Published : 10 Jul 2026, 03:16 AM
বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম এক দেদীপ্যমান নক্ষত্র মারিও বার্গাস যোসা। পেরুর এই কালজয়ী লেখক, প্রাবন্ধিক এবং নোবেলজয়ী সাহিত্যিক তার লেখনী দিয়ে কাঁপিয়েছেন গোটা বিশ্ব। ‘দ্য টাইম অব দ্য হিরো’ কিংবা ‘কনভারসেশন ইন দ্য ক্যাথেড্রাল’-এর মতো মাস্টারপিস উপহার দিয়ে লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের ‘বুম’ বা স্বর্ণযুগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল ৮৯ বছর বয়সে যখন এই মহান লেখকের জীবনাবসান ঘটে, তখন কেবল সাহিত্যবিশ্বই শোকাতুর হয়নি; বরং তার চিরবিদায়ের সুর বেজে উঠেছিল সবুজ ফুটবল মাঠেও। বুদ্ধিবৃত্তিক গাম্ভীর্য, রাজনৈতিক কলাম আর গভীর সাহিত্যকর্মের আড়ালে লুকিয়ে ছিল মারিও বার্গাস যোসার এক আজীবন লালিত প্রেম, আর তা হলো ফুটবল। আজ আমরা শুনবো মাঠের সেই সবুজ ঘাস আর কালির আঁচড়ে বোনা অন্যরকম এক যোসার গল্প।
মারিও বার্গাস যোসার মৃত্যুর পর ফুটবল দুনিয়া যেভাবে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে, তাতেই স্পষ্ট হয় এই খেলার প্রতি তার ভালোবাসা কতটা গভীর ও অকৃত্রিম ছিল। পেরুর ঐতিহ্যবাহী ফুটবল ক্লাব ‘ইউনিভার্সিতারিও দে দেপোর্তেস’-এর তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ সমর্থক। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন এই ক্লাবের অন্তহীন অনুপ্রেরণা।
যোসার প্রয়াণের পর ক্লাবটি তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবেগঘন এক বার্তা দেয়। তারা লেখে: “আমরা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমির সদস্য এবং উনিভার্সিতারিও দে দেপোর্তেস-এর সম্মানিত সদস্য মারিও বার্গাস যোসার প্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত। শান্তিতে ঘুমান, ডন মারিও!”
এই বার্তার সঙ্গে তারা জুড়ে দেয় ২০১০ সালের একটি ছবি। নোবেল জয়ের পর ক্লাবের ঘরের মাঠ ‘এস্তাদিও মনুমেন্তাল’-এ যোসাকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল। সেদিন ৮০ হাজার ভক্তের সামনে দাঁড়িয়ে ক্লাবের পতাকা ওড়াতে ওড়াতে যোসা বলেছিলেন, “এই ‘ইউ’ (ক্লাবের প্রতীক) কোনো সাধারণ ক্লাব নয়, এটি একটি রূপকথা, একটি কিংবদন্তি।”
কী এক কাকতালীয় ব্যাপার! যেদিন তার মৃত্যুর খবর আসে, সেদিন এই মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামেই চলছিল উনিভার্সিতারিও বনাম মেলগার-এর খেলা। মেলগার ক্লাবটি আবার ছিল যোসার নিজের জন্মশহর আরেকিপার দল। যোসার মৃত্যুতে কেবল তার প্রিয় ক্লাবই নয়, বরং তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘আলিয়াঞ্জা লিমা’-ও সমস্ত বৈরিতা ভুলে শোক প্রকাশ করে। পেরুভিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (এফপিএফ) তাকে ‘অনন্য পেরুভিয়ান, নোবেল বিজয়ী এবং ফুটবলপ্রেমী’ হিসেবে অভিহিত করে বিশ্বজুড়ে তার কোটি ভক্ত ও পাঠকের প্রতি সমবেদনা জানায়।
১৯৩৬ সালের ২৮ মার্চ পেরুর আরেকিপা শহরে জন্ম নেন মারিও বার্গাস যোসা। একাধারে উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ এবং সাংবাদিকতায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। লাতিন আমেরিকার যে চারজন লেখক গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ও কার্লোস ফুয়েন্তেস অন্যতম, যোসা ছিলেন তাদেরই একজন।
রাজনীতি, ক্ষমতা, স্বৈরাচার এবং ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ছিল তার লেখার মূল উপজীব্য। ২০১০ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার পেছনে সুইডিশ একাডেমি তার ‘ক্ষমতার কাঠামোর মানচিত্রায়ণ এবং ব্যক্তির প্রতিরোধ, বিদ্রোহ ও পরাজয়ের ধারালো চিত্রায়নের’ প্রশংসা করেছিল। সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন, এমনকি ১৯৯০ সালে পেরুর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। জীবনভর ‘এল পাইস’-সহ বিশ্বের বড় বড় গণমাধ্যমে কলাম লিখেছেন তিনি। আর এই বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতিটি বাঁকেই তার সঙ্গী ছিল ফুটবল।
