Published : 07 Jul 2026, 06:12 PM
গাজার মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাস তাদের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিচালিত প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ (ডি ফ্যাক্টো সরকার) ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
সোমবার হামাস জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা গাজায় পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত নতুন একটি টেকনোক্র্যাট বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে শাসনভার হস্তান্তর করতে প্রস্তুত।
গত বছর অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর যুদ্ধপরবর্তী গাজার শাসনভার নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার পথে হেঁটেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।
তবে হামাসের এই পদক্ষেপকে ‘লোক দেখানো নাটক’ (স্টান্ট) বলে কটাক্ষ করেছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার এক্সে হামাসের ঘোষণা প্রত্যাখ্যা করে বলেছেন, গোষ্ঠীটি নিজেদের নিরস্ত্রীকরণ এড়াতে টেকনোক্র্যাটিক সরকার গঠনের জন্য পথ সুগম করছে।
তিনি বলেন, “যতদিন হামাস তাদের অস্ত্র সমর্পণ না করবে, ততদিন যে কোনও বেসামরিক সরকার অবশ্যই হামাসের নির্দেশনা অনুযায়ীই কাজ করবে।” ইসরায়েল ট্রাম্পের পরিকল্পনার পুরোপুরি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে হামাসের অস্ত্র সমর্পণের দাবি জানিয়েছে।
ওদিকে, হামাস গাজায় ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। যুদ্ধবিরতি চলার মধ্যেও ইসরায়েলের হামলায় সবশেষ সোমবার গাজায় ৫ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার চিকিৎসাকর্মীর।
তবে ইসরায়েলের ভাষ্য, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে জঙ্গি হামলার হুমকি মোকাবেলা করতেই তারা এমন হামলা চালিয়ে আসছে।
এর মধ্যেই সোমবার হামাসের গাজার শাসনভার ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবেই মনে করছে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
ওইদিন গাজার দেইর আল বালায় আল আকসা হাসপাতাল প্রাঙ্গনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় হামাসের সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয়ের প্রধান ইসমাইল আল-তাওয়াবতা বলেন, “হামাসের প্রশাসনিক প্রধান মোহাম্মদ আল-ফাররা সোমবার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং হামাস ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজার (এনসিএজি) কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রস্তুত।”
এনসিএজি একটি ফিলিস্তিন পরিচালিত টেকনিক্যাল কমিটি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া গাজা যুদ্ধবিরতির অংশ হিসাবে এই কমিটিকে সমর্থন দিয়েছে জাতিসংঘ। এই কমিটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সহজ করতে বর্তমান প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তও জানিয়েছেন মোহাম্মদ আল ফাররা।
ফিলিস্তিনের গাজায় বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য গঠিত ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি) ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনা এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ প্রস্তাবনার অধীনে।
প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) সংস্কার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এর লক্ষ্য গাজায় নিত্যদিনের জনসেবা, বেসামরিক প্রশাসন এবং অভ্যন্তরীন নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা।
এই কমিটিতে গাজার ১৫ জন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট বা পেশাজীবী রয়েছেন এবং এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন ভারপ্রাপ্ত কমিশনার আলি আব্দেল সাদ, যাকে নিরপেক্ষ হিসাবেই দেখা হয়।
তবে ইসরায়েল এখনও কমিটির সদস্যদেরকে গাজায় প্রবেশ করতে দেয়নি। সাময়িকভাবে এই কমিটির সদরদপ্তর রাখা হয়েছে কায়রোয়। এনসিএজি প্রধান আলি সাদ বলেছেন, প্রয়োজনীয় সম্পদ এবং কাজের উপযুক্ত পরিবেশ পেলে যত দ্রুত সম্ভব গাজার শাসনভার নিতে প্রস্তুত তাদের ১৫ সদস্যের কমিটি।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন তদারকি করার জন্য গঠিত এনসিএজি বা গাজা প্রশাসন বিষয়ক জাতীয় কমিটির দ্রুত গাজায় প্রবেশ কামনা করছেন তারা। হামাস সব ধরনের সরকারি দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে প্রস্তুত এবং নতুন প্রশাসনের সফলতা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
তবে হামাসের আরেক কর্মকর্তা মাহমুদ বলেছেন, হামাসের এই পদক্ষেপের অর্থ এই নয় যে, তারা গাজায় তাদের রাজনৈতিক বা সামরিক ভূমিকা পুরোপুরি ছেড়ে দিচ্ছে। বরং তারা মূলত গাজায় সরাসরি বেসামরিক সরকার পরিচালনা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে।