Published : 28 Jun 2025, 09:54 PM
আলোচিত নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় না কি অন্য কোনো ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে তা নিয়ে সিদ্ধান্ত দুই-একদিনের মধ্যে হওয়ার কথা বলেছেন নৌ পরিবহন উপদেষ্টা এম. সাখাওয়াত হোসেন।
বন্দর অভিমুখে রোড মার্চের মধ্যে শনিবার চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের উপস্থিতিতে দেশের প্রধান এ সমুদ্রবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্প বিষয়ক এক সভাতেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এ বৈঠকের পর এনসিটি পরিচালনা কার হাতে যাচ্ছে জানতে চাইলে নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন শনিবার সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘কাল বা পরশু এ ব্যাপারে জানা যাবে। চট্টগ্রাম বন্দর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করতে পারে। অন্য কতরকম উপায় আছে।
‘‘এজন্য পার্টিকুলারলি কিছু বলতে পারব না। মন্ত্রণালয়ের সাথে আলাপ-আলোচনা করে বলা যাবে। অনেক অপশন আমাদের কাছে আছে।‘‘
বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া হচ্ছে এমন আলোচনার মধ্যে বর্তমানে এনসিটি পরিচালনাকারী কোম্পানি সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের চুক্তির মেয়াদ আগামী ৬ জুলাই শেষ হচ্ছে। এর পরদিন থেকে বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনালটি কে পরিচালনা করবে সেটি নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।
এ টার্মিনাল পরিচালনার ভার বিদেশি কোম্পানিকে দিতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার- এমন খবরের পর এ নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি এর প্রতিবাদও হচ্ছে।
এ নিয়ে নিজের ইচ্ছা প্রকাশের পাশাপাশি বিরোধিতাকারীদের ‘প্রতিহত’ করার আহ্বানও জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
এই সিদ্ধান্তসহ সরকারের কয়েকটি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ‘সাম্রাজবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম শুক্র ও শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে রোড মার্চ করেছে।
এদিকে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে নতুন অপারেটর ঠিক না করা পর্যন্ত প্রয়োজনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন। কিন্তু কে পরিচালনা করবে সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় বন্দর বা নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে এর আগে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, বন্দর তার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কীভাবে টার্মিনাল পরিচালনা করবে সে প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরবর্তী ছয় মাস অথবা উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে নতুন অপারেটর নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত বন্দর এটি পরিচালনা করতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কন্টেইনার টার্মিনালের মধ্যে সবচেয়ে বড় এনসিটি। এ টার্মিনালের পাঁচটি জেটির মধ্যে চারটিতে কন্টেইনারবাহী বড় জাহাজ এবং অন্যটিতে অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলকারী ছোট জাহাজ ভেড়ানো হয়।
বন্দরে যত কন্টেইনার ওঠা-নামা করে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় এনসিটিতে। ২০২৪ সালে মোট কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর ৪৪ শতাংশ হয়েছে এ টার্মিনালে।
বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে এখানকার পাঁচটি জেটি নির্মাণ কাজ শেষ হয়। নির্মাণ কাজে বন্দরের খরচ হয়েছিল ৪৬৯ কোটি টাকা।
এর দুই বছর পর এনসিটির জন্য যন্ত্রপাতি কিনতে বিনিয়োগ করার শর্তে পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগে দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছিল। তখন বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি আগ্রহীও ছিল। পরে সেই দরপত্র বাতিল করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এরপর টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য ২০১২ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর দরপত্র সংশোধন করে কয়েকটি কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করার পর মামলা হলে টার্মিনাল পরিচালনা ঝুলে যায়।
নানা আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালের ২৫ জুন এনসিটির ৪ ও ৫ নম্বর জেটি পরিচালনায় বন্দরের সঙ্গে চুক্তি করে সাইফ পাওয়ার টেক এবং এর দুই অংশীদার কোম্পানি।
সে বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর এনসিটির ২ ও ৩ নম্বর জেটি পরিচালনায় বন্দরের সঙ্গে চুক্তি করে সাইফ পাওয়ার।
দরপত্রের মাধ্যমে দুই বছরের জন্য কোম্পানিটি এনসিটি পরিচালনার ওই দায়িত্ব পেয়েছিল। ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর এনসিটিতে কন্টেইনার ওঠানামার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
পরে এনসিটি পরিচালনায় আর দরপত্র ডাকা হয়নি। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) প্রতিবার ছয় মাসের জন্য এনসিটির টার্মিনালগুলো পরিচালনা করে আসছিল সাইফ পাওয়ার।
টানা ১১ বার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনা করে কোম্পানিটি। এরপর দ্বাদশতম বারের মত আরও ছয় মাসের জন্য তাদের এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
শুরু থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনায় কী-গ্যান্ট্রি ক্রেন ও রাবার টায়ারড গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ খরচ করেছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।
এনসিটিতে বছরে ১০ লাখ একক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর সক্ষমতা আছে। ২০২৪ সালে দেশি বেসরকারি অপারেটর এনসিটিতে ১২ লাখ ৮১ হাজার একক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করে।
আরও পড়ুন:
সরকার দেশবিরোধী সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটবে, আশা রোড মার্চে
'বন্দর বাঁচাতে, করিডোর ঠেকাতে' রোড মার্চ পৌঁছল চট্টগ্রাম বন্দরে
বন্দর বিদেশিদের দেওয়ার বিরোধিতাকারীদের ‘প্রতিহত’ করুন: প্রধান উপদেষ্টা
চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগের আলোচনা দ্রুত নিষ্পত্তি করুন: ইউনূস
বাংলাদেশে 'বিনিয়োগে আগ্রহী' ডিপি ওয়ার্ল্ড ও এপি মোলার-মেয়ার্স্ক