Published : 28 Oct 2025, 05:50 PM
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির লেক এখন আর শুধু হাঁটার পথ বা ছবি তোলার জায়গা নয়। এখানে যোগ হয়েছে নতুন রোমাঞ্চ— ‘কায়াকিং বোট’ এবং ‘ওয়াটার জরবিং’।
কায়াকিং বোট
শান্ত পানির বুকে ভেসে থাকা রঙিন নৌকার সারি, পেছনে অস্তগামী সূর্যের সোনালি আভা, সামনে দুজনের মৃদু হাসি— দৃশ্যটা যেন কোনো ছবির ফ্রেম।

এই লেক বা হ্রদে কায়াকিংয়ের অভিজ্ঞতা শহরের কোলাহলের মাঝে এক টুকরো শান্তি এনে দেয়।
‘কায়াকিং বোট’ ভাড়া পাওয়া যায় সহজেই। জনপ্রতি মাত্র ১শ’ টাকায় ৩০ মিনিটের এই অভিজ্ঞতা উপভোগ করা যায়।
দুই সিট বা তিন সিটের বোটে চড়ে পুরো লেক ঘুরে দেখা যায়। দাম কম হলেও অভিজ্ঞতা অমূল্য।

লেকের ধারে ছোট্ট একটি টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নৌকার ঘাটে যেতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বোট চালিয়ে নির্ধারিত জায়গায় ফিরে আসতে হয়।
কীভাবে যাবেন
কায়াকিংয়ের অবস্থান খুঁজে পাওয়াও সহজ। মেট্রোরেলের উত্তরা সেন্টার স্টেশনে নেমে দিকনির্দেশনা মিলবে। ৬০ নম্বর পিলার থেকে গুনে ৭৫ নম্বর পিলারের কাছে পৌঁছালেই চোখে পড়বে রঙিন বোটগুলো, পানিতে দোল খাচ্ছে।
দূর থেকেই দেখা যায়, বোটগুলো যেন লেকের বুকে ছোট ছোট রঙিন দ্বীপ।

বিকেলের আলোয় লেকের পানি সোনালি রংয়ে ঝলমল করে। কায়াক বোটে ভেসে থাকা মানুষদের মুখেও সেই আলোর প্রতিফলন।
কেউ প্যাডল হাতে বোট চালাচ্ছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউবা চুপচাপ পানির ছলাৎ শব্দে মগ্ন।
নববিবাহিত দম্পতি বা নতুন সম্পর্কের তরুণ-তরুণীদের ভিড় এখানে বেশি। হাসিখুশি মুখে তারা বোটে ওঠেন, ধীরে ধীরে লেকের মাঝখানে চলে যান। দূর থেকে ভেসে আসে তাদের হাসির শব্দ।
ফাহিম ও স্বর্ণা, সম্প্রতি বিয়ে করা এক দম্পতি, এসেছেন কায়াকিংয়ের অভিজ্ঞতা নিতে। সামনে বসেছেন স্বর্ণা, পেছনে ফাহিম বোট চালাচ্ছেন।

ঘুরে এসে অভিজ্ঞতা প্রকাশে তারা বলেন, “একসঙ্গে এই সময়টা কাটানো দারুণ লাগল। একে অপরকে আরও কাছ থেকে জানার সুযোগ হল। এটা একেবারে অন্যরকম অভিজ্ঞতা।”
লেকে এখন প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি বোট চলছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিড় থাকে প্রায় নিরবচ্ছিন্ন। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউবা একা শান্তির খোঁজে আসেন।
নিরাপত্তার জন্য সবাইকে লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হয়। কেউ কেউ গরমের কারণে জ্যাকেট খুলে রাখলেও নিরাপত্তা কর্মীরা সবসময় কাছেই থাকেন, প্রয়োজনে সাহায্য করতে।

প্রথমবার বোট চালানো একটু কঠিন মনে হলেও কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাল মিলে যায়। প্যাডল সামলাতে অভ্যাস লাগে, তারপর লেকের জলে শুধু ঢেউ নয়, আত্মবিশ্বাসের দোলাও ওঠে।
স্বেচ্ছাসেবক রুবেল বলেন, “বিকেল থেকে ভিড় বাড়ে। সূর্যাস্তের সময় বোট চালাতে সবাই পছন্দ করেন। তখন লেকটা যেন আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।”
লেকের ধারে বসে দেখা যায়, দূরে ছোট ছোট বোট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ভেসে চলেছে। কেউ চুপচাপ পানির দোলায় ভাসছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মেতেছেন। তীরে বসা মানুষ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন।

কায়াকিং এখন উত্তরার তরুণদের নতুন আড্ডার ঠিকানা। শহরের ব্যস্ততার মাঝে এই শান্তি যেন অক্সিজেনের মতো।
সন্ধ্যায় বোটগুলোর গায়ে আলো জ্বলে ওঠে, লেকের জলে তারার ঝিলমিল। কায়াকিং শেষে ফিরে আসা মানুষের মুখে হাসি আর ভেজা বাতাসের গন্ধ।
ওয়াটার জরবিং
দিয়াবাড়ির লেকের আরেক রোমঞ্চকর আয়োজন হল- পানির ওপর ভাসমান স্বচ্ছ বলের ভেতর মানুষে গড়াগড়ি খাওয়া। এই অভিজ্ঞতার নাম ‘ওয়াটার জরবিং’।
দূর থেকে দেখলে মনে হয়, তারা পানির ওপর হাঁটছে! আসলে তারা এই বিশেষ বলের ভেতরে। শিশু থেকে তরুণ, সবাই এই রোমাঞ্চের ডাকে ছুটে আসছেন।

