Published : 16 Jun 2025, 03:46 PM
রাগ বা ক্রোধ মানুষের স্বাভাবিক বিষয়। যদিও বেশিরভাগ সময় মনে করা হয়, রাগ হল নেতিবাচক অনুভূতি। তবে এর উপকারিতাও রয়েছে।
নিজের প্রয়োজন মেটানো বা কোনো কিছু পরিবর্তনে উৎসাহ যোগাতে পারে রাগ।
তবে দীর্ঘমেয়াদে রাগ ক্রোধ অনুভব করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে মানসিকতা ও দৈনিক জীবনযাত্রায় বাজে প্রভাব ফেলে।
রাগ যখন সমস্যা
রাগের কারণে বিরক্তি, জ্বালা, তিক্ততা ইত্যাদি অনুভূত হয়।
মার্কিন মনোচিকিৎসক এলি মার্কম্যান হেল্থডকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “শুধু মানসিক নয়, শারীরিক প্রভাবও পড়ে রাগের কারণে। যেমন- হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়, ঘাম হয়, দাঁতে দাঁত ঘসা এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়া।”
এছাড়া মানসিক চাপে হরমোন যেমন- অ্যাড্রেনালিন বৃদ্ধি পায়।
একেকজনের রাগ একেক রকম। কেউ ভেতরে পুষে রাখে। কেউ আবার সাথে সাথে প্রকাশ করে।
ভেতরের রাগ
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাগ হল অপ্রীতিকর অনুভূতি। যে কারণে অনেক মানুষ রাগ প্রকাশ করেন না। এই পুষে রাখার ক্রোধের কারণে দেখা দিতে পারে বিষণ্নতা, বাড়তে পারে রক্তচাপ আর মানসিক স্বাস্থ্যে পড়ে বিরূপ প্রভাব।
প্রকাশ্য রাগ
যারা রাগ দমিয়ে রাখতে পারে না, তারা সাধারণত চিৎকার করে। সহজেই বিরক্ত হয়। মনে হয় তারা সব সময় রেগে আছে। এই ধরনের রাগ প্রায়ই সম্পর্কে এবং কর্মক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে। সময়ের তালে এর থেকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করার চরিত্র প্রকাশ পায়।
অপ্রতিরোধী রাগ
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’য়ের তথ্যানুসারে- দীর্ঘদিন রাগ পুষে রাখার ফলে ‘প্যাসিভ অ্যাগ্রেসিভ বিহেইভিয়র’ দেখা দিতে পারে। যেখানে রাগ সরাসরি নয় ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে প্রকাশ পাবে। এই অবস্থায় কেউ হয়ত চিল্লাবে না বা শারীরিকভাবে আঘাত করতে আসবে না, বরং অন্যকে নিয়ে সমালোচনা করবে, নেতিবাচক কথা বলবে অথবা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে যা হবে ক্ষতিকর।
শিশুদের মধ্যে রাগ
মানসিক বিপর্যয়ের লক্ষণ হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে শিশুদের মধ্যে রাগ ও ক্ষোভ। এর মধ্যে রয়েছে পা ছোড়া, চিৎকার এবং পা ঠোকা। শিশুকাল থেকে স্কুলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সাধারণত এরকম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পরে বড় হওয়ার সাথে সাথে এগুলো কমে যায়।
যে কারণে রাগ হয়
বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে রাগ হতে পারে। আবার একজনের রাগের কারণ অন্যজনের মধ্যে নাও কাজ করতে পারে।
এলি মার্কম্যান বলেন, “রাগ হল দ্বিতীয় স্তরের অনুভূতি। মানে রাগ হওয়ার পেছনে প্রাথমিক কিছু অনুভূতি কাজ করে। যেমন- ভয়, ব্যথা, লজ্জা, দুঃখ এবং মানসিক চাপ।
মানসিক সমস্যা
পাশাপাশি রাগ হওয়া হতে পারে মানসিক রোগের লক্ষণ। রাগের সাথে মানসিক রোগের উপসর্গের মধ্যে রয়েছে-
বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা, ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি), আতঙ্ক, অ্যাগোরাফোবিয়া (পরিস্থিতি বা পরিবেশ যেখান থেকে বের হয়ে বা পালিয়ে যেতে না পারা), পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বা ব্যক্তিত্বের ব্যাধি।
ড্রাগস এবং অ্যালকোহল
যারা নিয়মিত নেশার দ্রব্য গ্রহণ করেন তাদের মাঝে অযাচিত রাগ দেখা দেয়। অ্যালকোহল গ্রহণের সাথে রাগ তৈরি হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে। কারণ এর ফলে মস্তিষ্কের পরিবর্তন ঘটে- জানান এলি মার্কম্যান।
