Published : 21 Aug 2025, 01:39 AM
জুলাই অভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশে ক্যাম্পাস রাজনীতির নতুন সমীকরণে ইসলামী ছাত্রশিবির যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, আসন্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সংগঠনটিকে ঘিরে চলমান আলোচনা ও তাদের কর্মকাণ্ড সে কথাই বলছে।
ছাত্রশিবিরের ৪৮ বছরের ইতিহাসে এতটা প্রকাশ্যে, অবাধে, চাঙ্গাভাব নিয়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ জামায়াতে ইসলামীর এ ছাত্র সংগঠন আর কখনো পায়নি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি চালানোর সুযোগ ছিল না।
কিন্তু ওই সময়ও ক্ষমতাসীন দলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠনে সক্রিয় থেকে শিবির কর্মীরা যে গোপনে নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছে, সেই সত্য প্রকাশিত হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের পর।
ছাত্রশিবিরকর্মীরা এবার নিজেদের সাংগঠনিক পরিচয় নিয়েই অবাধে ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের হাজির করেছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সরকারে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব এবং ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ভারসাম্যের নতুন মেরুকরণে ছাত্রশিবির এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে চলে এসেছে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন।

শিবিরের ডাকসু যাত্রা, মিলছে না নথি
ছাত্রশিবিরের সাবেক এক নেতার দাবি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার দুই বছরের মাথায় ১৯৭৯ সালে সংগঠনটি প্রথমবারের মতো ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেয় ‘তাহের-কাদের পরিষদ’ নামে।
তবে কোনো ডাকসু নির্বাচনই এবারের মত প্রতিবন্ধকতাহীন ছিল না সংগঠনটির জন্য।
১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদপ্রার্থী মো. মুজিবুর রহমানের দাবি, ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠার পর যতগুলো ডাকসু নির্বাচন হয়েছে, সবকটিতেই অংশ নিয়েছেন তারা।
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজিবুর রহমান ১৯৮৮ সালে ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট্কমকে বলেন, “১৯৮০ সাল থেকেই ছাত্রশিবির ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে শুরু করে। তখন আমাদের জনপ্রিয়তা খুব একটা ছিল না, কর্মীর সংখ্যাও সীমিত ছিল। তাই বড় পদে জয় পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ১৯৮২ সালের নির্বাচনে মুহসীন হল ও সলিমুল্লাহ হলে কয়েকটি সম্পাদক পদে জয়ী হয়েছিলাম।”
সে সময় সংগঠনের অবস্থান কেমন ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, “শুরুতে খুব একটা প্রভাব ছিল না। তবে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ১৯৮৯ ও ১৯৯০ পরপর দুবার ডাকসুতে শিবিরের অবস্থান ছিল তৃতীয়।
“১৯৯০ সালে ছাত্রদল প্রায় ৩ হাজার, ছাত্রলীগ আড়াই হাজারের মত ভোট পেয়েছিল। ছাত্রশিবিরের ভোট গড়ে ১২০০-১৩০০ ছিল। আমাদের পরে ছিল ছাত্র ইউনিয়নের অবস্থান, যারা ৯০০ থেকে হাজারের মধ্যে ভোট পেয়েছিল।”

ছাত্রশিবিরের সাবেক এই নেতার দেওয়া তথ্য যাচাই করার সুযোগ পায়নি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তর সেই সময়ের নির্বাচনের তথ্য জানাতে পারেনি।
ডাকসু ও নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি রেজিস্ট্রার নজীর আহমদ সিমাব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তাদের কাছে শুধু ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের তথ্য সংরক্ষিত আছে।
১৯৮৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ থেকে নির্বাচিত ডাকসুর জিএস মুশতাক হোসেনের কাছে এ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা ১৯৮৯ সালে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো একসাথে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের হয়ে নির্বাচন করেছিলাম। আর, আমাদের প্যানেল পুরোপুরি বিজয়ী হয়েছিল। সেই নির্বাচনে ছাত্রশিবির তৃতীয় হয়েছিল।
“তবে ১৯৯০ সালের নির্বাচনে আমরা সবাই আলাদা হয়ে যাই। ছাত্রদল ডাকসুতে বিজয়ী হয়। এর পরের অবস্থানে কারা, কত ভোট পেয়েছিল মনে নেই।”
১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ভেঙে গেলে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ভিপি পদে নির্বাচন করেছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। জিএস প্রার্থী ছিলেন নাসির উদ-দৌজা। তাদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এখন বিএনপি নেতা এবং নাসির উদ-দৌজা রয়েছেন প্রবাসে। চেষ্টা করে তাদের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
তবে ছাত্র ইউনিয়নের আরেক সাবেক সভাপতি মানবেন্দ্র দেব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার জানা মতে ওই নির্বাচনে মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ১৭০০ এবং নাসির উদ-দৌজা দুই হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন।”

