Published : 05 Jun 2026, 11:38 PM
চার বোন আর তিন ভাইয়ের মধ্যে ফরহাদ হোসেন মাহির ছিল সবার ছোট ও আদরের। পড়াশোনা করছিলেন উত্তরার ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিতে। তবে ‘বন্ধুত্বের বিশ্বাসঘাতকতায়’ সম্প্রতি ঝরেছে ২৩ বছর বয়সি এ তরুণের প্রাণ।
পুলিশ ও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল কেনার কথা বলে গত ২৯ এপ্রিল মাহিরকে উত্তরার বোনের বাসা থেকে ডেকে নেন বন্ধু ইয়াসিন আরাফাত। মাহিরকে বাড্ডার আফতাবনগর এলাকার একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রুমে আটকে রেখে কয়েকজন রাত ৮টা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত কয়েক দফা পিটিয়ে মাহিরকে হত্যা করে।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ‘বন্ধু’ আরাফাত বলেছেন, মাহিরকে এমনভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল যে, শেষবার পানিও পান করতে পারেননি। গুম করতে মাহিরের লাশ ফেলা হয় হবিগঞ্জে।
এ ঘটনায় মাহিরের বোন নার্গিছ খাতুন ২ মে বাড্ডা থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলায় মাহির বন্ধু ইয়াসিন আরাফাত, আরাফাতের বন্ধু রাকিবুল ইসলাম, রাকিবুলের স্ত্রী মোছা. অনন্যা, সহযোগী তানভীর হোসেনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়। মামলার পর আরাফাত, মৃদুল সরকার ও জাহিদ মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে আরাফাত আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। আর জাহিদ মোল্লার গাড়িতে করে মাহিরের লাশ সরানো হয় বলে অভিযোগ।
মামলায় অভিযোগ করায়, মাহির বাসায় না ফেরায় উত্তরখান থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে জানতে পারেন—আরাফাত, রাকিবুল, তানভীর, অনন্যাসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা পূর্ব শত্রুতার জেরে মাহিরকে আফতাবনগরে নিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার এসআই মো. হানিফ বলেন, “মামলার তদন্ত চলছে। তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “ঘৃণা থেকে খুন করা হয়। রাকিব তার স্ত্রীকে অত্যাচার করতো। এ কারণে রাকিবের বিরুদ্ধে স্ত্রী মামলা করে। মামলায় সাক্ষী হয় মাহির।
“ঘৃণা থেকে এ হত্যাকাণ্ড; পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ভিকটিমকে ডেকে নিয়ে রুমের মধ্যে আটকে রেখে পিটিয়ে হত্যা করে।”
মামলার নথি থেকে জানা যায়, কেন, কীভাবে মাহিরকে নির্যাতন করা হয়, সে কথা পুলিশকে বলেছেন আরাফাত। তিনি, নিহত মাহির, অনন্যা, আসামি রাকিবুলের ভাই রাজু উত্তরখান কলেজে সহপাঠী ছিলেন। অনন্যার সঙ্গে মাহিরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তবে রাকিবুল অনন্যাকে বিয়ে করায় তার সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় মাহিরের।
বছর দেড়েক আগে মাহির ও রাজু উত্তরা সেন্টার পয়েন্টে শপিংমলে ঘুরতে যান। পড়ে গিয়ে রাজুর স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি হয়। রাজু শয্যাগত হওয়ায় প্রায়ই তার বাসায় গিয়ে দেখভাল শুরু করেন মাহির। এ সুবাধে মাহির, রাজু ও রাকিবুলের মধ্যে সম্পর্ক ‘ভালো’ হয়। রাকিবুল ব্যবসার কাজে বাইরে থাকায় তার প্রথম স্ত্রী সীমা ও মাহির মিলে রাজুর দেখাশোনা করতেন।
