Published : 24 Aug 2025, 02:08 AM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের পরিবেশ ও ‘সবার জন্য সমান সুযোগ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষরা; নির্বাচন পেছানোর কথাও এক বৈঠকে বলেছেন তাদের কেউ কেউ।
প্রাধ্যক্ষদের এমন উদ্বেগের বিপরীতে নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা ও সমর্থন দুটোই থাকার কথা বলেছেন উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান।
তিনি এও বলেছেন, “এই আয়োজনে যতক্ষণ সবাই আমার হাত ধরবেন, ততক্ষণ আমি মাঠে থাকব। যেখানে আমার হাত ছেড়ে দেবেন, আমি পরিষ্কার আপনাদেরকে ডেকে বলে দেব যে, এই জায়গাতে আমার বাধা হচ্ছে।”
শুক্রবার রাতে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের কমিশন এবং প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভা হয়। ওই সভায় নির্বাচনি পরিবেশে নিয়ে বেশ কিছু উদ্বেগের কথা বলেছেন প্রাধ্যক্ষরা।
প্রাধ্যক্ষদের সভায় পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ এবং এর পাশাপাশি উপাচার্যের এক বক্তব্য প্রচার (যেটিকে বিকৃত হিসেবে দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগ) ঘিরে ভোট নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ শাখা থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে উপাচার্যের সঠিক বক্তব্যটি পাঠানো হয়।
এ নিয়ে গম অধিকার পরিষদ সমর্থিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছাত্র অধিকার পরিষদের ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন নানা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ডাকসু নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করছে।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমর্থিত প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী আবু বাকের মজুমদারও ডাকসু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। বলেন, “শিক্ষার্থীরা ও আমরা আশঙ্কা করছি যে এ নির্বাচন সুষ্ঠু হয় কিনা।”
ছয় বছরের বেশি সময় বিরতির পর ৯ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণের তারিখ রেখে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তফসিল অনুযায়ী, এখন মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই চলছে।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা অনুযাযী, ২৮টি পদের বিপরীতে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ৪৬২ জন।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী ভিপি পদে ৪৮ জন। জিএস পদে ১৯ জন ও এজিএস পদে ২৮ জনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রাধ্যক্ষদের উদ্বেগ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের উপর ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন উপাচার্য।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নে চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, এসব বিষয়ে রোববার বিস্তারিত কথা বলবেন তিনি।
প্রাধ্যক্ষদের যে ‘উদ্বেগ’
ওই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী পাঁচজন প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে আলাপে ওই বৈঠকের আলোচনার বিভিন্ন দিক জানতে পেরেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তবে তাদের কেউ নাম প্রকাশ করতে চাননি।
প্রাধ্যক্ষরা বলেন, সভায় কয়েকজন প্রাধ্যক্ষ নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকার (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নির্ধারিত তারিখে নির্বাচন করার ব্যাপারেও সন্দেহ প্রকাশ করেন তাদের কেউ।
নির্বাচনে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিতের বিষয়ে উদ্বেগ আসার কথা তুলে ধরে একজন প্রাধ্যক্ষ বলেন, “৫ই অগাস্টের পর থেকে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছে, তারা মব ক্রিয়েট করে বিভিন্ন রকম হেনস্তার সঙ্গে জড়িত ছিল।
“তারা এসে বিভিন্ন প্যানেল থেকে নির্বাচন করছে। এতে বিভিন্ন সংগঠনের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। কেননা তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে একক আধিপত্য বিস্তার করেছে।”
