Published : 23 Jun 2026, 06:41 PM
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থেকে ৬০ দিনের সাময়িক অব্যাহতি পাওয়ায় ইরান শত শত কোটি ডলারের সুবিধা পেতে চলেছে।
কিন্তু চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের ওপর আরোপিত আরও নানা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধের জটিল জাল ছিন্ন করতে গেলে তা আইনি, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে, যাতে সময় লেগে যেতে পারে বছরের পর বছর।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি ইরানের জন্য স্থায়ী অর্থনৈতিক স্বস্তি বয়ে আনবে কিনা, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল ও বেসরকারি খাতের ঝুঁকি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। এই সাময়িক ছাড়ের ঘোষণাটি এসেছে গত সোমবার।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) দেশটির ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ, বাণিজ্য অবরোধ ও সম্পদ জব্দের মতো ব্যবস্থা নিয়ে আসছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের অধীনে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারণ করা সময়সীমা অনুযায়ী ধাপে ধাপে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করার কথা রয়েছে। তার আগে ৬০ দিনের সাময়িক ছাড়ের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রণালয় আগামী ২১ অগাস্ট পর্যন্ত ইরানি অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোকেমিক্যালের উৎপাদন ও বিক্রির সাময়িক অনুমতি দিয়ে সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছে।
ইরানের ওপর আরোপিত বাদবাকী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া-যদি সেটি ঘটে- তাহলেও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের পশ্চিম এশিয়া নীতি আমূল বদলাতে হবে। যে নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব খর্ব করা এবং দেশটির সরকারকে দূর্বল করতে অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে আসছে।
তাছাড়া, কিছু পদক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় নির্বাহী ব্যবস্থা নেওয়া, অন্যান্য পদক্ষেপে কংগ্রেসের অনুমোদন পাওয়া এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য দেশ যারা ইরানের ওপর নিজস্ব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে তাদের সঙ্গে সমন্বয় করাটাও কঠিন হবে।
“নিষেধাজ্ঞার এই জটিল জাল কেবল নির্বাহী আদেশই নয় বরং কংগ্রেসের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা দিয়েও তৈরি হয়েছে”, বলেছেন মার্কিন সন্ত্রাসবিরোধী উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হুয়ান জারাতে।
কংগ্রেসের সংশয় ও আইনি জটিলতা
১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের পর প্রথম ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ওয়াশিংটন। এরপর থেকে পারমাণবিক কর্মসূচি, গাজার হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতিদের মতো গোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগে মার্কিন কংগ্রেস একাধিক নিষেধাজ্ঞা আইন পাস করে।
২০২৫ সালের শুরু থেকে মার্কিন অর্থমন্ত্রণালয়ের ‘অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল’ এক হাজারেরও বেশি ব্যক্তি, জাহাজ ও বিমানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞ ও নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, এই হাজার হাজার সংস্থাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা বাতিল করতে পারলেও, কংগ্রেসের পাস করা আইনগুলো প্রত্যাহারে আইনপ্রণেতাদের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
ইতিমধ্যেই রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন। বিশেষজ্ঞরা একে একটি ‘পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর’ মতো দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করছেন।
বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ও আইআরজিসি বিতর্ক:
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই মাসের সাময়িক লাইসেন্সের কারণে ইরান প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। এই চুক্তি স্থায়ী হলে তা শত শত কোটি ডলারে পৌঁছাবে, যা ইরানের তেল রপ্তানি বাড়াতে সাহায্য করবে।
বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও চীনের কাছে প্রায় ৯০ শতাংশ তেল বিক্রি করে ইরান। নতুন এই লাইসেন্সটি আগের চেয়ে অনেক ব্যাপক, যার মধ্যে তেল বাণিজ্যের পাশাপাশি ব্যাংকিং, বিমা এবং পরিবহন খাতও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ফলে অর্থ এমন সব গোষ্ঠীর কাছে চলে যেতে পারে যাদের যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে।
বিশেষ করে ইরানের শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর কাছে মার্কিন অর্থ পৌঁছানোর বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজার ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সতর্কতা
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হলেও বৈশ্বিক ব্যাংক, তেল কোম্পানি এবং বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনই ইরানে বড় বিনিয়োগে যাচ্ছে না। চীন, রাশিয়া বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের কারণে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঝুঁকি এবং আইনি জটিলতা বহাল রয়েছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের সন্ত্রাস দমন বিষয়ক উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হুয়ান জারাতে বলেন:
"আমরা বাজারকে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে এসেছি। তাই হুট করে একটা সুইচ টিপেই সবকিছু স্বাভাবিক করে দেওয়া সম্ভব নয়।"
তাছাড়া ২০১৬ সালের ‘জাস্টিস এগেইনস্ট স্পনসর্স অব টেররিজম অ্যাক্ট’ (জাস্টা) আইনের অধীনে ভুক্তভোগীরা এখনও ইরানে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করার অধিকার রাখেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ইরানে শত কোটি ডলারের বড় কোনও বিনিয়োগের ঝুঁকি নেবে না।