Published : 07 May 2026, 12:01 AM
বাছাই শেষে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না করার অভিযোগ তুলে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীপন্থি আইনজীবীদের সংগঠন ‘ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদ’।
বুধবার বিকালে জেলা আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার’ অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় তারা।
সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের সংগঠন ‘জাতীয়তাবদী আইনজীবী ফোরাম’ এর পক্ষ থেকে সমিতির পদ ‘সমঝোতার ভিত্তিতে ভাগাভাগির’ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তাদের। এতে রাজি না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাছাইকৃত বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
বিপরীতে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দাবি, মনোনয়ন ফরমের সঙ্গে টাকা জমা না দেওয়ায় জামায়াতপন্থিদের কয়েকজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। সমঝোতা প্রস্তাবের যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা ‘বানোয়াট’।
এদিকে দুই পক্ষের আইনজীবীদের বিরোধের জেরে নির্বাচন কমিশনেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের জন্য গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিশনের মধ্যে তিনজন বিএনপিপন্থি ও বাকি দু’জন জামায়াতপন্থি আইনজীবী হিসেবে পরিচিত।
এরইমধ্যে মঙ্গলবার রাতে জামায়াতপন্থি বলে পরিচিত দুই নির্বাচন কমিশনার এইচ এম আশরাফ উদ্দিন ও মোহাম্মদ ফরিদুল আলম এ কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ না করার ঘোষণা দিয়েছেন।
এর আগে ৪ মে মনোনয়ন ফরম বিতরণের দিন ‘বাধা দেওয়ায়’ আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা কোনো মনোনয়ন ফরম নিতে পারেননি। তবে সেদিন বিএনপি ও জামায়াতপন্থিদের দুটি প্যানেলে প্রার্থী হতে ইচ্ছুকরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেন।
এরপর বাছাই শেষে পরদিন বিকেলে বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশের সময় নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সেদিন তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক শামসুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তফসিল অনুসারে মনোনয়ন জমা দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ গতকাল (মঙ্গলবার) বিকাল ৫টার মধ্যে বাছাইকৃত বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশের সময় নির্ধারিত ছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনো তালিকা প্রকাশ করেনি।
“এরপর গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত আমাদের দুজন প্রতিনিধি, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের দু’জন এবং তিনজন নির্বাচন কমিশনার দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। ক্রীড়া সম্পাদক ছাড়া ২০টি পদেই মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছিলাম। আমাদের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীর কিছু টাকা বাকি ছিল। লাইব্রেরি মিলনায়তনের সামনে বাধা থাকায় তিনি আর টাকা দিতে ঢুকতে পারেননি।
“তারা (বিএনপিপন্থিরা) আমাদের প্রস্তাব দেয়, নির্বাচন হবে না। আপনাদের কিছু পদ দেব, বাকিগুলো আমাদের। আমরা বলেছি ভাগাভাগি চাই না। নির্বাচন হোক, আইনজীবীরা যাদের ভোট দেবেন তারাই নির্বাচিত হবেন।”
তার অভিযোগ, সমিতির গঠনতন্ত্র অনুসারে নির্ধারিত সময়ে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে না পারায় এই নির্বাচন কমিশন অবৈধ। তাদের আর কোনো ধরনের নির্বাচনি কার্যক্রম চালানোর বৈধতা নেই।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী না থাকায় ২১টি পদে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্যানেলের সবাইকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন।
সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের দুটি পদ পেয়েছিল বিএনপিপন্থি দুই আইনজীবী। সেবার মোট ১৪টি পদে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। একটি সহ-সভাপতি পদ ও দুটি সম্পাদকীয় পদসহ মোট সাতটি পদ পান জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা।