মুশতাক হোসেন বলেন, “ডাকসু নির্বাচনে আমরা সবাই যখন ক্যাম্পেইন চালাতাম, তখন ছাত্রশিবিরের কাউকে দেখা যেত না। তারা প্যানেল দিয়েছে ঠিকই। তবে তাদের কোনো অবস্থান ছিল না। এমনকি তারা কখনো ডাকসুতে কোনো পদ পায়নি।”
সাবেক ছাত্রশিবির নেতা মুজিবুর রহমান বলেন, “অন্য সব ছাত্রসংগঠনের মত আমাদের প্রচার উৎসবমুখর ছিল না, এটা সত্য। প্রতিকূলতা ছিল এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা প্রচার চালিয়েছি। হলে হলে গিয়েছি। শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছি। তবে ওই পরিস্থিতি বদলে গেছে এখন।
“জুলাই অভ্যুত্থানে আপনারাই দেখেছেন ছাত্রশিবির কীভাবে আন্দোলন সফল করায় কাজ করেছে। আমরা আশাবাদী, এবারই ডাকসুতে ছাত্রশিবির জিতে আসবে।”
ডাকসু নির্বাচন ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে ছাত্রশিবির
জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ছাত্রশিবির। এক দিকে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি চোখে পড়ছে, অন্যদিকে তাদের নিয়ে সমালোচনাও চলছে।
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একাধিপত্য ধরে রাখা ছাত্রলীগে আত্মগোপন করে রাজনীতি করা শিবিরের অনেক নেতা–কর্মী গত বছর স্বনামে আত্মপ্রকাশ করেছেন। এর পর থেকে শিবির ক্যাম্পাসে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। সবকটি হলের নিয়ন্ত্রণ এখন শিবিরেরই হাতে।
বিগত সরকারের আমলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং ক্লাবসহ সব ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃত্ব দখল করা ছিল শিবিরের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কৌশল।
এবার ডাকসুতে শিবিরের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদ ছিলেন জসীম উদ্দীন হল ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি ও সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউট ডিবেটিং সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক। সে সময় ফরহাদ ছাত্রলীগেও নাম লিখিয়ে রেখেছিলেন। তিনি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি।
কার্যনির্বাহী সদস্য প্রার্থী রায়হান উদ্দিন ছিলেন এফ রহমান হল ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় ডিবেটিং কমিটির সহসভাপতি।
ক্রীড়া সম্পাদক প্রার্থী আরমান হোসেন নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি এয়ার উইংয়ে। সদস্য প্রার্থী আনাস ইবনে মুনির সক্রিয় ছিলেন স্টুডেন্ট অ্যাগেইনস্ট টর্চার (স্যাট) প্ল্যাটফর্মে।

আত্মগোপন থেকে প্রকাশ্যে এসে ছাত্রশিবির সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি করে টিএসসিতে আয়োজিত জুলাই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির কর্মসূচিতে।
‘৩৬ জুলাই: আমরা থামবো না’ শীর্ষক আয়োজনে ছাত্রশিবির একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত নেতাদের ছবির প্রদর্শনী করে। পরে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সংগঠনের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ছবিগুলো সরানো হয়।
ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গঠনতন্ত্রে নিজেদের স্বতন্ত্র ছাত্র সংগঠন বলে দাবি করলেও বাস্তবে সংগঠনটি সবসময় জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র শাখা হিসেবে কাজ করে এসেছে।
পাকিস্তান আমলে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছিল ইসলামী ছাত্রসংঘ। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের প্যানেলের প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিলের দাবি তুলেছে ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ।
সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম রানা জয় ও সালাহউদ্দিন আম্মার নিলয় মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ডাকসু গঠনতন্ত্রে বলা আছে, ‘এই সংসদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিচালিত হবে’। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, যুদ্ধাপরাধী, গণহত্যার দোসর ইসলামী ছাত্র সংঘের ‘সরাসরি উত্তরাধিকার’ ইসলামী ছাত্রশিবির ডাকসুতে নির্বাচন করার সুযোগ ‘পাওয়ার কথা না’।
স্বাধীনতার পর জামায়াত নিষিদ্ধ হলে ছাত্রসংঘও নিষিদ্ধ হয়। পরে জামায়াতে রাজনীতি করার সুযোগ পেলে ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীদের নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে ইসলামী ছাত্রশিবির।

