১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নতুন পাঠ্যবই: ‘ফাঁস’ হওয়া পাণ্ডুলিপিতে নোট-গাইড বই ছাপানোর অভিযোগ

অনেকগুলো পর্যায় থেকে পাণ্ডুলিপি ফাঁস হতে পারে বলে ধারণা করছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান।

নতুন পাঠ্যবই: ‘ফাঁস’ হওয়া পাণ্ডুলিপিতে নোট-গাইড বই ছাপানোর অভিযোগ
শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দিতে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে কর্মব্যস্ততা। ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Dec 2024, 10:21 AM

Updated : 26 Aug 2026, 11:03 AM

আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দিতে অন্তর্বর্তী সরকার যখন প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই নতুন পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি ‘ফাঁস’ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। 

পাঠ্যবই মুদ্রণ তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) বলছে, ‘ফাঁস’ হওয়া পাণ্ডুলিপি দিয়ে নোট ও গাইড বই ছাপার অভিযোগও পেয়েছে তারা। 

এ অবস্থায় পাঠ্যবই ছাপা শেষ হওয়ার আগে নোট ও গাইড বই ছাপাতে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষেধ করে নোটিস জারি করেছে এনসিটিবি।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান এ কে এম রিয়াজুল হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরিমার্জিত বইয়ের পাণ্ডুলিপি ফাঁস করে নোট-গাইড ছাপা হচ্ছে বলে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একজন সদস্যকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেবে বলে আশা করা যাচ্ছে।”

তার ভাষ্য, চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই ছাপানোর কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। নতুন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই তুলে দিতে চায় এনসিটিবি। তাই আবারও নোটিস জারি করে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে বলে জানান তিনি। 

“কেউ (মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান) যদি সারাদিন নোট-গাইড ছাপিয়ে বলে কাগজ সংকটের কারণে পাঠ্যবই ছাপতে পারছি না, এমনটি যাতে না হয় তাই ওই নোটিস দেওয়া হয়েছে।” 

এর আগে অধ্যাপক রিয়াজুল জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত সময়ে বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে না পারা মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। 

২০০৮ সালের ১৩ মার্চ হাই কোর্ট এনসিটিবির অনুমোদন ছাড়া নোট বই ও গাইড বই প্রকাশ, বিতরণ ও বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেশের জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেয়। 

পাঠ্যবই ছাপা শেষ না হলে সহায়ক বই, অর্থাৎ নোট ও গাইড ছাপাতে নিষেধ করেছে এনসিটিবি। 

পাঠ্যবই ছাপা শেষ না হলে সহায়ক বই, অর্থাৎ নোট ও গাইড ছাপাতে নিষেধ করেছে এনসিটিবি।

সে রায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশকদের করা আপিল ২০০৯ সালের ৯ ডিসেম্বর খারিজ করে দিয়েছিল আপিল বিভাগ। 

এর আগে সরকার ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর নোট ও গাইড বই প্রকাশনা, বিতরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তবে ‘নোট-গাইডের’ লাগাম টানা বাস্তবে সম্ভব হয়নি। ২০১২ সালে চালু হওয়া সৃজনশীল শিক্ষাক্রমেও ‘নোট-গাইড’ নির্ভরতার অভিযোগ ছিল। 

‘নোট-গাইড ও কোচিং ব্যবসা’ ঠেকানোর কথা বলে ২০২৩ সালে অভিজ্ঞতা নির্ভর নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তবে গত ৫ অগাস্ট সরকারের পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন যোগ্য নয় বলে ঘোষণা দিয়েছে। তাই এক যুগ আগে প্রণীত ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের বইগুলো ‘ঘষা-মাজা’ করে ছাপার কাজ শুরু করেছে এনসিটিবি।

পাণ্ডুলিপি ‘ফাঁস’ করল কারা?

