Published : 23 Aug 2025, 12:00 AM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ-বাগছাস।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সংগঠনটি থেকে সরে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। আবার দলে থেকেও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন কেউ কেউ।
মাস ছয়েক আগে আত্মপ্রকাশ করা ছাত্রসংগঠনটির কোনো কোনো নেতা প্রার্থী হয়েছেন অন্যান্য প্যানেল থেকেও।
এসব ঘটনার পরম্পরায় আগামী ৯ সেপ্টেম্বরের ডাকসু নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের প্রার্থীরা কতটা সাফল্য পাবেন, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
নেতিবাচক প্রভাব যে ভোটের ক্ষেত্রে পড়বে, তা গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের জ্যেষ্ঠ নেতারাও মানছেন। কিন্তু সবার স্বাধীনতার প্রতি সম্মান জানাতে গিয়ে কিছু করার ছিল না বলে দাবি করছেন তারা।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ছাত্র সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ। কিন্তু আত্মপ্রকাশের প্রথম দিনই নিজেদের মধ্যে মারামারিতে জড়ায় সংগঠনটি।
সংক্ষেপে বাগছাস নামে পরিচিত ছাত্র সংগঠনটি জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির নেতাদের হাতে গড়া রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত, তবে নিজেদের তারা স্বতন্ত্র ও স্বাধীন ছাত্র সংগঠন হিসেবে দাবি করে আসছে।
ডাকসু নির্বাচনে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংসদ’ ব্যানারে লড়বেন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের নেতারা। এ প্যানেল থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী হয়েছেন আব্দুল কাদের; আর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার লড়বেন জিএস পদে।
এজিএস পদে লড়বেন সংগঠনটির সদস্য সচিব আশরেফা খাতুন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখ্য সংগঠক হাসিবুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন।
একই পদে ফরম তুলেছেন সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সদস্যসচিব আবু সাঈদ। যদি হাসিবুল ইসলাম সরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, তাহলে আবু সাঈদের তার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা রয়েছে।
জুলাই আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলার শিকার সানজিদা আহমেদ তন্বির ‘সম্মানে’ গবেষণা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক পদটি ছেড়ে দিয়েছে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ।

স্বতন্ত্র প্রার্থী যারা
ডাকসু নির্বাচনে সংগঠনের বাইরে গিয়েও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের অনেকে প্রার্থী হয়েছেন। এ তালিকায় আছেন মুখপাত্র তাহমীদ আল মুদাসসির, আশিকুর রহমান জীম, যুগ্ম-সদস্য সচিব আবু সালেহীন অয়ন ও সানজানা আফিফা অদিতির মতো সামনের সারির নেতাও।
স্বতন্ত্র নির্বাচন করার কারণ জানতে চাইলে সানজানা আফিফা অদিতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সংগঠন প্যানেল নির্বাচন করার আগেই আমি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। আর আমাকে প্যানেলে কোথায় রাখা হচ্ছে, সেটাও জানতে পারিনি। তাই আমি নিজেকে এ পদে নির্বাচন করার জন্য স্থির করেছি।”
চারজনের মধ্যে তাহমিদ, অদিতি ও জীম লড়বেন সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে। গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের প্যানেল থেকে পদে প্রার্থী হয়েছেন আশরেফা খাতুন।
আর অয়ন লড়বেন মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক পদে। এ পদে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের প্যানেল থেকে প্রার্থী হয়েছেন হাসিবুল ইসলাম।
এই চারজনের বাইরে সদস্য পদে নির্বাচন করছেন সংগঠনটির আরেক নেতা রিয়াজ উদ্দিন।
নিজেদের প্যানেলের বাইরে গিয়ে এসব নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্পর্কে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব জাহিদ আহসান বলছেন, “কারো গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার সুযোগ নেই। আর আমাদের প্যানেলে তো জায়গা সীমিত। সেক্ষেত্রে তারা নির্বাচন করতেই পারে।”
এটা সাংগঠনিক কোনো দুর্বলতা কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে আহ্বায়ক আব্দুল কাদের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ডাকসু সবার গণতান্ত্রিক অধিকার। আমরা কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারি না।
“আর আপনারা জানেন যে, আমাদের অভ্যুত্থান পরবর্তী সম্মুখসারির নেতাদের নিয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ গঠিত হয়েছে। তাই সবাইকে যেহেতু আমরা আমাদের প্যানেলে রাখতে পারছি না, সবাই আলাদা নির্বাচন করছে। এটার ক্ষেত্রে সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।”