টিএসসিতে শিবিরের ওই প্রদর্শনীর প্রসঙ্গ ধরে বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শুধু এই রকম একটি প্রদর্শনী আয়োজনের কারণেও ইসলামী ছাত্রশিবির ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অধিকার হারিয়েছে।
“ডাকসুর গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে-এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মহান মুক্তিযুদ্ধকে সবকিছুর ওপরে তুলে ধরা হবে। যারা এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এদেশেরই বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে গণহত্যা চালিয়েছে তাদের অনুসারীদের নির্বাচন করতে দেওয়াটা ডাকসুর গঠনতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক।”
আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে বাম ধারার সাত সংগঠনের প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ এর এজিএস প্রার্থী জুবেল বলেন, “জামায়াত-শিবির একাত্তরে যেমন এদেশের মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে, তেমনি ২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান নিয়েও প্রতারণা করছে। তারা এদেশের চিহ্নিত রাজাকারদের সমর্থন করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের এই সুযোগ করে দিয়েছে।”
প্রদর্শনী নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ছাত্রদল বিভিন্ন হলে কমিটি ঘোষণা করলে ক্যাম্পাসে হলভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার আন্দোলন শুরু হয়। হলে হলে রাজনীতি নিষিদ্ধের ওই আন্দোলনে ছাত্রশিবিরের ‘ইন্ধন’ থাকার অভিযোগ ওঠে।
আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবাসিক হলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। তবে ছাত্রশিবির হলকেন্দ্রিক খেলাধুলার আয়োজন, বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্থাপন এবং ভোজের আয়োজন করছে নামে-বেনামে।
ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের নেতা মেঘমল্লার বসুর ভাষায়, “এভাবে ছাত্রলীগ প্রশাসনের জায়গায় শিবির প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় কবজা করেছে।”
ডাকসু নির্বাচনে প্রতিরোধ পর্ষদ প্যানেল থেকে জিএস পদপ্রার্থী মেঘমল্লার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা শুরু থেকে ছাত্রশিবিরের নানান কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের কাছে তাদের বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য চেয়েছি। আমরা বলেছি, পরিবেশ পরিষদ কার্যকর করার জন্য। ছাত্রশিবিরকে নিয়ে প্রশাসনের আয়োজিত বৈঠক বয়কটের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের অবস্থানও জানিয়ে দিয়েছি।”

‘পরিবেশ পরিষদ’ কি অস্তিত্বহীন কাঠামো?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থান নিশ্চিত করা এবং ক্যাম্পাসে মৌলবাদী ও স্বৈরাচারী ছাত্র সংগঠনকে প্রতিহত করার লক্ষ্য নিয়ে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে গঠিত হয়েছিল ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ পরিষদ’। পদাধিকারবলে উপাচার্য ছিলেন এর প্রধান এবং ক্যাম্পাসে সক্রিয় তালিকাভুক্ত সব ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ দুইজন করে নেতা ছিলেন সদস্য।
ডাকসু কার্যকর না থাকলে ছাত্র সংগঠনগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় ও সহাবস্থান নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই পরিষদটি গঠিত হয়। সর্বশেষ এই পরিষদের বৈঠক হয়েছে ২০২২ সালে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও এই ‘পরিবেশ পরিষদ’ সক্রিয় করার দাবি করে আসছে।
ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান আপসহীন। আপনি জানেন, ১৯৯০ সালে পরিবেশ পরিষদের (সিদ্ধান্তের) ভিত্তিতে শিবির ও ছাত্রসমাজ নিষিদ্ধ ছিল। এরপর ২৪-এর অভ্যুত্থানে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
“সেক্ষেত্রে ছাত্রলীগ যেমন নির্বাচন করতে পারবে না, তেমনি ছাত্রশিবিরের ব্যাপারেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সকল ছাত্র সংগঠনের অবস্থান কী, সেটা নিয়ে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারত, করা উচিত ছিল। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এ বিষয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই বলে আসছি।”
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমদের দাবি, ‘পরিবেশ পরিষদ’ বলে কোনো কিছুর ‘অস্তিত্বই নেই’।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো পরিষদের তথ্য নেই। যারা এ দাবি করেছেন, তাদের কাছে কোন ডকুমেন্ট থাকলে তারা আমাদের দিতে পারেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ না হলে যে কোনো ছাত্র সংগঠন এই ক্যাম্পাসে রাজনীতি করার অধিকার রাখে।
“হিযবুত তাহরীর নিষিদ্ধ সংগঠন, তাই তাদের আমরা সুযোগ দেইনি। কিন্তু ছাত্রশিবির বা অন্যরা নিষিদ্ধ না হলে তাদের রাজনীতি বন্ধ করার এখতিয়ার তো আমাদের নেই।”
ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদও একই দাবি করেছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা ২০০৬ সালে যিনি ভিসি ছিলেন তাকে বিষয়টি জানানোর পর তিনি তন্ন তন্ন করে খুঁজে আমাদের নিশ্চিত করেছেন, এই রকম কোনো পরিষদের ডকুমেন্ট পাওয়া যায়নি।
“এটা হচ্ছে বিরাজনীতিকরণের চেষ্টা, এটা একটা ফ্যাসিবাদী আচরণ। এ নিয়ে যারা কথা বলছে তারা তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রকাশ ঘটাচ্ছে।”
ফরহাদ বলেন, “আমাদের বক্তব্য মূলত দুইটা, আমাদের বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ থাকে সেটা সরাসরি জানাবেন। আমরা এটা লিগ্যালি, ফরমালি ডিল করব। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও বলতে পারেন, আইনের আশ্রয় নেবেন, প্রয়োজনে আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিষিদ্ধ করে দেবেন। কিন্তু নিজেরা নিজেরা মিলে কাউকে নিষিদ্ধ করবেন–এটা তো আইনসিদ্ধ নয়।”

