Published : 26 Dec 2025, 10:59 AM
চাঁদের নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে মহাকাশযানের ‘গোরস্তান’ হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে বলে গবেষকদের মত, যেখানে অকেজো হয়ে যাওয়া লুনার স্যাটেলাইট বা চাঁদ প্রদক্ষিণকারী স্যাটেলাইট ও অন্যান্য নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতি আছড়ে ফেলা হবে।
এ কাজের মূল উদ্দেশ্য সাংস্কৃতিক বা বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থান থেকে দূরে এসব বর্জ্য ফেলা, যাতে চাঁদের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা সুরক্ষিত থাকে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান।
বিভিন্ন দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ও বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানি চাঁদে নিজেদের ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা করছে। ফলে আগামী ২০ বছরে চাঁদের আশপাশে স্যাটেলাইটের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। পাশাপাশি চাঁদের জনমানবহীন ধূসর মাটিতে খনিজ আহরণ ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বসানোর মতো নানা কাজ শুরুর কারণেই সেখানে স্যাটেলাইটের ভিড় বাড়বে।
চাঁদে মানুষের এই বাড়তি কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য পজিশনিং বা অবস্থান নির্ণয়, ন্যাভিগেশন ও যোগাযোগের কাজে একগুচ্ছ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হবে। তবে এসব স্যাটেলাইটের জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে সেগুলোকে চাঁদের মাটিতে আছড়ে ফেলার মতো একটিই পথ খোলা থাকবে অপারেটরদের কাছে, যেখানে এসব মহাকাশযানকে ভেঙে ফেলবে তারা।
এ বছরের ডিসেম্বরে গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত ‘স্পেস-কম’ সভায় বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল পরিচালনার সময় ‘ডারহাম ইউনিভার্সিটি’র সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. ফিওনাগ থমসন বলেছেন, “এসব স্যাটেলাইটকে বাধ্য হয়েই চাঁদের মাটিতে আছড়ে ফেলতে হবে। এ কারণে সম্ভাব্য এক ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হতে পারে চাঁদ।”
চাঁদের উপরিভাগে কেবল স্যাটেলাইটের টুকরা ছড়িয়ে পড়াই শেষ কথা নয়, বরং দলে দলে অকেজো স্যাটেলাইট চাঁদের বুকে আছড়ে পড়লে সেগুলো বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে বলেও উদ্বিগ্ন গবেষকরা। এ পতনের ফলে চাঁদের ভবিষ্যৎ মানববসতি, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন স্থান যেমন নভোচারীদের প্রথম পায়ের ছাপও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিজ্ঞানের জন্য চাঁদের গুরুত্বপূর্ণ আদি ও অস্পর্শ অঞ্চলও ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১.২ মাইল বেগে আছড়ে পড়ার কারণে এসব সংঘর্ষ প্রচণ্ড কম্পন তৈরি করবে। এ কম্পন চাঁদে বিজ্ঞানীদের তৈরি করা সংবেদনশীল বিভিন্ন যন্ত্রপাতির কাজে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
চাঁদের বুকে আছড়ে পড়ার ফলে যে গর্তের তৈরি হবে তা প্রায় দশ মিটারেরও বেশি গভীর হতে পারে। এ ছাড়া এ সংঘর্ষের ফলে প্রচুর পরিমাণে ঘর্ষণকারী তীক্ষ্ণ ধূলিকণা তৈরি হবে, যা টেলিস্কোপের দৃষ্টি ঝাপসা করে দিতে ও অন্যান্য টুলের ক্ষতি করতে পারে।
‘বার্কবেক ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন’-এর অধ্যাপক ইয়ান ক্রফোর্ড বলেছেন, “চাঁদের আয়তনের কথা চিন্তা করলে বিষয়টি এখনই বড় কোনো দুশ্চিন্তার নয়। তবে চাঁদে স্যাটেলাইটের সংখ্যা যত বাড়বে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ কোনো জায়গায় আছড়ে পড়ার ঝুঁকিও ততটাই বেড়ে যাবে। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য সত্যিই সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার প্রয়োজন।”
