Published : 25 Feb 2026, 03:42 PM
দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া বা মতবিরোধ খুবই স্বাভাবিক। তবে স্ত্রী রেগে গেলে অনেক স্বামীর প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় নীরবতা।
শুধু বিবাহিত জীবনে নয়, সম্পর্কে থাকা নারী পুরুষের মধ্যেও এমন ঘটতে দেখা যায়।
বাইরে থেকে এটি উদাসীনতা বা অনুভূতিহীনতা মনে হলেও মনোবিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি প্রায়শই তেমন নয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “এই নীরবতা অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের মস্তিষ্কের এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা। ঝগড়ার তীব্র চাপে তাদের আবেগ-বোঝার ক্ষমতা কমে যায়, ফলে তারা চুপ করে যায়।”
টেক্সাসের দম্পতি বিল ও জেনের গল্প এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। জেন ছিলেন প্রাণবন্ত, কথা বলতে ভালোবাসতেন। বিল ছিলেন স্বল্পভাষী, অন্তর্মুখী। জেন যত বেশি অনুভূতি প্রকাশ করতে চাইতেন, বিল তত বেশি নিজেকে গুটিয়ে নিতেন। জেনের অভিযোগ ছিল, স্বামী পাশে থাকলেও তিনি একাকিত্ব অনুভব করতেন।
কাউন্সেলিংয়ে বিল মন্তব্য করেন, তিনি চুপ করে থাকাকেই নিরাপদ মনে করতেন। তার ধারণা ছিল, কথা বললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। শেষ পর্যন্ত জেন এই নীরবতা আর সহ্য করতে না পেরে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন।
ডা. ফারজানা রহমান দিনা এই উদাহরণ টেনে বলেন, “এ ধরনের ঘটনা খুবই সাধারণ। পুরুষেরা কথা বলতে না পারার পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করে— লজ্জা ও উপেক্ষিত হওয়ার ভয়।”
সমাজ পুরুষদের শেখায় আত্মনির্ভরশীল হতে, দুর্বলতা প্রকাশ না করতে। ফলে কাউকে প্রয়োজন, এ কথা স্বীকার করাকে তারা দুর্বলতা বলে মনে করে।
এছাড়া অনেক পুরুষ বিশ্বাস করে, ঝগড়ার সময় মুখ খুললে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তাই ঝুঁকি এড়াতে তারা নীরবতা বেছে নেয়।
স্ত্রী সামান্য অসন্তুষ্ট হলেই তারা সেটিকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে দেখে। অনেকের জীবনের নীতিবাক্য হয়ে ওঠে— ‘স্ত্রী খুশি তো সংসার সুখী’।
ফলে নিজের অনুভূতি চাপা দিয়ে শুধু শান্তি বজায় রাখাই তাদের লক্ষ্য হয়। এতে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় ব্যক্তিসত্তা।
এই নীরবতা শুধু মনের ব্যাপার নয়, এর পেছনে জৈবিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া (ইউএসসি)’ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র ঝগড়ার সময় পুরুষদের মস্তিষ্কের সেই অংশগুলো কম সক্রিয় হয়ে পড়ে, যেগুলো আবেগ ও সহমর্মিতা বুঝতে সাহায্য করে।
ইউএসসির ‘কগনিটিভ অ্যান্ড ইমোশনাল ল্যাব’য়ের পরিচালক ড. মারা ম্যাদর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকাশনায় উল্লেখ করেন, “অতিরিক্ত চাপের মুখে পুরুষদের মস্তিষ্ক ভয় বা রাগের মতো আবেগপূর্ণ মুখভঙ্গি ঠিকভাবে ধরতে পারে না। তখন মস্তিষ্ক নিজেকে রক্ষা করতে এক ধরনের বিশ্রাম অবস্থায় চলে যায়। ফলে অনেক পুরুষ চুপ করে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো ঘটে। চাপ বাড়লে তাদের আবেগ বোঝার ক্ষমতা আরও তীব্র হয়। তাই তারা তখন বেশি কথা বলতে ও অনুভূতি ভাগাভাগি করতে চায়। এতেই তৈরি হয় সমস্যা। স্ত্রী যত বেশি কথা বলে কাছে আসতে চায়, স্বামী তত বেশি চাপ অনুভব করে নীরব হয়ে যায়। আর এই নীরবতাই দাম্পত্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।”
ডা. দিনা বলেন, “এই বিষয় যদি আমরা জৈবিক বাস্তবতা হিসেবে বুঝতে পারি, তাহলে দাম্পত্যে সহনশীলতা ও বোঝাপড়া বাড়ানো সম্ভব।”
অনেক সময়- পুরুষের নীরবতা মানে অনুভূতির অবহেলা নয়, তা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তাই এমন অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে কথা বলার জন্য চাপ না দিয়ে শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করলে পুরুষদের পক্ষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা সহজ হয়।
দাম্পত্য জীবনে সুস্থ সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি হল- একজন আরেকজনের আচরণের পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করা। এতে নীরবতার আড়ালেও না বলা বহু কথা লুকিয়ে থাকে।
সমাধানের পথে প্রয়োজন সহানুভূতি ও ধৈর্য। পুরুষদের নীরবতাকে অবহেলা না ভেবে বোঝার চেষ্টা করলে সম্পর্কে গভীরতা বাড়ে।
নারীরা যেমন কথা বলে মনের ভার লাঘব করতে চান, পুরুষরা চুপ করে থেকে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
দুজনের এই ভিন্নতা বোঝা গেলে ঝগড়া কমে, বোঝাপড়া বাড়ে। দাম্পত্যে সবচেয়ে বড় শক্তি হল- কথা না বললেও, একে অপরের মনের কথা শোনা।
আরও পড়ুন