এদিকে বুধবার বিকালে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর এক লিখিত আবেদন করে ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদ। সমিতির প্রশাসনিক কর্মকর্তা সেই আবেদন গ্রহণ করেছেন বলে তথ্য দিয়েছেন অ্যাডভোকেট শামসুল আলম।
সমিতির গঠনতন্ত্রের বিধান লঙ্ঘন করায় বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাতিল করে তা পুনর্গঠন এবং আবার নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার দাবি তোলা হয় পরিষদের আবেদনে।
এসব বিষয়ে সমিতির বর্তমান সভাপতি আবদুস সাত্তার বলেন, “পরিষদের নেতৃবৃন্দ আমাদের কাছে এসে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছে। লিখিত আবেদন করেনি। তাছাড়া তফসিল হওয়ার পরে আমাদের আর কোনো ক্ষমতা নেই। এখন ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের।”
পরিষদের কয়েকজন মনোনয়ন ফরমের সঙ্গে টাকা জমা দেননি বলে তাদের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার কথা শুনেছেন তিনি।
সমঝোতার ভিত্তিতে পদ ভাগাভাগির প্রস্তাবের বিষয়ে আবদুস সাত্তারের ভাষ্য, “এসব বানোয়াট কথা।”
মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট রৌশন আরা বেগম বলেন, “দুটি প্যানেলে প্রার্থী হতে ইচ্ছুকরা মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন। জাতীয়তাবাদী ফোরামের ২১টি ফরমই বৈধ হয়েছে। জামায়ত ইসলামী সমর্থিত পরিষদের জমা দেওয়া ২০টি পদে মনোনয়ন ফরমের মধ্যে ১২টি বৈধ হয়েছে।
“তাদের ৮টি সম্পাদকীয় পদে মনোনয়ন বাবদ মোট ৬০ হাজার টাকা কম ছিল। তখন একটা চেক দেন তারা। পরিষদের প্রার্থীরা বলেছিলেন, সোমবার বিকেল ৫টার মধ্যে টাকা দিয়ে চেকটি নিয়ে যাবেন। অথচ তারা ফরম জমা দিয়েছেন বিকেল ৫টার পর। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্তও বাকি টাকাটা জমা দেননি। ওইদিনই কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়ে ৮টি মনোনয়ন পত্র বাতিল ঘোষণা করে।”
বৈধ প্রার্থীদের তালিকা মঙ্গলবার বিকালে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন না করার ঘোষণা দেওয়া এইচ এম আশরাফ উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা বলেছি, এরকম অনিয়ম করলে নির্বাচন কমিশনে থাকব না। প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। উল্টো সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়। যদি প্রার্থিতাই অবৈধ হয়, তাহলে তাদের সঙ্গে কীভাবে পদ ভাগের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে?
“টাকা ছাড়া যে ফরম জমা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটাও ঠিক না। টাকা ছাড়া ফরম জমা নেওয়া হয় নাকি? একজন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ৬০ হাজার টাকার চেক দিয়ে ফরম নিয়েছেন। একজন নির্বাচনি কর্মকর্তা তার জিম্মাদারও ছিলেন।”
সমিতির গঠনতন্ত্র অনুসারে প্রার্থীদের বৈধ তালিকা নির্ধারিত সময়ে প্রকাশ না করায় বর্তমান নির্বাচন কমিশন অকার্যকর হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এবার সমিতির নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের পক্ষে সভাপতি পদে তারেক আহমদ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।
বিপরীতে ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদের পক্ষে সভাপতি পদে সৈয়দ আনোয়ার হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মোহাম্মদ রাসেল মনোনয়ন নিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:
চট্টগ্রাম বার নির্বাচন: কোনো পদেই মনোনয়ন ফরম নিতে পারেননি আওয়ামীপ
চট্টগ্রাম বার নির্বাচন: আওয়ামীপন্থিদের মনোনয়ন ফরম নিতে 'বাধা'
চট্টগ্রাম বারে বিএনপি-জামায়াতপন্থিদের বিজয়ী ঘোষণা, প্রত্যাখ্যান
বিনা ভোটে জয়ের পথে চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির বিএনপি-জামায়াত
নতুন তফসিল, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির ভোট ১৬ এপ্রিল
নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ, ঝুলে গেল চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির ভোট
চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতি নির্বাচন: ফরম নিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