Published : 04 Dec 2025, 01:22 PM
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দুই দিনের ভারত সফর শুরু করছেন বৃহস্পতিবার; এ সফরে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণ নেবেন।
এ সফরে দিল্লি ও মস্কোর মধ্যে একাধিক চুক্তি সই হতে পারে। এটি এমন এক সময়, যখন মাস কয়েক আগেই রুশ তেল কেনা বন্ধ করতে ভারতের ওপর চাপ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে রাশিয়া ও ইউক্রেইনের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছে।
কয়েক দশক ধরেই ভারত ও রাশিয়া ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং পুতিন-মোদীর সম্পর্কও উষ্ণ। কেন তাদের একে অপরকে দরকার এবং বৈঠকে কী নজর রাখা উচিত—তা বিশ্লেষণ করেছে বিবিসি।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রেমলিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন?
• প্রায় দেড় বিলিয়ন জনসংখ্যা
• ৮ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতি।
এসব কারণে রুশ পণ্য ও সম্পদ, বিশেষ করে তেলের জন্য ভারত অত্যন্ত আকর্ষণীয় বাজারে পরিণত হয়েছে। ভারত এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল ভোক্তা, দেশটি বিপুল পরিমাণ তেল কিনছে রাশিয়া থেকে।
অবশ্য পরিস্থিতি আগে এমন ছিল না। ইউক্রেনে আক্রমণের আগে ভারতের মোট তেল আমদানির মাত্র ২.৫ শতাংশ ছিল রাশিয়ার।
সেই অংক বেড়ে ৩৫ শতাংশে উঠেছে; কারণ মস্কোর ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার ফলে কম দামে তেল পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে ভারত। ইউরোপীয় বাজারে রাশিয়ার প্রবেশ সীমিত হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতি ভারতের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও ওয়াশিংটনের জন্য নয়।
গত অক্টোবরে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য, রাশিয়ার তেল কিনে ক্রেমলিনের যুদ্ধ তহবিলকে সহায়তা করছে ভারত। এরপর থেকে ভারত রুশ তেলের ক্রয়াদেশ কমাতে শুরু করেছে। সফররত পুতিন চাইবেন ভারত আবার ক্রয়াদেশ বাড়াক।

বিবিসি লিখেছে, মস্কোর জন্য ভারতের কাছে অস্ত্র বিক্রি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার—সেই সোভিয়েত যুগ থেকেই বিষয়টি চলছে।
ভারত অত্যাধুনিক রুশ যুদ্ধবিমান ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে চাইছে বলে খবর বেরিয়েছে পুতিনের সফরের আগেই। ভারতের দক্ষ কর্মীশক্তিকেও মূল্যবান মনে করে শ্রমিক সংকটে পড়া রাশিয়া। তবে ভূ-রাজনৈতিক কারণেও ক্রেমলিনের কাছে ভারত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেইন যুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্ব চেষ্টা করেও যে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি, এটা দেখাতে পছন্দ করে ক্রেমলিন। উড়ে ভারতে এসে মোদীর সঙ্গে বৈঠক করার এটিও একটি কারণ।
একই কারণে মাস তিনেক আগে চীনে গিয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন পুতিন। সেই সফরে তিনি মোদীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছিলেন।
বিবিসি লিখেছে, তিন নেতার হাসিমুখে কথোপকথনের ছবিতে তখন ফুটে ওঠে—ইউক্রেইন যুদ্ধের মধ্যেও রাশিয়ার শক্তিশালী মিত্র রয়েছে, যারা ‘বহুমেরু বিশ্ব’ ধারণাকে সমর্থন করে।

