চাকমা রিবেক।
পরিদর্শন শেষে রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, “হত্যার উদ্দেশ্যে আগুন দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় দেখেছি ডাকাতি বা চুরির উদ্দেশ্যে করে। এখানে বাইরে থেকে দরজা আটকে দিয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। এর মানে ভেতরের মানুষগুলোকে পুড়িয়ে হত্যার একটা চেষ্টা। এটা খুবই ভয়ংকর ও হৃদয়বিদারক।”
এ ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন বেশি ‘মনোযোগ’ দিচ্ছে না অভিযোগ করে তিনি বলেন, প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। নির্দোষ কাউকে যেন ফাঁসানো না হয়, বাণিজ্য না হয়। এখানে কত বাড়ি পোড়া হয়েছে এবং কত ক্ষতি হয়েছে তার সঠিক মূল্যায়ন এখানে করা হয়নি। কত মানুষের ঘর পোড়া হয়েছে কত সম্পদের ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করতে হবে এবং প্রকৃত খরচ দিতে হবে।
নাগরিক উদ্যোগের জাকির হোসেন নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের একটা তালিকা তৈরি করে অতি দ্রুত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান।
স্থানীয়রা প্রতিনিধি দলকে বলেছেন, বর্তমানে স্থানীয়রা রাতে গ্রাম পাহারা দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
হিন্দু বাড়িতে আগুন: চট্টগ্রামে আরও ৬ জন গ্রেপ্তার
রাউজানে হিন্দু বাড়িতে আগুন: 'শত্রুকে ফাঁসাতে', দাবি আটক ব্যক্তির