কিশোর বয়সে যোসা পেরুর স্থানীয় এক পত্রিকায় ক্রাইম রিপোর্টার বা অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। পেশাদার জীবনে তিনি কখনোই পুরোদস্তুর ফুটবল সাংবাদিক ছিলেন না, কিন্তু ফুটবলের ভেতরের সমাজতত্ত্ব তাকে বরাবরই টেনেছে।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে। সেবার তিনি কেবল গ্যালারির দর্শক হিসেবে যাননি, বরং সাংবাদিক হিসেবেও উপস্থিত ছিলেন। সেই বিশ্বকাপের সময় স্পেনের বিখ্যাত দৈনিক ‘এল পাইস’-এ তিনি একটি প্রবন্ধ লেখেন, যার শিরোনাম ছিল ‘লোস হিজোস দেল ফুটবল’, অর্থাৎ ‘ফুটবলের সন্তানেরা’।
এই প্রবন্ধে যোসা ফুটবলকে স্রেফ একটি খেলা হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘একটি নিরীহ সমষ্টিগত মোহ বা বিভ্রম’ হিসেবে। তার মতে, ফুটবল মানুষের ভেতরের আদিম উপজাতীয় চেতনা (ট্রাইবালিজম), আচার-অনুষ্ঠান এবং পরোক্ষ যুদ্ধের ক্ষুধা মেটায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই মোহে আচ্ছন্ন হয়, যার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে।
যোসার এই ফুটবল দর্শন তাকে এদুয়ার্দো গালেয়ানো বা হুয়ান ভিয়োরোর মতো লাতিন আমেরিকার সেইসব লেখকদের সারিতে দাঁড় করায়, যারা ফুটবলকে কেবল গোল আর ট্যাকটিকসের ফ্রেমে না বেঁধে সমাজের অবিচ্ছেদ্য দর্পণ হিসেবে দেখিয়েছেন।
ফুটবল নিয়ে বুদ্ধিজীবী ও সমাজবিজ্ঞানীদের অতি-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে অনেক সময় একটু বাঁকা চোখেই দেখতেন যোসা। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউরো) শুরুর প্রাক্কালে তিনি একটি নিবন্ধ লেখেন, যার শিরোনাম ছিল ‘ফুটবল’স এম্পটি প্লেজার’।
সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, একবার ব্রাজিলের বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী রবার্তো দা মাত্তা এক বক্তৃতায় দাবি করেছিলেন যে- ফুটবলের জনপ্রিয়তা আসলে মানুষের ভেতরের বৈধতা, সমতা এবং স্বাধীনতার সহজাত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। যোসা এই ধরনের গুরুগম্ভীর তত্ত্বের দিকে এক ‘ভদ্রোচিত লাথি’ (জেন্টল কিক) ছুঁড়ে দিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেন, ফুটবলকে এত জটিল তত্ত্বে না মুড়িয়ে এর ভেতরের বিশুদ্ধ, আদিম এবং জাগতিক আনন্দটাকে অনুভব করাই আসল। ফুটবল মানুষকে ক্ষণিকের জন্য বাস্তবতার কঠিন জগৎ থেকে মুক্তি দেয়, আর এটাই এর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
সবুজ মাঠের প্রতি যোসার এই ভালোবাসা যে কতটা খাঁটি ও শিশুতোষ ছিল, তার প্রমাণ মেলে ২০১০ সালে স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক এএস-কে দেওয়া তার একটি সাক্ষাৎকারে। সেখানে তিনি হেসে হেসেই এক মজার পারিবারিক স্মৃতি রোমন্থন করেছিলেন, “আমার স্ত্রী সবসময় একটা বিষয় নিয়ে আমাকে খেপায়। আমাদের বিয়ের পর আমরা হানিমুনের জন্য ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে গিয়েছিলাম। রিও-তে পৌঁছানোর ঠিক পরদিনই আমি তাকে নিয়ে মারাকানা স্টেডিয়ামে ছুটে গেলাম পেলের খেলা দেখতে! আমাদের হানিমুনের মূল আকর্ষণই হয়ে দাঁড়াল ওটা। সেটা ছিল ব্রাজিল বনাম জার্মানির একটা ম্যাচ, যেখানে পেলে দুর্দান্ত দুটি গোল করেছিলেন।”
আজ মারিও বার্গাস যোসা আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে- ফুটবল কোনো সস্তা বিনোদন নয়, এটি মানব ইতিহাসেরই এক জীবন্ত গল্প। সাহিত্য যেমন আমাদের ভেতরের মানুষকে চিনতে সাহায্য করে, ফুটবলও তেমনি সমাজের সমষ্টিগত আবেগ, উন্মাদনা আর সত্যকে ফুটিয়ে তোলে।
সূত্র: সিএনএন, দ্য প্রসপেক্ট, ফুটাইমস ডটকম।