চীনের সঙ্গে ‘অবারিত অংশীদারত্ব’ নিয়ে গর্ব রয়েছে রাশিয়ার। একইভাবে ভারতের সঙ্গে ‘বিশেষ ও অগ্রাধিকারমূলক কৌশলগত অংশীদারত্ব’র কথা জোর দিয়ে বলে থাকে মস্কো।
এই দুই সম্পর্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে রাশিয়ার তীব্র টানাপড়েনের একবারেই বিপরীত।
রাশিয়ার সংবাদপত্র নোভায়া গেজেটার কলামিস্ট আন্দ্রে কালেসনিকভ বলেন, “ক্রেমলিন মনে করে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে ইউরোপ সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
“আমরা বিচ্ছিন্ন নই, কারণ এশিয়া ও গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আছে। অর্থনৈতিকভাবে ভবিষ্যৎ এখানেই। এই অর্থে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতই রাশিয়া আবার প্রধান শক্তি হিসেবে ফিরে এসেছে।”
তিনি বলেন, “তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম জার্মানি ও ফ্রান্সের যোগাযোগের বিশেষ চ্যানেল ও সম্পর্ক ছিল। তাদের ছিল বহুমুখী নীতি। কিন্তু এখন আমরা সম্পূর্ণভাবে ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন। এটি নজিরবিহীন।
“আমাদের দার্শনিকরা সবসময় বলেছেন যে, রাশিয়া ইউরোপেরই অংশ। এখন আমরা আর তা নই। এটি একটি বড় ব্যর্থতা এবং বড় ক্ষতি। আমি নিশ্চিত যে, রাশিয়ার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক মহলের একটি অংশ আবার ইউরোপে ফিরে যেতে এবং কেবল চীন ও ভারতের সঙ্গে নয়, ইউরোপের সঙ্গেও ব্যবসা করার স্বপ্ন দেখছে।”
এ সপ্তাহে রাশিয়া ও ভারতের বন্ধুত্ব, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির খবরই বেশি শোনা যাবে।
মোদীর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পরীক্ষা
পুতিন এমন এক সময়ে ভারত সফরে আসছেন, যখন মোদী ও ভারতের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় চলছে।
বিবিসি লিখেছে, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক সোভিয়েত যুগ থেকেই চলে আসছে এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও তা অটুট রয়েছে। তবে অন্য রুশ নেতাদের তুলনায় পুতিন এই সম্পর্কের প্রশ্নে অনেক বেশি মনোযোগ ও সময় দিয়েছেন।
রাশিয়ার ইউক্রেইন যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনা করতে পশ্চিমা বিশ্বের তীব্র চাপ থাকলেও মোদী বলে আসছেন, সংলাপই এই সংঘাত সমাধানের একমাত্র পথ।
এটাকেই ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বলা হচ্ছে, যেখানে মোদী মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে পশ্চিমাদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করেন।
ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার আগ পর্যন্ত এই কৌশল ঠিকঠাকই চলছিল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপড়েন তীব্র হয়েছে এবং দুই দেশই শুল্ক সংক্রান্ত অচলাবস্থা কাটাতে ব্যর্থ হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে পুতিনের সফর মোদীর জন্য আগের চাইতে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে; কারণ এটি ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতারও পরীক্ষা। মোদীকে এখান কূটনৈতিক সুতোর উপর হাঁটতে হবে।
মোদী দেশ-বিদেশের ভারতীয়দের দেখাতে চাইবেন যে, তিনি এখনও পুতিনকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবেই দেখেন এবং ট্রাম্পের চাপের কাছেও নতি স্বীকার করেননি, যে ট্রাম্পকে তিনি ‘সত্যিকারের বন্ধু’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
অবশ্য ইউরোপীয় মিত্রদের চাপও রয়েছে; এ সপ্তাহেই জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতরা যৌথভাবে একটি প্রবন্ধ লিখে রাশিয়ার ইউক্রেইন অবস্থানের সমালোচনা করেছেন।
সে কারণে মোদীকে এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার মাত্রা যেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনা বা ইউরোপের সঙ্গে দিল্লির অংশীদারত্বকে ছাপিয়ে না যায়।