পৃথিবীর আশপাশে ঘুরতে থাকা অকেজো বিভিন্ন স্যাটেলাইট ধ্বংসের জন্য অপারেটররা সাধারণত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ব্যবহার করেন। প্রতি বছর হাজার হাজার অকেজো স্যাটেলাইট বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের সময় ঘর্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তবে চাঁদের কোনো বায়ুমণ্ডল নেই। ফলে লুনার স্যাটেলাইট অপারেটরদের জন্য অন্য কোনো সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
এসব সমাধান খুব দ্রুতই প্রয়োজন। কারণ আগামী দুই দশকের মধ্যে চাঁদে যাওয়ার জন্য চারশরও বেশি মিশনের পরিকল্পনা এরইমধ্যে হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে নাসার নেতৃত্বে তৈরি হতে যাওয়া ‘লুনার গেটওয়ে’ মিশন। এটি মূলত একটি মহাকাশ স্টেশন, যা চাঁদকে প্রদক্ষিণ করবে।
এ ছাড়াও চাঁদের পৃষ্ঠদেশে থাকবে ‘আর্টেমিস বেস ক্যাম্প’। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া মিলেও চাঁদে দ্বিতীয় আরেকটি ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা করছে।
আগামী বছর ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা বা ইএসএ ‘লুনার পাথফাইন্ডার’ নামে চাঁদে এক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করবে। সংস্থাটির ‘মুনলাইট’ নামের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের প্রাথমিক এক পরীক্ষামূলক ধাপ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কথা।
এ লুনার পাথফাইন্ডার স্যাটেলাইটটির আট বছরের মেয়াদ শেষ হলে সেটিকে কীভাবে নিরাপদ উপায়ে ধ্বংস বা অপসারণ করা হবে, তা নিয়েও বর্তমানে কাজ চলছে।
লুনার স্যাটেলাইট অপারেটরদের সামনে প্রধানত তিনটি পথ খোলা আছে। প্রথমত, শক্তিশালী এক ইঞ্জিন ও পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকলে স্যাটেলাইটটিকে চাঁদের আকর্ষণ থেকে সরিয়ে সূর্যের কক্ষপথে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব। তবে এমনটি অনেক ব্যয়বহুল।
দ্বিতীয়ত, এটিকে চাঁদের এমন কোনো দূরবর্তী কক্ষপথে সরিয়ে রাখা যেতে পারে. যেখানে সচরাচর কেউ যায় না। তবে চাঁদের অমসৃণ মহাকর্ষীয় টানের কারণে এটিও বেশ কঠিন কাজ। সবশেষে, স্যাটেলাইটটিকে সরাসরি চাঁদের মাটিতে আছড়ে ফেলা যায়। তবে এর জন্য অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও নিখুঁত পরিকল্পনার প্রয়োজন।
‘ইউকে স্পেস এজেন্সি’র রেগুলেশন অফিসের প্রধান সারাহ বয়্যাল বলেছেন, বর্তমানে জাতিসংঘের ‘অ্যাকশন টিম অন লুনার অ্যাক্টিভিটিজ কনসালটেশন’ ও ‘ইন্টার-এজেন্সি স্পেস ডেব্রি কোঅর্ডিনেশন কমিটি’ বা আইএডিসি চাঁদের বিভিন্ন স্যাটেলাইট ধ্বংস বা অপসারণের সবচেয়ে সেরা উপায় নির্ধারণে কাজ করছে। বর্তমানে আইএডিসি’র সভাপতিত্ব করছে যুক্তরাজ্য।
মহাকাশযানের ‘গােরস্তান’ তৈরির বিষয়টি এখন সবচেয়ে শক্তিশালী সমাধান হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এর আওতায় অপারেটরদের বাধ্য করা হবে তারা যেন পুরানো বিভিন্ন স্যাটেলাইট হয় নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় আছড়ে ফেলে বা এমন সব বিশাল গর্তে ফেলে দেয় যেখানে সংঘর্ষের ফলে ওড়া ধুলোবালি ওই গর্তের ভেতরেই আটকে থাকবে।
এ পদ্ধতিটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে ‘ইউকে স্পেস এজেন্সি’ ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘আর্টেমিস অ্যাকর্ডস’ বা ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের নীতিমালা স্বাক্ষরকারী বিভিন্ন দেশ।