জিজ্ঞাসাবাদে আরাফাত পুলিশকে বলেছেন, রাকিব ও সীমার মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। রাকিব সীমাকে মারধর করছেন-এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখতেন মাহির। একপর্যায়ে সীমা বাসা থেকে বের হয়ে গিয়ে রাকিবুলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেন সীমা। বাদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেন মাহির। বন্ধুর অনুরোধে আরাফাতও সীমার পক্ষে সাক্ষ্য দেন। পরে রাকিবুল মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে আরাফাত সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রাকিবুল বলেন, তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ায় আরাফাত ফেঁসে গেছেন, বাঁচতে হলে সহযোগিতা করতে হবে।
আরাফাত জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, একটা পুরাতুন মোবাইল ফোন কেনার কথা বলে মাহিরকে আফতাবনগর এলাকায় নিয়ে যেতে বলেন রাকিবুল। প্রশাসনের লোক দিয়ে মাহিরের বিচার করবে বলে জানান। সেই অনুযায়ী আরাফাত আজমপুর থেকে ৫৫০ টাকায় সিএনজি ভাড়া করে মাহিরকে আফতাবনগরের এম ব্লকের বড়ইতলা নিয়ে যায়। রাকিবুল ফোন করে আরাফাতদের ওই এলাকার একটি বাসার দোতলায় যেতে বলেন। বাসায় প্রবেশ করা মাত্র মাহিরকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন রাকিবুল। মৃদুলসহ কয়েকজন চেপে ধরার পর মাহিরের হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়।
আসামি আরাফাতের ভাষ্যে, মাহিরের চুল ধরে ফ্লোরের সঙ্গে আঘাত করে মাথার পেছনের অংশ রক্তাক্ত করেন রাকিবুল। স্কচটেপ দিয়ে ভুক্তভোগীর মুখ আটকে দেওয়া হয়। মাহিরের কাছ থেকে ‘জবানবন্দি’ নেওয়ার জন্য রাকিবুলের দুই সহযোগী লোহার রড দিয়ে পেটায়। মার খেয়ে মাহির জবানবন্দি দেন। নির্যাতনের একপর্যায়ে মাহিরকে উলঙ্গ করে ফেলেন রাকিবুল। পরে পাশের কক্ষে গিয়ে রক্ত পরিষ্কার করে রাকিবুল খাবার আনতে বাইরে যান।
পুলিশকে আরাফাত বলেছেন, কিছুক্ষণ পর অনন্যা, তানভীর ও তানভীরের স্ত্রী এবং আরেক তরুণী আসেন। যে কক্ষে মাহিরকে নির্যাতন করা হচ্ছিল, সেখানে অনন্যা ঢুকে রাকিবুলের দুই সহযোগীকে পাশের কক্ষে থাকা আরাফাতের কাছে পাঠান।
আরাফাতের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০-২৫ মিনিট পর বের হয়ে আসা অনন্যাকে তখন ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তার শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল। কিছুক্ষণ বাদে রাকিবুল খাবার নিয়ে আসেন। ফের মাহিরকে মারধর করে বের হয়ে এসে হাতের রক্ত পরিষ্কার করেন রাকিবুল। এরপর মাহিরের সঙ্গে ‘কিছু পুরনো হিসাব-নিকাশ আছে’ বলে ওই কক্ষে যান তানভীর। মাহিরকে অনেক মারধর করে বের হয়ে এসে তিনি হাতের রক্ত পরিষ্কার করেন। এরপর তারা সবাই রাতের খাবার খান। ভোরবেলা রাকিবুল আবার মাহিরের কক্ষে যান। কিছু সময় পর বের হয়ে এসে আরাফাতকে বলেন, ‘মাহিরের পানি লাগবে’।
আরাফাতের ভাষ্য, পানি দিতে গিয়ে তিনি দেখেন, মাহিরের অবস্থা ‘খুব খারাপ’। সারা শরীর রক্তাক্ত, কথা বলতে পারছে না। আরাফাত পানি দিলেও মাহির পান করতে পারেন না। আরাফাত বের হওয়ার পর মাহিরের ককক্ষে মৃদুল ও রাকিবুলের আরেক বন্ধু প্রবেশ করে। রাকিবুল বাইরে থেকে তালা দেয়। বাসার নিচে একটি গাড়ি আসে। রাকিবুল, তার এক বন্ধু ও আরাফাত গাড়িতে ওঠেন। মাহির ও আরাফাতের ফোন নিয়ে নেন রাকিবুল। তারা মাওয়া ফেরি ঘাটে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করেন। রাকিবুল ২০ হাজার টাকা দিয়ে আরাফাতকে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করে। আরাফাতের মোবাইলও ফেরত দিলেও মাহিরেরটা রেখে দেন রাকিবুল।
পরে আরাফাত বাসায় ফেরেন। এরপর রাত ১২টার দিকে মাহিরের ভাই ও আত্মীয়স্বজন বাসায় গেলে সবকিছু জানিয়ে দেন আরাফাত।