আরেকজন প্রাধ্যক্ষ বলেন, বিভিন্ন হলে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে ছাত্র প্রতিনিধিদের কেউ বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। বিভিন্ন সংগঠন ও ক্লাবগুলোতে ছাত্রদের কেউ কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে। সেটাও পরিবেশের একটা অন্তরায়।

এর আগে প্রভোস্ট স্টান্ডিং কমিটির পৃথক বৈঠকেও একই ধরনের আলোচনা হওয়ার কথা তুলে ধরে একজন প্রাধ্যক্ষ বলেন, প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক মামুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সভায় অনেক কথা এসেছে, তিনি একা কিছু বলেননি।
নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে মাস্টারদা সূর্যসেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবেশ কেমন আছে সেটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে সব মিলিয়ে। কোথাও ভালো, কোথাও সমস্যা আছে; অর্থাৎ ভালো মন্দ মিলিয়ে মতামত এসেছে।
“সমস্যাগুলো কীভাবে কাটানো যায় সেই বিষয়ে স্যার বলেছেন। ওভারঅল পরিবেশ ভালো রাখার জন্য বলা হয়েছে। সবার জন্য সমান সুযোগ রাখার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি, যাতে কারও জন্য সমস্যা তৈরি না হয়।”
যা বলছেন উপাচার্য
প্রাধ্যক্ষদের উদ্বেগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মোট ১২-১৩টি বিষয়ে বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষরা কথা বলেছেন।
“ছাত্রলীগের বিচার, ভোটার তালিকায় তাদের থাকার বিষয়, শৃঙ্খলা কমিটির বিষয়, ছাত্রশিবির যদি ইন্টারনালি থেকে যেয়ে থাকে বিভিন্ন ক্লাবে থাকলে কী হবে, বাগছাস বিভিন্ন নামে থাকলে কী হবে ইত্যাদি।”
তিনি বলেন, ”শুধু লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের বিষয় না। আলোচনাটা এসছে যে, হলকেন্দ্রিক সমস্যাগুলো আছে। সেক্ষেত্রে এগুলো আমরা যদি সমাধান না করে এগিয়ে যাই, তাহলে বড় বিপদ হবে কিনা।”
নির্বাচনের বিষয়ে ‘অবস্থান স্পষ্ট’ হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার অবস্থান এ ব্যাপারে খুবই স্পষ্ট যে, আমরা কোনো আইডিয়াল জগতে বসবাস করি না। আমাদের কাজ হচ্ছে প্রত্যেকটা কনসার্ন পেয়ে যত সম্ভব দূর করার চেষ্টা করা।”

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করার কথা তুলে ধরে নিয়াজ আহমেদ বলেন, “আমার অবস্থান হচ্ছে যে কবে সবকিছু নিখুঁত হবে, তারপর আমরা কাজ শুরু করব- এগুলো সবগুলো তাত্ত্বিক কথা।
“তাত্ত্বিক কথাবার্তার মধ্যে আমি নাই। আমার কথা খুব পরিষ্কার, আমি এখানে শখ করে নির্বাচনের জন্য আমি নামি নাই। এটা নেমেছি কারণ, এটাতে ব্যাপক এবং বিপুল একটা আগ্রহ ছাত্রদের আছে।”
প্রাধ্যক্ষদের প্রতিটি উদ্বেগ নিরসনের পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা প্রত্যেকটা পদক্ষেপ নিতে চাই, আমরা চাই যে আসলেই সবাই আসুক। এবং আমি প্রথম থেকেই বলছি, আমার যেহেতু ব্যক্তিগত এজেন্ডা কিছু নাই।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিলবোর্ড নামানো, সাইবার বুলিংয়ের ব্যাপারে বিটিআরসির সঙ্গে কথা বলা, অধ্যাপকদের সঙ্গে বৈঠক করাসহ ছয়টি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার বিষয়ে এক প্রশ্নে উপাচার্য বলেন, “শঙ্কাতো আছেই, আছে দেখেই আমি চেষ্টা করছি, সবাই চেষ্টা করছি। আবার এটাও সত্যি কথা অনেক সমর্থনও আছে। সমর্থন না থাকলেও টিকতে পারতাম না। এই ধরনের একটা আয়োজন, যেটা কোনো অর্থে জাতীয় নির্বাচনের চাইতেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি সাড়া জাগাচ্ছে।
“সেজন্য এইসব ক্ষেত্রে কিছু ষড়যন্ত্র থাকবে, কিছু সংঘাত থাকবে। আবার সমর্থনও আছে। শক্তিটাতো আমাদের ওটাই। আমি যদি কোনোরকম লুকোচুরি না করি, আমার যদি কোনো অসৎ উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে সফল হব।”
ডাকসু নির্বাচন: উপাচার্যের বক্তব্য ঘিরে ক্যাম্পাসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ডাকসু পেছানোর 'চেষ্টা করছে' বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন: বিন ইয়ামিন মোল্লা
মেধায় না পেরে শিবিরের নারী প্রার্থীদের 'সাইবার বুলিং' করছে: সাদিক
প্রার্থী হচ্ছেন যে যার মত, ডাকসুর দৌড়ে বাগছাস টিকবে?