তদন্ত কমিটির প্রধান এনসিটিবির শিক্ষাক্রম উইংয়ের সদস্য অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরীর ধারণা, পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হাতে পাওয়া পাণ্ডুলিপির সিডি ব্যবহার করে নোট-গাইড ছাপানোর কাজ শুরু করতে পারে।

নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপি কারা ‘ফাঁস’ করেছে জানতে চাইলে অধ্যাপক রবিউল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা সিডিতে বইয়ের সফট কপি দিচ্ছি। সেনাবাহিনীকেও সিডি দেওয়া হয়েছে। প্রিন্টার্সদের মধ্যে কেউ যদি তা ফাঁস করে দেন বা নিজেরাই নোট-গাইড ছাপানোর কাজ শুরু করেন সেক্ষেত্রে আমরা কী করব?

“তবে আমরা অভিভাবক বেশে মার্কেটে মার্কেটে খোঁজ নিয়েছি। এখনও আগামী বছরের নতুন বইয়ের নোট-গাইড বাজারে আসেনি। বিক্রেতারা বলছেন, ফেব্রুয়ারি মাসে এসব বই পাওয়া যাবে। তারা এখন বার্ষিক পরীক্ষার নোট-গাইড নিয়ে ব্যস্ত।”

মুদ্রণ শিল্প সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আনোয়ার হোসাইন বলছেন, যারা শুধু প্রিন্টিংয়ের কাজ করে তারা নোট-গাইড তৈরি করে না। 

মুদ্রণ শিল্প সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আনোয়ার হোসাইন বলছেন, যারা শুধু প্রিন্টিংয়ের কাজ করে তারা নোট-গাইড তৈরি করে না।

নোট-গাইড বন্ধে এনসিটিবি কোনো উদ্যোগ নেবে কি না জানতে চাইলে এনসিটিবির শিক্ষাক্রম উইংয়ের এই সদস্য বলেন, “কিছু নিষিদ্ধ হলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে নির্বাহী বিভাগ বা আইনশৃ্ঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমাদের এ বিষয়ে করার তেমন কিছু নেই।”

অনেকগুলো পর্যায় থেকে পাণ্ডুলিপি ফাঁস হতে পারে বলে ধারণা করছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান এ কে এম রিয়াজুল হাসান। 

তিনি বলেন, “বই পরিমার্জনের পর সেগুলো পরিমার্জনে সংশ্লিষ্টরা টাইপ করেছেন, সেগুলো আমাদের এখানেও টাইপ হয়েছে, ডিজাইন করা হয়েছে- এর কোনো একটি পর্যায় থেকে তা ফাঁস হতে পারে। যদিও আমরা সংশ্লিষ্টদের আগেই এ বিষয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখতে বলেছি।”

মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো যা বলছে 

পাঠ্যবই ছাপানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সবাই নোট, গাইড বই তৈরিতে জড়িত নয় বলে দাবি করেছেন মুদ্রণ শিল্প সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আনোয়ার হোসাইন। 

তিনি বলেন, “যাদের নোট-গাইড ব্যবসা আছে তারা এমন কাজ করতে পারে তবে যারা শুধু প্রিন্টিংয়ের কাজ করে তারা এমনটি করে না।”

নতুন শিক্ষার্থীদের বই ছাপানোর কাজ পেয়েছে ‘অনুপম প্রিন্টার্স’ নামের মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানটির মূল কোম্পানি কাজল ব্রাদার্স লিমিটেড। এ প্রতিষ্ঠানটি ‘অনুপম গাইড’ প্রস্তুত ও বাজারজাত করে। 

নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করে গাইড প্রস্তুত হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে অনুপম প্রিন্টার্সের সত্ত্বাধিকারী মীর্জা আলী আশরাফ কাশেমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। 

তবে অনুপম প্রিন্টার্সের গোডাউন ইনচার্জ শহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা পাঠ্যবই ছাপার কাজ পেয়েছি, কিন্তু গাইড ছাপার কাজ শুরু হবে নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে যাওয়ার পর। আমরা এখনই গাইড ছাপানোর কাজ করছি না।”

বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছাবে তো?

ছাপা হচ্ছে ৪০ কোটি পাঠ্যবই, বাজেট বাড়ছে ৫৫০ কোটি টাকা

নতুন পাঠ্যবইয়ে কী বদল আসছে?

নতুন পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ কতদূর?

নতুন বই ছাপানোর দরপত্র উন্মুক্ত হচ্ছে ৭ অক্টোবর

'যথাসময়ে' নতুন বই পাবে শিক্ষার্থীরা: অর্থ উপদেষ্টা