পরে মাহিরের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী সিআইডি পুলিশ আফতাবনগরের ওই বাসায় সিসি ক্যামেরার ভিডিও পর্যালোচনা করেন। তাতে ১ মে রাকিব, মৃদুলসহ তিন ব্যক্তিকে কার্টনে প্যাঁচানো একটা বস্তা কালো প্রাইভেটকারের পেছনে তুলতে দেখা যায়।
ঘটনার দিনের বর্ণনায় মাহিরের বোন নার্গিছ খাতুন বলেন, “সেদিন সকাল ১১টার পর ঘুম থেকে উঠে বাসা থেকে বের হয় মাহির। জিজ্ঞাসা করি, ‘কোথায় যাও?’ বলে, ‘আরাফাতের সাথে মোবাইল কিনতে যাচ্ছি’। বলি, ‘এটা ঠিক হচ্ছে না, ভয় লাগে’। ও বলে, ‘একই এলাকার কী করবে’। আমি বলি, ‘আরাফাত ও রাকিব খারাপ’।”
বাদী বলেন, “রাকিবের ভাই রাজুর মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। খবর পেয়ে আমার ভাই বসুন্ধরার বাসায় যায়। সেখানে তার ট্রিটমেন্ট চলে। এদিকে রাকিব সীমাকে বিয়ে করে নিয়ে আসে। সীমাকে অত্যাচার করে রাকিব। কেন তাকে মারে, জানতে চায় মাহির।
“বলে, ‘খারাপ ভিডিও না করার কারণে এটা করে’। মাহিরের কাছে হেল্প চায়। কী হেল্প করতে হবে, জানতে চায় মাহির। একটা গাড়ি ঠিক করে দিতে বলে। সীমা তার ভাই-বোনকে নিয়ে সাতক্ষীরায় যেতে চায়। মাহির গাড়ি ঠিক করে দেয়। সেও ওদের সাথে সাতক্ষীরাতে যায়।”
নার্গিছ বলেন, “আমার ভাই সীমার সাথে পরকীয়া করে—এমন অভিযোগ করে রাকিব। সে সাতক্ষীরাতে যায়। রাকিবের ভয়ে সীমার মা-বাবা, বোন তার খালার বাড়িতে যায়। রাকিব সেখানে গিয়ে তার শ্যালিকাকে ছুরিকাঘাত করে।
“সীমার বাবা ১০-১২ জনের নামে মামলা দিল। সেখানে আমার ভাইকেও আসামি করা হয়। আমি মামলার সমাধান করতে চাই। কিন্তু রাকিব চায় না। সীমা সবার সামনে সব সত্য বলে দেয়। পরে সীমার বাবার কাছ থেকে মুচলেকা দিয়ে ভাইকে নিয়ে আসি।”
তিনি বলেন, “৩-৪ মাস পর সীমা মাহিরকে ফোন দেয়। আমাদের বাসায় আসতে চায়। কেন আসতে চায়, জানতে চাইলে বলে, রাকিব সমাধানে আসতেছে না। মামলা করবে। সীমা ওর বাবাকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসে। পরে আমার ভাইকে নিয়ে কোর্টে গিয়ে মামলা করে।
“মাহিরকে সবকিছু জানায়, তাকেও সাক্ষী করে। এটাই তার অপরাধ। তাকে হত্যা করতে হবে। তাকে তো হত্যা করার পারমিশন দেয়নি। নায়কের মতো ছেলেটাকে নির্মমভাবে হত্যা করলো।”
বাদী নার্গিছ বলেন, “আমাদের সবার ছোট ভাই। সন্তানের মত নিজের কাছে রেখে মানুষ করেছি। কখনো আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেনি। একটা পাখির মত জীবন কেড়ে নিল। আমরা ভাইটা নায়কের মত ছিল। আমার নায়কের মত ভাইটাকে কী নির্মমভাবে খুন করলো!
“আরাফাত রাকিবের কাছ থেকে টাকা পাইছে। আমার ভাইটাকে মারার জন্য ২০ হাজার টাকা কন্ট্রাক্ট করছে। আরাফাত কৌশলে মাহিরকে ডেকে নিয়ে খুন করিয়েছে। বুঝতে পারলে যেতে দিতাম না। ভাইটা আমার আলোর বাতি ছিল, অন্ধকার করে দিল। বাড্ডা এলাকায় মেরে তার বডিটা ফেলে হবিগঞ্জে।”
আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না অভিযোগ করে নার্গিছ বলেন, রাকিবুল ফোন করে হুমকি দিচ্ছে।
এ অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা হানিফ বলেন, “আমি জ্বিন না। আসামিরা তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করছে না। তারা বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ইউজ করছে।
“এ কারণে তাদের লোকেশন ট্র্যাক করা যাচ্ছে না। বাদীপক্ষ যদি আসামিদের অবস্থান কোথায় আছে জানে, তাহলে আমাদের তথ্য দিলে আমরা অভিযান চালাব।”
নার্গিছ খাতুনের অভিযোগ, রাকিবুল অশ্লীল ভিডিও করে টাকা আদায় করতো।
এমন অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “এখনো ডকুমেন্টেড এমন কিছু পাইনি।”
ইয়াসির আরাফাতের আইনজীবী হুমায়ন কবীর বলেন, “মামলাটা সম্পর্কে তেমন জানা নাই। ডিটেইলস জানা যায়নি। পাওয়ারটা দিছে, মামলাটা রেখেছি।”