Published : 10 Feb 2026, 11:56 AM
বিশালাকার এক বিস্ময়কর ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর পর্যবেক্ষণ করছেন বিজ্ঞানীরা, যা তারা গিলে খাওয়ার কয়েক বছর পরও ঢেকুর তুলছে বলে দাবি তাদের।
নিউ মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে পৃথিবীর মিল্কিওয়ে ছায়াপথ থেকে অনেক দূরের এক ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা এ ব্ল্যাক হোলের খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
রয়টার্স লিখেছে, ব্ল্যাক হোলটি এর খুব কাছে চলে আসা এক তারাকে ছিঁড়ে খেয়েছে এবং এরপর এখন অবিরতভাবে সেখান থেকে দ্রুতগতির মহাজাগতিক বস্তুর স্রোত বাইরে বের করে দিচ্ছে।
এ মহাজাগতিক ঘটনার সবচেয়ে অস্বাভাবিক দিকটি হচ্ছে তারাটিকে গিলে ফেলার পর ব্ল্যাক হোলটির ‘বদহজম’ বা প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা ও দীর্ঘস্থায়িত্ব।
ব্ল্যাক হোলের মহাকর্ষীয় শক্তির টানে তারাটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গ্যাসে পরিণত হওয়ার প্রায় দুই বছর পর পর্যন্ত এর অবশিষ্টাংশ মহাকাশে ছিটকে বেরতে শুরু করেনি। তবে বিস্ময়করভাবে এ বস্তুর স্রোতটি গত ছয় বছর ধরে মহাকাশে তীব্র বেগে ছুটছে, যা আগে কখনও এত দীর্ঘ সময় ধরে হতে দেখা যায়নি।
মহাবিশ্বে এ পর্যন্ত যত শক্তিশালী ঘটনা ধরা পড়েছে তার মধ্যে এটি অন্যতম এবং এর তীব্রতা কেবল বেড়েই চলেছে।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘অরিগন ইউনিভার্সিটি’র জ্যোতির্পদার্থবিদ ইভেত্তে সেন্ডেস বলেছেন, “এ উৎস থেকে নির্গত আলোর তীব্রতা যেভাবে বাড়ছে তা আগে কখনও দেখা যায়নি, যা প্রথম আবিষ্কারের সময়ের তুলনায় এখন প্রায় ৫০ গুণ উজ্জ্বল। রেডিও তরঙ্গের ক্ষেত্রে এমনটি বিস্ময়কর রকমের উজ্জ্বল। বছরের পর বছর ধরে এমনটি চলছে এবং থামার কোনো লক্ষণ নেই, যা সত্যিই অস্বাভাবিক।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’-এ।
ব্ল্যাক হোল অত্যন্ত ঘন বস্তু, যার মহাকর্ষ বল এতটাই শক্তিশালী যে, সেখান থেকে আলো পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে পারে না। এ ব্ল্যাক হোলটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৬ কোটি ৫০ লাখ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এক আলোকবর্ষ মানে আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, যা প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।
ব্ল্যাক হোলটি সূর্যের তুলনায় প্রায় ৫০ লাখ গুণ ভারী, যা পৃথিবীর ছায়াপথ মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে থাকা বিশাল ব্ল্যাক হোলটির প্রায় সমান, যার ভর সূর্যের প্রায় ৪০ লাখ গুণ।
দুর্ভাগা তারাটি ছিল এক ‘লাল বামন’ প্রজাতির তারা, যার ভর ছিল আমাদের সূর্যের ভরের কেবল দশ ভাগের এক ভাগ।
ব্ল্যাক হোলের মহাকর্ষীয় টানে আসা বস্তুর জন্য ‘ইভেন্ট হরাইজন’ বা ঘটনা দিগন্ত, যা এমন এক সীমানা যেখান থেকে কোনো বস্তুর আর ফেরার পথ থাকে না। যখন কোনো তারা ব্ল্যাক হোলের টানে এভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তখন তাকে বলে ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’। কারণ, এ মহাজাগতিক ঘটনাটি পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার জন্য দায়ী মহাকর্ষীয় শক্তির মতোই এক ধরনের শক্তির প্রভাবে ঘটে থাকে।
এ গবেষণার অন্যতম লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনা’র জ্যোতির্পদার্থবিদ কেট আলেকজান্ডার বলেছেন, “যে কোনো বস্তু যখন ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনের খুব কাছে চলে আসে তখন তা মহাকর্ষীয় শক্তির টানে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় বস্তুটি লম্বা সুতার মতো প্রসারিত হয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘স্প্যাগেটিফিকেশন’।
“তারাটি ছিন্নভিন্ন হওয়ার পর এর কিছু গ্যাস ব্ল্যাক হোলের দিকে পড়ার সময় প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ব্ল্যাক হোলটি তারাটিকে গিলে খেতে শুরু করে। আমরা টেলিস্কোপে যে উজ্জ্বল রেডিও তরঙ্গ দেখছি তা মূলত তারাটির সেই অংশ থেকে আসছে, যা ব্ল্যাক হোলের সীমানার খুব কাছে গিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত গিলে ফেলার আগেই ছিটকে বেরিয়ে এসেছে এর কিছু অংশ। বিষয়টি অনেকটা খামখেয়ালি শিশুর মতো, যে তার খাবার চিবিয়ে গিলতে না পেরে সজোরে মুখ থেকে বের করে দেয়।”
তবে গবেষকরা এখনও নিশ্চিত নন, কেন এ ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ এবং এর থেকে নির্গত জেট বা ‘রিলেটিভিস্টিক জেট’ এতটা বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক সেন্ডেস বলেছেন, “আসলে কী কারণে এ রিলেটিভিস্টিক জেট তৈরি হয়েছে তা আমরা এখনও জানি না। বর্তমানে গবেষণার এক সক্রিয় বিষয় এটি। সম্ভবত ব্ল্যাক হোলের আশপাশের চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবেই বিষয়টি ছিল অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা। কারণ, তা না হলে আমরা এমন দৃশ্য আরও ঘনঘন দেখতে পেতাম।”
এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে এ জেটের তীব্রতা কতদিন ধরে বাড়তে থাকবে? গবেষকদের ধারণা, এ বছর বা আগামী বছরের শেষদিকে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
কেট আলেকজান্ডার বলেছেন, “সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানোর পর ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে শুরু করবে। ফলে সম্ভবত আমরা আগামী এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে এ ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে পারব।”