ভোটের মাঠে ছাত্রশিবিরের প্যানেল
ডাকসু নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে ছাত্রশিবির। যেখানে ২৮টি পদে ছাত্রশিবিরের বাইরের কয়েকজন তাদের প্রার্থী হিসেবে লড়াই করবেন।
এ প্যানেলে ভিপি পদে রয়েছেন ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি আবু সাদিক কায়েম এবং জিএস পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান সভাপতি এস এম ফরহাদ।
তবে ছাত্রশিবিরের এ প্যানেলে ব্যতিক্রম হিসেবে জুলাই আন্দোলনে এক চোখ হারানো খান জসিম ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রাইসুল ইসলামকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক পদে ইনকিলাব মঞ্চের এক সদস্যকে তাদের প্যানেলে জায়গা দিয়েছে। এ পদে প্রার্থী হয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য ফাতিমা তাসনিম জুমা।
ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী বাদ দিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যকে কেন নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিনি এ পোস্টের জন্য কমিটেড ছিলেন। আর, তিনি যেহেতু দীর্ঘদিন অ্যাক্টিভিজমে আছেন, তাই তাকে এ পদটি দেওয়া হয়েছে।
তাদের ২৮ সদস্যের এ প্যানেলে অমুসলিম ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে আছেন সর্ব মিত্র চাকমা। এই একজন বাদে আর কোনো অমুসলিম প্রতিনিধি নেই প্যানেলে।
মহিউদ্দিন খান বলেন, “ছাত্রশিবিরের প্যানেল, যা ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ নামে ডাকসুতে লড়াই করবে, সেখানে আমরা সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। যারা এসেছেন তাদের নিয়ে প্যানেল হয়েছে। আর, আমরা মুসলিম-অমুসলিম বিতর্কে যাচ্ছি না। আমাদের মানদণ্ড ছিল, যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, তাদের নিয়ে এ প্যানেল হবে।”
ছাত্রশিবিরের প্যানেলে জায়গা পাওয়া জয়েন উদ্দিন সরকার তন্ময়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে ‘ফ্লাইট ছিনতাইকারী’ বলে পোস্ট দিয়েছেন। পরে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে সেই পোস্ট প্রত্যাহার করেন তিনি।
তন্ময়ের মত বিতর্কিত শিক্ষার্থীকে কেন রাখা হয়েছে জানতে চাইলে মহিউদ্দিন খান বলেন, “তিনি পোস্টটা প্রত্যাহার করেছেন এবং ক্ষমা চেয়েছেন।”
পুরনো খবর:
উপাচার্যের সঙ্গে ছাত্র সংগঠনের সভা, প্রকাশ্যে ঢাবি ছাত্রশিবির সভাপতি