১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন: এসআইআর যেভাবে বদলে দিল ভোটের ফল

ভারতের এই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগেই ৯০ লাখের বেশি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ায় মুখ্যমন্ত্রী মমতার তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন: এসআইআর যেভাবে বদলে দিল ভোটের ফল
ছবি: এনডিটিভি

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 May 2026, 09:06 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:33 PM

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর এ রেকর্ড সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া এবারের বিধানসভা নির্বাচনে একটি বড় ধরনের বিষয় ছিল, যা বদলে দিয়েছে ভোটের ফল। তৃণমূলের দূর্গে গর্জে উঠেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), অবসান ঘটেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনের।

নির্বাচনের আগেই রাজ্যের ৯০ লাখের বেশি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বা নাম সংশোধনের আওতায় আসায় তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্কে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

কয়েকমাস ধরে নির্বাচন কমিশনের শুরু করা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় এই ভোটারদের নাম বাদ যায়।

কমিশনের দাবি ছিল, এই ভোটারদের কেউ মৃত, কেউ অন্যখানে চলে গেছেন, কারও নাম একাধিক স্থানে ভোটার হিসেবে রয়েছে, কাউকে তাদের ঠিকানায় পাওয়া যায়নি; অর্থাৎ, ভুয়া ভোটার।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই বলে আসছিলেন, ভোটে হারাতে না পেরে বিজেপি এবার নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে গোড়ায় কোপ মারতে চাইছে। তিনি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেও বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশন বিজেপি’র হয়ে কাজ করছে।

এসআইআর প্রক্রিয়া ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে এবং তৃণমূল ভোট হারাতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল মমতার।

আর এখন নির্বাচনে হেরে ক্ষমতা হারানোর পর দলটি হিসাব-নিকাশ করে দেখছে, কিভাবে ভোট গণনায় এসআইআর এর প্রভাব বদলে দিয়েছে বিজেপি এবং তৃণমূলের ভোটের ফল।

এসআইআর বনাম ভোট গণনা:

ভোটার তালিকা থেকে বেশি নাম বাদ পড়া এলাকাগুলোতে তৃণমূল কংগ্রেসের পারফরম্যান্স বেশ দুর্বল হয়েছে এবং বিজেপি সেখানে বড় জয় পেয়েছে।

ভারতীয় পত্রিকা এনডিটিভি’র এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যে ১৪৭টি আসনে ২৫,০০০-এর বেশি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল, তার মধ্যে বিজেপি ৯৫টি আসনে জয়লাভ করেছে। তৃণমূল সেখানে মাত্র ৫১টি আসন পেয়েছে। কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ১ টি।

৬৭ আসনের যেখানে ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল, সেখানেও বিজেপি জয় পেয়েছে। বিজেপি পেয়েছে ৪৭ আসন এবং তৃণমূল পেয়েছে ১৯ আসন। আর কংগ্রেস একটি।

বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ ও উত্তর ২৪ পরগনার মতো এলাকা, যেখানে বেশি ভোটারের নাম বাদ গিয়েছিল, সেখানে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ২০২১ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই জেলাগুলোতে বিপুল সংখ্যক ভোটার (মুর্শিদাবাদে ৪ দশমিক ৫৫ লাখের বেশি, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩,২৫,৬৬৬ এবং মালদায় ২৩৯,৩৭৫ জন) বাদ পড়ায় তৃণমূলের আসন কমেছে। তৃণমূল ২০২১ সালের ২০টি আসনের তুলনায় এবার মাত্র ৯টি আসন পেয়েছে।

তাছাড়া, সংখ্যালঘু ভোটও ভাগ হয়ে গেছে এবং হিন্দু ভোটগুলো বিজেপি’র পক্ষে গেছে।

উত্তর ২৪ পরগনাতেও ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার হার বেশি থাকায় সেখানে ৩৩ আসনের মধ্যে তৃণমূলের আসন ২০২১ সালের ২৮টি থেকে কমে এবার মাত্র ৮টিতে নেমে এসেছে।

ওদিকে, মালদায় ১২ আসনের মধ্যে তৃণমূলের ২০২১ সালের ৮ টি আসন থেকে কমে এবার দাঁড়িয়েছে ৬ টিতে।

এসআইআর প্রক্রিয়া:

নির্বচন কমিশন পরিচালিত এসআইআর প্রক্রিয়া এবারের নির্বচনের আগে বিতর্কিত একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনটি ভারতীয় গণতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে কখনও ঘটেনি।

রাজ্যের প্রথম দফার ভোট গ্রহণের আগে দফায় দফায় বাতিল ও ছাঁটাইয়ের সংখ্যা জানানোর পর চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যায়, রেকর্ড ৯১ লাখ মানুষ এবার ভোটদানের অযোগ্য বিবেচিত হয়েছিল।

বাড়ি বাড়ি সার্ভে, নতুন নাম অন্তর্ভুক্তি, ভুল সংশোধন, ভোটার তালিকা থেকে মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারের নাম বাদ দিয়ে এবং ভুয়া বা দ্বৈত ভোটার দূর করে চূড়ান্ত ভোটার তালিকাটি তৈরি করা হয়। লক্ষ্য ছিল, নির্বাচনের আগে নির্ভুল ভোটার তালিকা নিশ্চিত করা।

গত নভেম্বরে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর নোটিশ জারির আগে এ রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লাখের বেশি। ডিসেম্বরে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় দেখা যায়, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ৫৮ লাখ ২০ হাজারের বেশি নাম। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩ লাখ ৬৬ হাজারে।

প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তার (সিইও) কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ৬০ লাখ ৬ হাজারের বেশি ভোটারের তথ্য ‘বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার’ জন্য পাঠানো হয়েছিল।

এর মধ্যে ২৭ লাখ ১৬ হাজার ৩৯৩ জন ভোটারকে বাদ দেওয়ার যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে তালিকা থেকে বাদ পড়া মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯০ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪৫ জনে।=