Published : 20 May 2026, 07:12 PM
তীব্র গরমে অনেকেরই সহনশীলতা কমে যায়, ছোটখাটো বিষয়েও রাগ ওঠে, ধৈর্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
যানজট, ভিড় বা দৈনন্দিন চাপের মধ্যে এই রাগ যেন আরও দ্রুত বেড়ে যায়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “অনেকেই এটাকে স্রেফ মুড খারাপ বলে উড়িয়ে দেন। তবে এর পেছনে থাকতে পারে ‘হিট-রিলেটেড অ্যাগ্রেশন’, মানে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে রাগ বা আগ্রাসী আচরণের সম্পর্ক।”
‘হিট-রিলেটেড অ্যাগ্রেশন’ বলতে যা বোঝায়
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মানুষের মধ্যে সহিংস ও আক্রমণাত্মক আচরণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি মনোবিজ্ঞান এবং অপরাধবিজ্ঞানে স্বীকৃত একটি সত্য। সহজ কথায়, তীব্র গরম বা তাপপ্রবাহ মানুষের মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে সমাজে মারামারি, পারিবারিক সহিংসতা এবং অপরাধের হার বৃদ্ধি পায়।
এই ব্যাপারে গবেষকরা দুই ধরনের তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন।
তাপমাত্রা আগ্রাসন তত্ত্ব: মার্কিন মনস্তত্ত্ববিদ ড. ক্রেইগ এ. অ্যান্ডারসন ও তার সহকর্মীরা ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে ২০০০ সাল পর্যন্ত ল্যাবরেটরি এবং বাস্তব অপরাধের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে ধারাবাহিকভাবে এই গবেষণাগুলো পরিচালনা করেন। তার তৈরি 'জেনারেল অ্যাগ্রেশন মডেল' এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে স্বীকৃত।
এই তত্ত্বে ব্যাখ্যা করা হয়- অতিরিক্ত গরমে মানুষের শরীরে অস্বস্তি বাড়ে, যার ফলে ‘স্ট্রেস হরমোন’ এবং হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়। এটি মানুষকে খিটখিটে করে তোলে এবং তারা দ্রুত রেগে গিয়ে সহিংস আচরণ করে।
দৈনন্দিন আচরণ তত্ত্ব: এই ত্বত্ত্বের আবিষ্কারক মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানী লরেন্স ই.কোহেন এবং মার্কাস ফেলসন।
১৯৭৯ সালে গবেষণা সাময়িকী 'আমেরিকান সোসিওলজিক্যাল রিভিউ'তে তাদের এই গবেষণাপত্রে ব্যাখ্যা করা হয় যে- গরমের দিনে মানুষ সাধারণত ঘরের বাইরে বেশি সময় কাটায়। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মেলামেশা বাড়ায় অপরাধী ও ভুক্তভোগী সামনাসামনি হওয়ার সুযোগ বেড়ে যায়, যা অপরাধের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
এছাড়াও ‘এনভায়রনমেন্টাল হেল্থ পার্সপেকটিভ’-এ প্রকাশিত গবেষণায় উল্লেখ করা হয়- স্বল্পমেয়াদে প্রতি ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সহিংস অপরাধের ঝুঁকি প্রায় ৯% বৃদ্ধি পায়।
‘ইয়েল জার্নাল অফ বায়োলজি অ্যান্ড মেডিসিন’য়ে প্রকাশত সিউল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের করা গবেষণায় দেখা গেছে- পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির ফলে মানুষের ওপর আক্রমণের কারণে মৃত্যুর হার ১.৪% বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি পিছিয়ে নেই। এই বিষয়ে বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তরের পাঁচ বছরের অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বছরের প্রথম ও শেষ চার মাসের তুলনায় গরমের মাসগুলোতে (ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই) দেশে হত্যা, চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের মতো অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মানুষের মানসিক অস্বস্তি এই অপরাধ প্রবণতার অন্যতম বড় কারণ বলে উল্লেখ করেন তারা।
যেসব কারণগুলো কাজ করে
এই বিষয়ে ডা. দিনা বলেন, “এটি কোনো আলাদা রোগের নাম নয়, বরং একটি আচরণগত প্রবণতা। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে শরীর ও মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন ঘটে, তা আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় রাগ বা বিরক্তি দ্রুত প্রকাশ পায়।”
ওপরের গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আগ্রাসী আচরণের প্রবণতাও বাড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে গরমের দিনে সহিংস ঘটনার হারও তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
গরমে রাগ বাড়ার কারণ
যেভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়
গরমে রাগ বাড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, তবে এটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
শরীর ঠাণ্ডা রাখা: হালকা সুতির পোশাক পরা, ছায়াযুক্ত ঠাণ্ডা জায়গায় থাকার চেষ্টা করা।
পানি বেশি পান: শরীর আর্দ্র রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান জরুরি। পানিশূন্যতা কমলে মেজাজও স্থির থাকে।
ভালো ঘুম: পর্যাপ্ত ঘুম আবেগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাগের সময় বিরতি নেওয়া: অস্থির লাগলে কিছুক্ষণ থেমে যেতে হবে। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ট্রিগার চিনুন: কোন পরিস্থিতিতে রাগ বাড়ে, তা আগে থেকে বুঝে সতর্ক থাকা উপকারী।
গরমে রাগ বাড়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং শরীর ও মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া। তবে বারবার রাগ প্রকাশ পেলে সেটা সম্পর্ক, কাজ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শরীরের পাশাপাশি মনের যত্নও নিতে হবে।
পর্যাপ্ত পানি পান করা, ঘুম ঠিক রাখা এবং প্রয়োজনে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা ইতিবাচক প্রভাব রাখে।
আরও পড়ুন