Published : 10 Jun 2026, 10:21 AM
১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড বাজারমূল্য নিয়ে শেয়ার বাজারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স। আর এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ার পেছনে রয়েছেন একজন নারী।
দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে নেপথ্যে থেকে মাস্কের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া ও পুরো কোম্পানির বাণিজ্যিক ভিত গড়ে তোলা সেই নারী এবার এসেছেন পাদপ্রদীপের আলোয়।
শুক্রবার স্পেসএক্স শেয়ার বাজারে তাদের আইপিও ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মাধ্যমে রকেট বিজ্ঞান, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও মহাকাশে মানুষের পৌঁছানোর সীমানাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার পেছনে মাস্কের দুই দশকের যে উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা তা নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
এ পুরো যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যক্তি সবসময় নেপথ্যে থেকে কাজ পরিচালনা করেছেন তিনি হলেন কোম্পানির প্রেসিডেন্ট গুয়েন শটওয়েল।
দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে শটওয়েল তার প্রকৌশলী দক্ষতা ও বিচক্ষণ ব্যবসায়িক বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে স্পেসএক্সের ভিত গড়ে তুলতে ও এর বাণিজ্যিক প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
সহকর্মীরা বলছেন, এ দীর্ঘ পথচলায় ৬২ বছর বয়সী শটওয়েল বিরল ও কঠিন এক দক্ষতা অর্জন করেছেন, আর তা হচ্ছে স্বয়ং মাস্ককে কার্যকরভাবে সামলানো।
নিজের এ কাজের ধরনটিকে অবশ্য তিনি খুবই সহজভাবে দেখেন। এ বছরের শুরুতে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শটওয়েল বলেছিলেন, তার মূল লক্ষ্য ‘ইলনের জন্য সহায়ক হওয়া’ ও ‘কোম্পানির অগ্রগতিতে অবদান রাখা’।
তবে স্পেসএক্সের সাবেক কর্মকর্তা ও মহাকাশ শিল্প পর্যবেক্ষকদের চোখে শটওয়েল এ খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। নিজেকে তিনি বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর নারী নির্বাহী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ।
শটওয়েলকে কোম্পানিতে যুক্ত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন শুরুর দিকের স্পেসএক্সের নির্বাহী জিম ক্যানট্রেল। তিনি বলেছেন, “ইলন কী চেয়েছিলেন এবং বাস্তবে কী করা সম্ভব এ দুইয়ের মধ্যকার সেতু ছিলেন শটওয়েল।”
এ দায়িত্বে তিনি কর্পোরেট জগতের সেই পরিচিত ও বিশ্বস্ত সহকারীর এক অনন্য প্রতীক যিনি একজন স্বপ্নদর্শী প্রতিষ্ঠাতার বড় পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। ঠিক যেভাবে অ্যাপলে টিম কুক বা মেটা’তে শেরিল স্যান্ডবার্গ তাদের প্রতিষ্ঠাতাদের পাশে থেকে কাজ করেছেন, স্পেসএক্সে মাস্কের পাশে শটওয়েলের ভূমিকাও তেমনই।
২০১৮ সালের এক টেড কনফারেন্সে শটওয়েল বলেছিলেন, “মাস্ক যখন কোনো কথা বলেন, তখন আপনাকে একটু থামতে হবে; হুট করে মুখ ফসকে ‘আরে, এটা তো অসম্ভব!’ বলে ফেলা যাবে না। আপনাকে মুখ বন্ধ রেখে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে এবং তা সফল করার পথ খুঁজে বের করতে হবে।
“আমি সবসময়ই মনে করেছি, আমার কাজই হচ্ছে এসব ভাবনাকে লুফে নিয়ে সেগুলোকে কোম্পানির লক্ষ্যে পরিণত করা, যাতে তা বাস্তবে অর্জন করা সম্ভব হয়।”
সহকর্মীরা বলেছেন, শটওয়েল একদিকে যেমন কাজের ক্ষেত্রে কঠোর শৃঙ্খলা ধরে রাখতেন তেমনই কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো কঠিন বিভিন্ন সিদ্ধান্তও নিতেন দক্ষতার সঙ্গে। আর এসবকিছুর মধ্যেও তিনি দলের সবার আনুগত্য ও ঐক্য ধরে রাখতে পারতেন।
স্পেসএক্সের একজন সাবেক কর্মী বলেছেন, তিনি কোনো কঠোর বা অপ্রিয় প্রতিক্রিয়াও এমনভাবে দিতেন, যা শুনলে মনে হয় ‘যেন মধু ঝরছে’।
শেয়ার বাজারে যাওয়ার পর এ সূক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিচালনার বিষয়টি আরও বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে। কারণ স্পেসএক্স এখন আরও বেশি চ্যালেন্জিং সব লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করছে, যার ওপর ভরসা করে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটির বাজারমূল্য ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেছেন।

আইপিও’র এ চূড়ান্ত মুহূর্তে মাস্ক তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ ক্রমাগত স্পেসএক্সের নতুন ও বড় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে পোস্ট করে যাচ্ছেন। যার পরিধি এখন কেবল রকেটেই সীমিত নেই, বরং এআই ও মহাকাশভিত্তিক ডেটাসেন্টার পর্যন্ত বিস্তৃত।
