Published : 04 May 2026, 10:19 PM
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা কোনো পদেই মনোনয়ন ফরম নিতে পারেননি।
বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দাবি, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ। ২০২৪ এর অগাস্টে ছাত্রজনতার আন্দোলন চলাকালে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তাই সমিতির নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই।
বিপরীতে আওয়ামীপন্থিদের দাবি, পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে হয় না।
মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের দিন সোমবার সমিতির ২১টি পদে দুটি প্যানেলের প্রার্থীরা মনোনয়ন ফরম গ্রহণ ও জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি বিএনপিপন্থিদের সংগঠন ‘জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম’ এবং অন্যটি জামায়াতপন্থিদের ‘ল’য়ারস কাউন্সিল’।
বিকাল ৩টার দিকে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থি আইনজীবীদের একাংশ 'সাধারণ আইনজীবী ফোরাম' নামে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের নির্ধারিত স্থান সমিতির লাইব্রেরির সামনে যান। তবে তারা লাইব্রেরি রুমে প্রবেশ করতে পারেননি।
শুরুতে বিএনপি ও জামায়তপন্থি আইনজীবীদের একাংশ ‘সাধারণ আইনজীবী ফোরাম’ এর নেতাকর্মীদের বাধা দিলেও পরে তারা সরে যায়। এরপরে আওয়ামীপন্থিদের লাইব্রেরি মিলনায়তনের দরজায়ও ধাক্কা দিতে দেখা গেছে।
২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা ‘আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ’ নামে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। গতবারও এই প্যানেলের কেউ মনোনয়ন ফরম নিতে পারেননি।
সোমবার বিকালে সাধারণ আইনজীবী ফোরামের আইনজীবীরা লাইব্রেরির সামনে দুই ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে 'ভোট চোর, ভোট চোর', 'পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা'- এমন স্লোগান দেন। পরে বিকাল ৫টায় মনোনয়ন সংগ্রহ ও জমাদানের নির্ধারিত সময় শেষ হলে তারা মিছিল নিয়ে সমিতি ভবন থেকে নেমে যান। নিচে গিয়ে মিছিল করেন।
সন্ধ্যায় মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট রৌশন আরা বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুটি প্যানেল ফরম নিয়েছে এবং জমা দিয়েছে। একটা জাতীয়তাবদী আইনজীবী ফোরাম এবং অন্যটি ইসলামি ল’য়ারস কাউন্সিল।”
‘সাধারণ আইনজীবী ফোরাম’ এর প্রার্থী হতে ইচ্ছুক আইনজীবীরা বাধার কারণে মনোনয়ন ফরম নিতে পারেননি- এমন অভিযোগের বিষয়ে রৌশন আরা বেগম বলেন, “আপানারা এই প্রশ্ন করার আগে যাচাইবাছাই করেছেন কিনা। আমরা তো দেখেছি, ৩ ও ৪ অগাস্ট (২০২৪ সালের) আমরা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সারাক্ষণ ভিজেছি। ওরা আমাদের উপরেই উঠতে দেয়নি।
“আওয়ামী লীগের কট্টর যারা, তারা ব্রিজগুলো দখল করেছিল সেদিন। লাঠি হাতে সেদিন বাচ্চাদের দৌড়াইছে। ওরা কীসের সাধারণ আইনজীবী। আমরা তো ওদেরকে চিনি। আমরা এখানে বেলা ১টা থেকে ছিলাম। যারাই এখানে এসেছে প্রত্যেককে ফরম দিয়েছি। কাউকে বাদ দিইনি।”
রৌশন আরা বলেন, “ওরা যদি ঢুকতে না পারে আমাদের কী করার আছে।”
তফসিল অনুসারে সোমবার বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সমিতির আসন্ন নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম গ্রহণ ও দাখিলের সময় নির্ধারিত ছিল।
এবারের নির্বাচনে ৫ মে বাছাই, ৮ মে প্রত্যাহার ও ৯ মে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ এবং ২১ মে ভোট গ্রহণের দিন ধার্য আছে।
‘তারা সাধারণ না’
আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের বাধা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপিপন্থি আইনজীবী নেতা কামরুল ইসলাম সাজ্জাদ বলেন, “৫ অগাস্টের পর অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে এবং জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই তারা এখানে শো ডাউন করতে এসেছে। যারা বৈধ রাজনৈতিক দল তারা সবাই আজ মনোনয়ন সংগ্রহ করেছে।
“যারা এসেছিল তারা অবৈধকে বৈধ করতে চেয়েছিল। তারা বহিরাগতদের নিয়ে এসে বিশৃঙ্খলা করেছে। সভাপতি প্রার্থী হিসেবে যিনি এসেছেন তিনি দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের নেতা। নেতৃত্ব দিয়ে যিনি এসেছেন, তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা। তারা নিজেদের লোকজন নিয়ে এসেছেন। তারা সাধারণ না।”