পরিস্থিতিগত রাগ
• অনেক সময় জীবনের বাজে অভিজ্ঞতার কারণেও রাগ কাজ করে। যেমন-
• তরুণ বয়সে রাগ বেশি থাকে, বয়স বাড়লে রাগের মাত্রা কমে।
• ছোটবেলায় বা শিশুকালে নির্যাতিত বা অবহেলা পাওয়ার অভিজ্ঞতা
• দুর্ঘটানার অভিজ্ঞতা বিশেষ করে ছোটবেলায়।
নির্দিষ্ট কিছু বিষয় যখন রাগের কারণ
• গাড়ি চালানোর সময় বিরক্ত হওয়া, যেমন- যানজটে বসে থাকা।
• ঘুমের অভাব
• খিদা লাগা
• শারীরিক ব্যথা
• সামাজিক চাপ ও সামাজিকভাবে অবহেলা পাওয়া
• সামাজিক কারণে একাকিত্ববোধ
• প্রত্যাখ্যানের অনুভূতি ও প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা
• যে কোনো কারণে হতাশা বোধ
অনিয়ন্ত্রিত রাগের প্রভাব
রাগ থেকে নানান অযাচিত ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে যখন ক্ষোভ দমন বা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
এসবের মধ্যে রয়েছে মানসিক সমস্যা, ব্যবহারে সমস্যা, সম্পর্কে জটিলতা ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা; যার মধ্যে রয়েছে রক্তচাপ বৃদ্ধি ও হৃদরোগ হওয়া।
রাগ নিয়ন্ত্রণের পন্থা
যদি মনে হয় রাগ একটি রোগ হিসেবে দাঁড়িযে যাচ্ছে তবে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এরমধ্যে কার্যকর পন্থা হতে পারে থেরাপি গ্রহণ।
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব। এছাড়ও ব্যক্তিগতভাবে বেশ কিছু কৌশল রপ্ত করা যেতে পারে।
• কখন কী কারণে রাগ হচ্ছে যে ব্যাপারে সচেতন হওয়া। আর সেটা চিহ্নি করার পর, এমন ধরনের অবস্থা তৈরি হলে নিজেকে দ্রুত সরিয়ে নিতে হবে। যাতে দ্বিতীয় ধাপে শান্তভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
• যে কারণ বা পরিস্থিতিতে রাগ হয় সেসব বিষয়ে গভীরে না যাওয়া।
• অতীতের যেসব পরিস্থিতে রাগ হত, প্রতিনিয়ত সেসব পরিস্থিতি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে।
• ‘সব কিছুই বিরক্তিকর’ এভাবে ভাবার পরিবর্তে চিন্তা করতে হবে ‘যদিও এটা কঠিন, তবে আমি উৎরে যেতে পারবো’।
• নিজেকে শান্ত করার কৌশল রপ্ত করতে হবে। যেমন- গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া, আরাম বোধের জন্য শান্ত কিছু কল্পনা করা।
• শারীরিকভাবে কর্মচঞ্চল থাকার চেষ্টা করতে হবে। ব্যায়াম শরীরচর্চা ভালো বোধের হরমোন নিঃসরণে সহায়তা করে।
• কোনো তর্ক বা কথা বলার সময় একটু দম নিতে থামুন। তারপর চিন্তা করতে হবে, এরপর যা বলতে যাচ্ছেন সেটা কি রাগের মাথায় বলতে যাচ্ছেন? যদি তাই হয় তবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে তবেই শব্দ উচ্চারণ করতে হবে।
কখন সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন
ওপরের বিষয়গুলো কাজ না করলে ধরে নেওয়া যেতে রাগ মানসিক রোগের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এছাড়াও আরও কিছু বিষয় আছে যেগুলোর কারণে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
• যদি নিজে বা কাছের কেউ মনে করে রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
• যদি রাগের কারণে দৈনিক কাজকর্ম করতে অসুবিধা হয়।
• যদি রাগ সম্পর্কে ঝামেলা তৈরি করে।
• যদি রাগ থেকে আক্রমনাত্মক আচরণ দেখা দেয়।
• যদি রাগ থেকে মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের মতো কাণ্ড ঘটে।
• যদি রাগের কারণে মানসিক সমস্যা অতিমাত্রায় দেখা দেয়, যেমন- বিষণ্নতা বা দুশ্চিন্তা।
• যদি কাছের মানুষও আপনার রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়।
আরও পড়ুন
রাগান্বিত বোধ করলে কিছু খাবার এড়ানো উচিত
দীর্ঘায়ু পেতে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