এর বিপরীতে শটওয়েলের মনোযোগ অবশ্য এখনও বেশ বাস্তবসম্মত ও প্রচলিত কাজের দিকেই রয়েছে। যেমন বার্সেলোনায় টেলিকম সম্মেলনে ‘স্টারলিংক’-এর প্রচার চালানো, ভারতে সেবাটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদনের বিষয়ে সেখানকার নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা এবং এআইয়ের ক্রমাগত জ্বালানি চাহিদার প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করা।
‘নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি’ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা শটওয়েল ক্যালিফোর্নিয়ার ‘অ্যারোস্পেস কর্পোরেশন’-এ তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, যেখানে তিনি সরকারি ও সামরিক মহাকাশ কর্মসূচির সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রযুক্তির সমন্বয় সাধনের কাজ করতেন।
পরবর্তীতে স্পেসএক্স প্রতিষ্ঠার বছর, অর্থাৎ ২০০২ সালে তিনি কোম্পানিটিতে যোগ দেন এবং খুব দ্রুতই এর বাণিজ্যিক ইঞ্জিনে পরিণত হন। মহাকাশ খাতে মাস্ক যখন একরকম অপরিচিতই ছিলেন তখন এ শিল্পে শটওয়েলের বিস্তৃত চেনা-জানা ও সুসম্পর্কই বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, ঠিকাদার এবং প্রথম দিকের গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগের দরজা খুলে দিয়েছিল।
স্পেসএক্সের রকেট সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছানোর আগেই তিনি বেশ কিছু রকেট উৎক্ষেপণের চুক্তি নিশ্চিত করেছিলেন, যা কোম্পানির গ্রহণযোগ্যতা পেতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সবচেয়ে বড় সাফল্যটি আসে ২০০৮ সালে। এ সময় স্পেসএক্স আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএসে রসদ সরবরাহের জন্য নাসার সঙ্গে ১৬০ কোটি ডলারের বড় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
ফ্যালকন ১ রকেটের উপর্যুপরি ব্যর্থতার কারণে কোম্পানিটি যখন তীব্র অর্থসংকটে ভুগছিল তখন এ চুক্তিটি স্পেসএক্সকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। এর পরপরই মাস্ক তাকে কোম্পানির প্রেসিডেন্ট ও চিফ অপারেটিং অফিসার হিসাবে পদোন্নতি দিয়েছেন।
স্পেসএক্সের অভাবনীয় সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে তার পারিশ্রমিকও আকাশচুম্বী হয়েছে।
আইপিও’র নথি অনুসারে, স্টক অ্যাওয়ার্ড বা শেয়ারের অংশীদারিত্ব মিলিয়ে গেল বছর তার মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারে।
এর আগে ২০১০ সালে, স্পেসএক্স স্যাটেলাইট অপারেটর ‘ইরিডিয়াম’-এর সঙ্গে ঐতিহাসিক এক চুক্তি করেছিল, যা ছিল সেই সময় পর্যন্ত কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানির পাওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মহাকাশ উৎক্ষেপণ চুক্তি।
প্রত্যন্ত এক পরীক্ষামূলক কেন্দ্রে বসে এ খবরটি শোনার মুহূর্তটি স্মরণ করে স্পেসএক্সের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী টম মুলার বলেছেন, “ওই মুহূর্তটি আমরা সবাই মিলে শ্যাম্পেন পান করে উদযাপন করেছিলাম।”
সাবেক কর্মীরা বলেছেন, করপোরেট জগতের শীর্ষ নির্বাহীদের চটকদার বা জাঁকজমকপূর্ণ লাইফস্টাইলের বিপরীতে শটওয়েলকে প্রায়ই গাঢ় ব্লেজার ও জিন্স পরা সাধারণ পোশাকে দেখা যেত, যা একজন প্রকৌশলীর সহজাত ও পরিমিত আত্মবিশ্বাসকেই ফুটিয়ে তোলে।
তাদেরই একজন শটওয়েলকে বর্ণনা করেছেন পুরো কোম্পানিকে একসঙ্গে ধরে রাখার ‘মূল চালিকাশক্তি বা আঠা’ হিসাবে।
সাবেক সহকর্মীরা আরও স্মরণ করে বলেছেন, শটওয়েলের নিয়মিত অভ্যাস ছিল মিশন কন্ট্রোল রুম বা কারখানার প্রোডাকশন ফ্লোরে চলে যাওয়া এবং সেখানে গিয়ে নভোচারীদের প্রশিক্ষণ সিমুলেশন থেকে শুরু করে উৎপাদন প্রক্রিয়া সব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও খুঁটিনাটি প্রশ্ন করা।
স্পেসএক্সের আগামী দিনের নতুন ধাপটি শটওয়েলের সবচেয়ে বড় শক্তি, অর্থাৎ ‘পরিকল্পনার বাস্তবায়ন’-এর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করবে। শটওয়েল যে ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কটিকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে সাহায্য করেছিলেন তা এখন কোম্পানির আয়ের সিংহভাগ জোগান দিচ্ছে।
এ আয় থেকেই স্পেসএক্স এআই ও মহাকাশে ডেটাসেন্টার বসানো বা চাঁদে শহর গড়ার মতো দূরহ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন প্রজেক্টের বড় খরচ মেটাচ্ছে।
চাঁদে আবারও নভোচারী পাঠানোর জন্য নাসার ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচিতে সহায়তা করা এবং বিশ্বজুড়ে স্টারলিংকের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দেওয়ার মতো বড় সব লক্ষ্য এখন কোম্পানিটির সামনে রয়েছে।
রকেট উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে শটওয়েল যে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতা ধরে রেখেছিলেন তা এত বড় ও বিস্তৃত সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও তিনি একইভাবে ধরে রাখতে পারেন কি না আসন্ন সময়ে সেটিই হবে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।