Published : 27 Jun 2026, 02:31 PM
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। গত দুই দশকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করে অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পপার্ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন সময়ে বিদেশে রোডশো, বিনিয়োগ সম্মেলন এবং কূটনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিনিয়োগবান্ধব গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রত্যাশিত বিনিয়োগের বড় অংশ এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ হলো শিল্পায়নের সবচেয়ে মৌলিক পূর্বশর্ত নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ—নিশ্চিত করতে না পারা।
শিল্প উৎপাদনের জন্য ভূমি, শ্রম ও পুঁজি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, জ্বালানিও ততটাই অপরিহার্য। অথচ বাংলাদেশে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহের সংকট দীর্ঘদিন ধরেই প্রকট আকার ধারণ করেছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হলেও তাদের অনেকেই বছরের পর বছর গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। ফলে বিনিয়োগের বিপুল অংশ অলস পড়ে আছে এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৭,৩২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে দুটি কারখানা নির্মাণ করেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। কিন্তু গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় কারখানাগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি আশ্বাসের ভিত্তিতে অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হলেও প্রতিষ্ঠানটিকে বছরে শত শত কোটি টাকা ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে সিটি গ্রুপ, হা-মীম গ্রুপ, টি কে গ্রুপ এবং বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজসহ আরও অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে, অথচ উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, শিল্প খাতে গ্যাস সংযোগের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ১,৮০০টিরও বেশি আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ও বিনিয়োগ সম্পন্ন করেও সংযোগ পায়নি। ফলে উদ্যোক্তারা উৎপাদন শুরু করতে না পেরে ঋণের সুদ, পরিচালন ব্যয় এবং অন্যান্য আর্থিক দায় বহন করছেন। এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ব্যাংকিং খাত, রপ্তানি সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানের ওপরও এর নেতিবাচক প্রতিফলন পড়ছে।
শুধু শিল্প খাতই নয়, বিদ্যুৎ খাতেও একই ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। বিদেশি ঋণে নির্মিত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারছে না। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ওই সক্ষমতা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করা যায়নি। এতে বিপুল বিনিয়োগের সম্পদ আংশিক বা সম্পূর্ণ অলস অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
আজ বাংলাদেশের বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই এমন—কারখানা প্রস্তুত, বিনিয়োগ সম্পন্ন, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি; কিন্তু জ্বালানি না থাকায় উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না। এই বাস্তবতা বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেয় না এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকেও দুর্বল করে।
এই সংকটের মূল কারণ কী? প্রায়ই জ্বালানি সংকটের জন্য ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কিংবা বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতিকে দায়ী করা হয়। নিঃসন্দেহে এসব ঘটনা জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের শেকড় আরও গভীরে প্রোথিত। দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, পরিকল্পনার ঘাটতি, জবাবদিহির অভাব এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি কৌশলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এ সংকটের প্রধান কারণ।
গত কয়েক দশকে জ্বালানি খাতের উন্নয়ন এমন এক ধারায় পরিচালিত হয়েছে, যেখানে দেশীয় সম্পদের টেকসই ব্যবহার ও অনুসন্ধানের তুলনায় ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর সমাধান বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের পরিবর্তে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি বা সরবরাহ ব্যাহত হলে তার সরাসরি প্রভাব দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর পড়ে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতির কারণে শিল্প খাতে নতুন সংযোগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিভিন্ন সময়ে সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বা বন্ধ করে অন্য খাতে সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করতে হয়েছে। কৃষিনির্ভর একটি দেশে যেখানে জ্বালানি সংকটের কারণে নিজস্ব সার উৎপাদন ব্যাহত হয়, সেখানে বৃহৎ শিল্পায়নের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা যে কঠিন হবে, তা বলাই বাহুল্য।
এ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো নীতিনির্ধারণ, বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের মধ্যে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক পৃথকীকরণের অভাব। অনেক ক্ষেত্রে একই প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে নীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং তদারকির দায়িত্ব কেন্দ্রীভূত থাকায় স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সরকারি কোম্পানিগুলোর বোর্ড কাঠামোও এ বাস্তবতার প্রতিফলন। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, এ খাতের ৩৭টি কোম্পানির ৩০৬ জন বোর্ড সদস্যের মধ্যে ১৬৭ জনই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। তাদের অনেকেই একাধিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে বোর্ডগুলোতে খাতসংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ বা স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সীমিত। এর প্রভাব করপোরেট সুশাসন, দক্ষতা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর পড়ছে।
একই সঙ্গে জাতীয় জ্বালানি নীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি এবং বিভিন্ন মহাপরিকল্পনার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবর্তে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রকল্প অনুমোদন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণও সংকুচিত হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতেও তুলনামূলক কম ব্যয়ের উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ ব্যয়ের উৎপাদন কাঠামোর ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। অপরিকল্পিত অবকাঠামো বিনিয়োগ, সক্ষমতা ও জ্বালানি সরবরাহের মধ্যে অসামঞ্জস্য এবং বিভিন্ন আর্থিক দায় খাতটির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
এর ফলাফল আজ স্পষ্ট। একদিকে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি—এই সম্মিলিত প্রভাব শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন সম্ভব নয়।
এ অবস্থায় দেশের বাইরে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য যত উদ্যোগই নেওয়া হোক না কেন, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক সফর, বিনিয়োগ সম্মেলন বা সমঝোতা স্মারক গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো জমি, অবকাঠামো ও জ্বালানি কি সময়মতো পাওয়া যাবে? যদি এর সন্তোষজনক উত্তর না থাকে, তাহলে বিনিয়োগের আগ্রহ বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেওয়া কঠিন।
তাই এখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুত গ্যাস সংযোগের ভিত্তিতে বিনিয়োগ সম্পন্ন করেছে, তাদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক ও সময়সীমাবদ্ধ সংযোগ পরিকল্পনা ঘোষণা করা প্রয়োজন।
বিনিয়োগ অনুমোদনের আগে জ্বালানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পরিবহন অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়ন এবং জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা আজ সময়ের দাবি। শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে জ্বালানি খাতকে রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে এনে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। অন্যথায় বিনিয়োগের আকাঙ্ক্ষা বাড়লেও শিল্পায়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিঃসন্দেহে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দেশের জ্বালানি সংকটের কার্যকর সমাধান এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা না গেলে এসব উদ্যোগের প্রত্যাশিত সুফল অর্জন করা কঠিন হবে।
অন্যথায় বিপুল ব্যয়ে আয়োজিত এসব উদ্যোগ কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব মোকাবিলায় শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। তাই সৃষ্ট সুযোগগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত করতে না পারলে বেকারত্ব সমস্যার টেকসই সমাধানও সুদূরপরাহতই থেকে যাবে।
শুভ কিবরিয়া সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: [email protected]