বাগছাসের প্যানেল থেকে ডাকসুতে প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল জুলাই আন্দোলনের আরেক পরিচিত মুখ উমামা ফাতেমার। তবে তিনি বাগছাসে যাননি, ভিপি পদে প্রার্থী হয়েছেন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে উমামা ফাতেমা বলেন, “আমাকে প্রথম দিকে তারা (বাগছাস) বলেছিল, আমি ডাকসু করব কিনা। যদি তাদের সঙ্গে থাকতাম, হয়ত এখন তাদের প্যানেলেই নির্বাচন করতাম। তবে আমাদের প্যানেলের সঙ্গেই আছে জুলাই অভ্যুত্থানের যোদ্ধারা।”
‘বহিষ্কৃত’ মাহিনের প্যানেলে যারা
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্বব্দ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মাহিন সরকার।
এক বিজ্ঞপ্তিতে এনসিপি বলেছে, “গুরুতর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।”
ডাকসু নির্বাচনে ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল থেকে জিএস পদে লড়বেন। এ প্যানেলে ভিপি পদে লড়বেন ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংসদের’ আহ্বায়ক জামাল উদ্দীন খালিদ।
এ প্যানেলে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ থেকে সরে দাঁড়ানো নেতাও আছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক সাব্বির উদ্দিন রিয়ন ও বায়েজিদ হাসান। তারা প্রার্থী হয়েছেন সদস্য পদে।
পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে বায়েজিদ হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনার পতন, সেটা হয়েছে। তাই আর সাংগঠনিক কাজে জড়াতে চাচ্ছি না। আর সময়ও হয়ে উঠছে না। তাই সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেছি।”

পদত্যাগের পর ‘স্বতন্ত্র’ যারা
যুগ্ম আহ্বায়ক থেকে পদত্যাগ করে মুক্তসেন মোক্তার স্বতন্ত্র ভিপি পদে প্রার্থী হচ্ছেন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদে। যুগ্ম সদস্যসচিব আজিজুল হক পদত্যাগ করে মাস্টারদা সূর্যসেন হল সংসদে ভিপি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
তবে সংগঠন থেকে সরে দাঁড়ানো অনেকেই সক্রিয় কর্মী ছিলেন না বলে দাবি আহ্বায়ক আব্দুল কাদরের।
তিনি বলেন, “আমাদের সংগঠনটি যদি আপনি দেখেন, আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কমিটি, তাতে অনেকে আছেন, যারা অভ্যুত্থানের আগে রাজনীতিতে সেভাবে সক্রিয় ছিলেন না। যেমন মহির আলম, আশরেফা খাতুন, তাহমিদ আল মুদ্দাসির চৌধুরী সহ অনেকে আছেন, যারা আমাদের সঙ্গে আগে কখনো ছাত্রশক্তি করেনি। কিন্তু তারা সবাই সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে আছেন।”
যুগ্ম সদস্যসচিব সরদার নাদিম মাহমুদ শুভ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এছাড়া জুলাই আন্দোলনের আরেক পরিচিত মুখ রুপাইয়া শ্রেষ্ঠাও পদত্যাগ করে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে প্রার্থী হয়েছেন।
পদত্যাগ করার কারণ সম্পর্কে রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা বলেছেন, “পরিবার না চাওয়ায় আমার আসলে ডাকসু করার ইচ্ছা ছিল না। পরে আমি পরিবারকে রাজি করাই। তবে এটা সত্য যে আমাকে তারা বলেছে সবকিছু ঠিকঠাক করতে। কিন্তু তাদেরকে আমি বলেছিলাম, আমি সাহিত্য সম্পাদক পদে নির্বাচন করব। কিন্তু মনোনয়নপত্র নেওয়ার আগের দিন তারা আমাকে বলেছে, পরিবহন পদে করার জন্য। যেখানে আমি কাজ করিনি, যেখানে আমার চেয়ে যোগ্য কেউ আছে, সেখানে আমি নির্বাচন করব কেন?
“আর তারা আমাকে টোকেন হিসেবে রাখতে চেয়েছে সংগঠনে। যেখানে আমার কাছে মনে হয়েছে, টোকেন হিসেবে সংগঠনে থাকার কোনো মানে নাই। তাই আমি পদত্যাগ করেছি।”
‘প্রভাব ফেলবে ভোটের মাঠে’
এভাবে যে যার মত প্রার্থী হলে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংসদ’ ডাকসু নির্বাচনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা জানতে চাইলে আব্দুল কাদের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সেটাতো স্বীকার করতে হবে যে, এটা আমাদের ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে। তবে যে যে দাঁড়াচ্ছেন, তাদের আলাদা গণ্ডি আছে। যেমন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক পদে যে তিনজন দাঁড়িয়েছেন, তিন জনে তিন সেগমেন্টের। আবু সাঈদ কলা অনুষদের, হাসিবুল ইসলাম সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ও আবু সালেহীন অয়ন বিজ্ঞান অনুষদের। তাই তিনজনের ভোট ব্যাংক আলাদা। এবং তারা তিনজনই যেহেতু যোগ্য, তাই তারা নির্বাচন করছেন।”
প্যানেলের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়াটা ‘সাংগঠনিক অনৈক্য’ তুলে ধরে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এটা মানুষের মধ্যে আমাদের বিষয়ে এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দেয়। কিন্তু সবাই যেহেতু জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখ, তাই আমরা কাউকে সাংগঠনিক জায়গা থেকে নিষেধ করতে পারি নাই; কঠোর হতে পারি নাই।”
পুরনো খবর
ডাকসু নির্বাচন: কাদের ও বাকেরের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের প্যানেল
ডাকসু নির্বাচন: জামাল ও 'বহিষ্কৃত' মাহিনের নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল
ডাকসু নির্বাচন: 'স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য' প্যানেলে লড়বেন উমামা-সাদী