Published : 28 Aug 2022, 12:46 AM
ঢাকার জুরাইনের বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ মোহাম্মদ মিজানুর রহমান যেন ভিন্নধর্মী প্রতিবাদের এক নাম; পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী চা শ্রমিকদের পাশে থাকতে হেঁটেই পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ পথ।
দৈনিক মজুরি ১২০ থেকে ৩০০ টাকা করতে চা শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে সংহতি জানাতে গিয়েছিলেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চান্দপুর চা বাগানে।
ঢাকা থেকে রওয়ানা দিয়েছিলেন ১৪ অগাস্ট রাতে। সেখানে কয়েকদিন কাটিয়ে ২২ অগাস্ট সোমবার পায়ে হেঁটেই ফেরার পথ ধরেন। অবশেষে শনিবার দীর্ঘ পদযাত্রা শেষে ঢাকায় পৌঁছালেন তিনি।
প্রাথমিকভাবে তার পরিকল্পনা ছিল ঢাকায় পৌঁছে শ্রম মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার। তবে শনিবার বিকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনা চা বাগান মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন জেনে তিনি দুপুর সাড়ে ১২টায় যাত্রাবাড়ী পৌঁছে তার গন্তব্য বদলের সিদ্ধান্ত নেন।
বিকাল ৩টা ৪২ মিনিটে দীর্ঘ ১৫০ কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে মিজান শ্রম মন্ত্রণালয়ে না গিয়ে গণভবনের সামনে পৌঁছান।
সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “চা শ্রমিকরা শেখ হাসিনার অন্ধ ভক্ত। আমার মনে হইছিল শেখ হাসিনা উপলব্ধি করে আরও বলবেন যে আপনারা কম মজুরি চান কেন? মজুরি তো আপনাদের আরও বেশি হওয়া উচিত।“
বৈঠকের সিদ্ধান্তে ‘অবাক’ হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে শ্রমিকদের জন্য আরও বেশি মজুরি আশা করেছিলেন।
৫০ টাকা বাড়িয়ে দৈনিক ১৭০ টাকা নতুন মজুরি নির্ধারণসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর ঘোষণার বিষয়ে চা শ্রমিকদের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ”আমি স্থানীয়দের সাথে কথা বলছি, তারা এখনও কিছু বলে নাই। মূলত তাদের ভেতরে ভয় কাজ করে এটা জানাতে। ভয় কাজ করে বলেই তারা এখন আলাপ-আলোচনা করবে, তারপর জানাবে…”

এর আগে ‘ওয়াসার পানি সুপেয়’ সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের এমন দাবির বিরুদ্ধে ভিন্নধর্মী প্রতিবাদ করে আলোচনায় এসেছিলেন মিজান।
২০১৯ সালে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান দাবি করেছিলেন ওয়াসার পানি শতভাগ বিশুদ্ধ এবং সুপেয়। তার সেই বক্তব্যের রেশ ধরে এমডিকে ওয়াসার পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে পান করাতে গিয়েছিলেন জুরাইনের এই বাসিন্দা।
তারও আগে ২০১৫ সালে সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে ব্যাপক পুলিশি মারধরের শিকার হয়েছিলেন তিনি। পরে সেই সময়কার ছবি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এসেছিল।
এমন প্রতিবাদী চরিত্র মিজান এবার দীর্ঘ পদযাত্রাকে বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর পত্রপত্রিকায় অনেক রকম লেখা দেখি। নিজের চোখে দেখার জন্য এখানে যাওয়া। ওখান গিয়ে হেঁটে ঢাকায় আসব, এটা আমার পরিকল্পনায় ছিল না। ১৪ তারিখ মৌলভীবাজার যাই এবং ওখানকার পরিস্থিতি দেখে ভীষণ মন খারাপ হয়।”
ওখানে গিয়ে মিজানুর চা শ্রমিকদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, “শুরু থেকেই আমি চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে ছিলাম। ওদের বাড়িতে থাকার এই সময়টায় আমার একটা উপলব্ধি হইছে, এই চা শ্রমিকদের মত এই সরকারের এত ভক্ত কেউ নাই। অথচ তাদের সাথেই প্রতারণা করা হচ্ছে।“