দিল্লিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই) বলছে, “ভারতের চ্যালেঞ্জ হল কৌশলগত ভারসাম্য—ওয়াশিংটনের চাপ ও মস্কোর ওপর নির্ভরতা সামলে স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করা।”
মোদীর জন্য আরেকটি অগ্রাধিকার হবে—ভারত ও রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্ভাবনাকে উন্মোচন করা।
বিশ্লেষকরা প্রায়ই বলে থাকেন, দুই শক্তিশালী মিত্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহু দশকেও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি।
২০২০ সালে যেখানে দুই দেশের বাণিজ্য ছিল মাত্র ৮.১ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৬৮.৭২ বিলিয়ন ডলারে। মূলত রাশিয়ার ছাড়ের তেল কেনার কারণে বাণিজ্যে এ উল্লম্ফন হয়েছে। তাতে লেনদেন ভারসাম্য রাশিয়ার পক্ষে গেছে, যা ঠিক করতে চাইবেন মোদী।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে ভারতীয় কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমিয়েছে। ফলে বাণিজ্য বাড়াতে দিল্লি-মস্কোকে অন্যান্য খাতে নজর দিতে হবে।
সেক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ ক্ষেত্র প্রতিরক্ষা। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১৫ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা আমদানির ৭২ শতাংশই ছিল রাশিয়া থেকে। এটিই মস্কোর কাছ থেকে দিল্লির প্রতিরক্ষা আমদানির সর্বোচ্চ হার। এর আগে ২০১৫-১৯ সালে এ হার কমে আসে ৫৫ শতাংশে এবং ২০২০-২৪ সালে তা আরও কমে ৩৬ শতাশে নামে।

বিবিসি লিখেছে, ভারত প্রতিরক্ষায় বিদেশি উৎস ও দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে রাশিয়া থেকে এ খাতে আমদানি কমেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, ভারতের বহু প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম এখনও রাশিয়ার উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। দেশটির বিমানবাহিনীর ২৯টি স্কোয়াড্রনের অনেকগুলো রাশিয়ার সুখোই-৩০ জেট ব্যবহার করে।
এ বছরের মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যে সংঘাত হয়, তাতে এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মত রুশ অস্ত্রের গুরুত্ব ফের প্রমাণিত হয়। তবে একইসঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষায় কিছু দুর্বল দিকও ধরা পড়ে, যেগুলো দ্রুত কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ভারত আরও উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৫০০, পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট সু-৫৭ কিনতে চায়। পাকিস্তান যে চীনের তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার জে-৩৫ কিনেছে, তা দিল্লির নজর এড়ায়নি এবং সম্ভব হলে সমতুল্য জেট ভারত দ্রুত নিশ্চিত করতে চাইবে।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেইন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ঘাটতির মুখে পড়েছে। এস-৪০০ এর কিছু ইউনিট সরবরাহের সময়সীমা ২০২৬ পর্যন্ত পিছিয়েছে বলেও খবর প্রকাশ পেয়েছে। পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাতে মোদী প্রতিরক্ষা সরবরাহের সময়সীমা নিয়ে কিছু নিশ্চয়তা চাইবেন।
মোদী এও চাইবেন, রাশিয়ার বাজারে ভারতীয় পণ্য উন্মুক্ত হোক, যাতে বড় বাণিজ্য ঘাটতিতে ভারসাম্য আনা যায়।

গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই) বলছে, ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও রাশিয়ার বাজারে ভোক্তাকেন্দ্রিক ও উচ্চ দৃশ্যমান ভারতীয় পণ্য খুব বেশি সুযোগ পাচ্ছে না। যেমন স্মার্টফোন (৭৫.৯ মিলিয়ন ডলার), চিংড়ি (৭৫.৭ মিলিয়ন ডলার), মাংস (৬৩ মিলিয়ন ডলার) এবং পোশাক (২০.৯৪ মিলিয়ন ডলার) বিক্রির হার রাশিয়ার খুচরা বাজার ও ইলেকট্রনিক্স ভ্যালু চেইনে ভারতের পণ্যের দুর্বল অবস্থানই প্রকাশ করে।
মোদীর এখন লক্ষ্য রাশিয়ার বাজার ধরা; বিশেষ করে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মস্কো যখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আবার প্রবেশ করবে, তখন ভারতীয় পণ্য যাতে ব্যাপক পরিসরে সেখানে ঢুকতে পারে।
তিনি তেল ও প্রতিরক্ষার ওপর বাণিজ্য নির্ভরতা কমাতে চাইবেন এবং এমন একটি চুক্তি করতে চাইবেন যা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করবে, আবার পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ রাখবে।
জিটিআরআই বলছে, “পুতিনের এ সফর শীতল যুদ্ধ কূটনীতিতে নস্টালজিক ফেরা নয়। এটি ঝুঁকি, সরবরাহ চেইন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার বিষয়। এর সাধারণ ফল হচ্ছে তেল ও প্রতিরক্ষার নিশ্চিয়তা; আর উচ্চাভিলাষী ফল হচ্ছে আঞ্চলিক অর্থনীতি পুনর্গঠন করা।”