সাজ্জাদ বলেন, “পোশাক বদলে তারা ছাত্র হত্যাকে ভোলানোর চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালে একমাত্র চট্টগ্রাম আদালত অঙ্গনে শিক্ষার্থীদের তারা প্রহার করেছিল। সাধারণ আইনজীবীরা আমাদের সাথে আছে। সংঘাত চাই না বলে আমরা সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি।
“ইন্টেরিম সরকারের অধ্যাদেশে ও সংসদে পাস করা আইনে বলা আছে, আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন নিষিদ্ধ।”
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ হাসান আলী চৌধুরী বলেন, “ফরম দেওয়ার ও জমা নেওয়ার সময় ছিল বেলা ২টা থেকে ৫টা। নির্বাচনি বিধিমালা অনুসারে সব হয়েছে। প্রতি পোস্টে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আছে। শুধু মোমেনুল হক নামের এক আইনজীবী অভিযোগ করেছেন তাকে কেউ মেরেছে।
“এছাড়া ফরম নিতে বাধা দেওয়ার কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। নিষিদ্ধ লীগের দক্ষিণ জেলার সম্পাদকীয় পদে আছেন এমন একজন সভাপতি প্রার্থী হতে ফরম নিতে এসেছিলেন। নিষিদ্ধ দলের মনোনয়ন নেবার কোনো সুযোগ নেই।”
লাইব্রেরি মিলনায়তনের দরজা বন্ধ থাকার বিষয়ে হাসান আলী চৌধুরী বলেন, “তাহলে বিএনপি ও ১১ দল নমিনেশন (ফরম) নিল কীভাবে, দিলো (জমা) কীভাবে। কারা ঢুকবে না ঢুকবে সেটা নির্বাচন কমিশন ঠিক করবে।
“ভেতরে নির্বাচন কমিশন ছিল। বাইরে আইনজীবীরা। নিষিদ্ধ দলের নেতা যদি নিজেকে সাধারণ আইনজীবী বলে এর বিচার আইনজীবীরা করবে। আইনজীবী হিসেবে তারা বারের আইনজীবী। তাদের আইনগত কাজে কেউ বাধা দিলে সেটা দেখব। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করলে সেটা নির্বাচন কমিশন দেখবে।”
আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুস সাত্তার বলেন, “চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বা, যা হয়েছে আইন অনুসারে হয়েছে। আইনের বাইরে আমরা কিছু করতে পারি না। দেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। তারা এসে বললেও কিছু করার নেই। সমিতি আইন অনুসারে করেছে।
“আইন অঙ্গনকে তারা কলঙ্কিত করেছে ২০২৪ সালে। তখন আমি নিজেও আহত হলেও কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলা করিনি। আমরা উদারতার পরিচয় দিয়েছি। আমরা সহাবস্থান ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করি।”
‘নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা লজ্জাজনক’
মনোনয়ন ফরম নিতে না পারা আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এএইচএম জিয়া উদ্দিন বলেন, “কোনো দলীয় পরিচয়ে আমরা সেখানে যাইনি। এটা সাধারণ আইনজীবীদের প্যানেল। পেশাগত সেক্টরে সবাই আছি। এটা তো রাজনৈতিক কোনো সংগঠন না।
“তারা কোনো আইনজীবীর সদস্য পদ সমিতি থেকে বাদ দেয়নি। শুধু যারা নির্বাচন করতে চাইছে তাদের ফরম নিতে দিচ্ছে না। একজন সদস্য কী প্রার্থী হতে পারবেন না?”
তিনি বলেন, “আমাদের কাছে তথ্য আছে যারা মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন, তারা আগেই ফরম নিয়ে গেছেন। আজ (সোমবার) শুধু জমা দিছেন। না হলে দরজা বন্ধ অবস্থায় দুই ঘণ্টার ভেতর কীভাবে তারা ফরম জমা দিলো?
“নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত লজ্জাজনক। আমরা পরে সংবাদ সম্মেলন করে আমাদের সিদ্ধান্ত জানাব।”
সাধারণ আইনজীবী ফোরামের সভাপতি প্রার্থী হতে ইচ্ছুক অ্যাডভোকেট আবদুর রশিদ বলেন, “আমরা নির্বাচন কমিশনের শিডিউল মত প্যানেল থেকে মনোনয়ন সংগ্রহের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আসি। কিন্তু আমরা যখন আসি তারপর আমাদের আর ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমাদের নাকি ফরম দেওয়া হবে না। কেন দেওয়া হবে না, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।
“তখন তারা আমাদের লোকজন বেশি দেখার কারণে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে। সাধারণ আইনজীবীদের পক্ষে স্লোগান দিয়েছি। কোনো দলীয় স্লোগান দিইনি। শুধু আওয়ামী লীগ না, বিভিন্ন দলমতের আইনজীবীরা সেখানে ছিলেন।”
এর আগে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী না থাকায় ২১টি পদে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্যানেলের সবাইকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন।
সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের দুটি পদ পেয়েছিল বিএনপিপন্থি দুই আইনজীবী। সেবার মোট ১৪টি পদে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। আর একটি সহ-সভাপতি পদ ও দুটি সম্পাদকীয় পদসহ মোট সাতটি পদ পান জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির ইতিহাসে গত বছরই প্রথমবারের মত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ভোট হয়নি।
আরও পড়ন-
চট্টগ্রাম বার নির্বাচন: আওয়ামীপন্থিদের মনোনয়ন ফরম নিতে 'বাধা'