এই মজার অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে জনপ্রতি ২শ’ টাকায় ১৫ মিনিট সময় পাওয়া যায়। প্রতিটি বলে সর্বোচ্চ দুজন উঠতে পারেন। খেলা চলে দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
টিকিট কাটলেও সুযোগ পাওয়া যায় ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ নীতিতে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো।
উত্তরা মাইলস্টোন স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আবিদ বলল, “বন্ধুদের কাছে শুনে এসেছি। প্রথমে বলের ভেতর ঢুকে একটু ভয় লাগলেও মজা ছিল অসাধারণ। আবার আসব!”
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন চার তরুণ— জুনায়েদ আল হাবিব, নূর মোহাম্মদ সরকার, হাসিবুল ইসলাম শান্ত ও আল আমিন সরকার। সবাই কলেজপড়ুয়া।
হাসিবুল ইসলাম শান্ত বলেন, “আমরা জাপান থেকে এই বলগুলো এনেছি। ২৮ আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছি।”
শুরুতে তিনটি বল দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও চাহিদা বেড়ে এখন বলের সংখ্যা ১০।

আল আমিন সরকার বলেন, “চার-পাঁচটি বল দিলেই চাহিদা মেটে। তবে আমরা সবগুলো একসঙ্গে ব্যবহার করি না।”
প্রতিটি বল ১২০ কেজি ওজন বহন করতে পারে। নিরাপত্তার জন্য বলগুলো রশি দিয়ে বাঁধা থাকে, যাতে পানিতে ভেসে না যায়। লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হয়, তাই ডুবে যাওয়ার কোনো ভয় নেই।
ধারালো বস্তু, যেমন- ছুরি, চাবি বা ঘড়ি নিয়ে বলের ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। বলের ভেতরে পর্যাপ্ত বাতাস ভরা হয়, ফলে অক্সিজেনের কোনো ঘাটতি হয় না।
স্বেচ্ছাসেবক সানি, এহসানুল হক ও সাব্বির রহমান বাতাস ভরার কাজে সহায়তা করেন।
তাদের কাছ থেকে জানা গেল- অনেকে ভয় পান, বাতাস বন্ধ হয়ে যাবে। তবে নিশ্চিত করা হয় পর্যাপ্ত বাতাস দেওয়ার, যাতে কোনো সমস্যা না হয়।
তবে কিছু ছোটখাটো অভিযোগও আছে।

তরুণ রবিন বলেন, “কখনও কখনও আগের ব্যবহারকারীর ঘামের গন্ধ থেকে যায়, যা একটু অস্বস্তিকর। তাই সকালে বা দুপুরে আসলে ভালো।”
তবে এই অভিযোগ মজার অভিজ্ঞতার কাছে ম্লান।
দিয়াবাড়ির লেক এখন ছোটখাটো উৎসবের জায়গা। পরিবার, বন্ধু, প্রেমিক-প্রেমিকা— সবাই ছুটে আসছেন। পানির ওপর গড়িয়ে যাওয়া, ভারসাম্য রাখার চেষ্টা, হাসতে হাসতে পড়ে যাওয়া— এ সবই এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
হাসিবুল ইসলাম শান্ত বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম মানুষ ব্যতিক্রমী কিছু উপভোগ করুক। এটা ঢাকার মধ্যে এক নতুন অভিজ্ঞতা।”
কীভাবে যাবেন
লেকে পৌঁছানো বেশ সহজ। মেট্রোরেল উত্তরা সেন্টার স্টেশনটি ৬০ নম্বর পিলার। এর থেকে গুনে ৭৬ নম্বর পিলারের কাছে গেলেই স্বচ্ছ বলগুলো চোখে পড়বে।

বিকেলের আলোয় পানিতে রঙিন প্রতিফলন তৈরি হয়। স্বচ্ছ বলের ভেতর মানুষকে ভাসতে, পড়তে, হাসতে দেখা যায়। ক্যামেরার ক্লিক আর শিশুদের চিৎকারে মুখরিত হয় চারপাশ।
নিরাপত্তা ও বিনোদনের এই মিশেলে দিয়াবাড়ির লেক এখন ঢাকার তরুণদের নতুন আড্ডার ঠিকানা।
মাত্র ১৫ মিনিটের এই জলভ্রমণ অনেকের কাছে মনে রাখার মতো মুহূর্ত। তাই বন্ধু বা পরিবার নিয়ে ঘুরে আসাই যায় এই জায়গা থেকে।
আরও পড়ুন
ধীরে ভ্রমণ: পৃথিবী দেখার এক নতুন উপায়
স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেরা: অন্নপূর্ণা বেইস ক্যাম্প