‘প্রতারণার’ অভিযোগের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “চা বাগানের মালিকপক্ষ ঘটা করে প্রচার করেন তারা শ্রমিকদের বিস্তর রেশন দিয়ে থাকেন। ভাবখানা এই রকম যে শায়েস্তা খাঁর আমলের মত টাকায় আট মণ চাল পায় ওরা। রেশন বলতে তো আমরা বুঝি চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস।
“কিন্তু ওইখানে গিয়ে দেখি ওদেরকে শুধুমাত্র চাল অথবা আটা দেয়। তাও দৈনিক ৫০০ গ্রাম। আর যদি ৬ থেকে ১২ বছরের বাচ্চা থাকে, তার জন্য আরও কম। সেখানে কারও পরিবারে যদি ৭-৮ জন থাকে, সেইটা তাদের দেখার বিষয় না।”
বর্তমানে যে ১২০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়, সেটি পাওয়াও সহজ নয় বলে শ্রমিকদের উদ্ধৃত করে তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, “২৪ কেজি পাতা তুলতে পারলেই ১২০ টাকা পায় একজন শ্রমিক। কম হলে এই ১২০ টাকাও পুরো দেওয়া হয় না। ২৪ কেজির বেশি পাতা তুলতে পারলেই কেজিপ্রতি ৩ টাকা বাড়তি দেওয়া হয়। কিন্তু সেটা সবসময় তুলতে পারা যায় না। যখন পাতার পরিমাণ বেশি থাকে, মানে বর্ষাকালে কেউ কেউ ২৪ কেজির বেশি পাতাও তুলতে পারে। তবে এইটা সবাই পারেও না। যাদের গায়ে শক্তি সামর্থ্য বেশি, তারাই শুধু পারে।
“আবার স্থায়ী শ্রমিক, অস্থায়ী শ্রমিকের ব্যাপার আছে এইখানে।”
আন্দোলন শুরুর পর চা শ্রমিকদের অবস্থা কি জানতে চাইলে মিজান বলেন, “আমি যখন চা বাগান থেকে ঢাকার পথে রওয়ানা দিই। তখন শুনছিলাম যে যাদের আর্থিক অবস্থা ভয়াবহ খারাপ হয়ে পড়েছে, তারা নানা জায়গায় হাত পাতা শুরু করছে। যাদের আরেকটু অবস্থা খারাপ, তারা ঋণ করছে।”
তিনি জানালেন যাত্রাপথে মাধবপুর, আশুগঞ্জ ও নরসিংদীতে রাত কাটিয়েছেন। পথে পথে কথাও বলেছেন মানুষের সঙ্গে।
চা বাগানে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের বিষয়ে শুনেও বিস্মিত হয়েছেন মিজান। কাজের সময় অসুস্থ হয়ে পরা শ্রমিকদের বাগান থেকে স্থানান্তরেও ভালো কোনো ব্যবস্থা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে ৫০-৬০ কেজির মত বিপুল তোলা চা পাতা দীর্ঘ পথ বহন করে নিয়ে যাওয়া এবং ওজন দেওয়া পর্যন্ত শ্রমিকদের দাঁড়িয়ে থাকার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তার।

কয়েকদিন চা শ্রমিকদের সঙ্গে থেকে তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা শুনেও নিজের ক্ষোভের কথা তুলে ধরলেন তিনি।
”চিকিৎসার ক্ষেত্রে সর্বরোগের ওষুধ হচ্ছে প্যারাসিটামল।সেগুলারও মান ঠিক আছে কি না কেউ জানে না। বড় রকমের অসুখ হলে পাঠায়ে দেয় সরকারি হাসপাতালে, “যোগ করেন মিজান।
তিনি বলেন, বাগান-মালিকরা শ্রমিকদের থাকতে দিয়েছেন বলে যে গৌরব করেন, ওদের ঘরবাড়ি দেখে এই গৌরব ফাঁপা মনে হয়েছে, শ্রমিকদের শৌচাগার ব্যবস্থাও স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
আরও পড়ুন:
৫০ টাকা বাড়িয়ে চা শ্রমিকদের মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ
কাজে যোগ দেওয়ার কথা বললেন চা শ্রমিক নেতারা
মজুরি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান চা শ্রমিকরা
আন্দোলনে নেমে ভাতও বন্ধ, বাঁচবে কি করে চা শ্রমিক?
বাগানে বাগানে মিছিল, এমপিকে স্মারকলিপি চা শ্রমিকদের
চা শ্রমিকের মজুরি বেড়ে ১৪৫ টাকা, আন্দোলন প্রত্যাহার
ভরা মৌসুমে শ্রমিক ধর্মঘটে শঙ্কায় চা বাগান