Published : 18 Jul 2026, 02:19 PM
মহাবিশ্বে ভিনগ্রহের প্রাণের অনুসন্ধানের যাত্রায় এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রথম সৌরজগতের বাইরে পাথুরে ও সম্ভাব্য বাসযোগ্য এক গ্রহের আশপাশে বায়ুমণ্ডলের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন তারা।
এ আবিষ্কার থেকে ইঙ্গিত মেলে, পৃথিবীর মতোই মহাবিশ্বে এমন আরও বহু গ্রহ থাকতে পারে, যা ভিনগ্রহের প্রাণী বা এলিয়েনদের ধারণ করতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
এ গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী কলিন চেরুবিন বলেছেন, “আমরা যেভাবে জীবনকে চিনি, কোনো গ্রহে তেমন প্রাণের বিকাশ ঘটার জন্য বায়ুমণ্ডল থাকা জরুরি। অন্য কোনো তারার বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থিত কোনো পাথুরে গ্রহে বায়ুমণ্ডল খুঁজে পাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম।”
‘এলএইচএস ১১৪০ বি’ নামের গ্রহটি প্রায় এক দশক আগে আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং গ্রহটি যে গঠনগত দিক থেকে অনেকটা পৃথিবীর মতো তা আগেই জানা ছিল।
গ্রহটি আকারে পৃথিবীর চেয়ে বড় হলেও এর বিভিন্ন উপাদান প্রায় একই রকম। গ্রহটি এর তারার এমন এক ‘বাসযোগ্য অঞ্চলে’ অবস্থান করছে, যা খুব বেশি গরমও নয় আবার খুব বেশি ঠান্ডাও নয়। বিজ্ঞানীদের মতে, যা তরল পানি ও প্রাণের বেঁচে থাকার জন্য আদর্শ।
তবে নতুন গবেষণাটি নিশ্চিত করেছে, গ্রহটির নিজস্ব বায়ুমণ্ডলও রয়েছে, যা কোনো গ্রহকে বাসযোগ্য করে তোলার অন্যতম প্রধান শর্ত।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন না, পৃথিবীর মতো অন্য কোনো গ্রহের অস্তিত্ব আদৌ এই মহাবিশ্বে আছে কি না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সূক্ষ্ম বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এমন গ্রহ মহাবিশ্বে বেশ সাধারণ ও এদের মধ্যে কিছু গ্রহ নিজ নিজ তারার বাসযোগ্য অঞ্চলেই রয়েছে।
এতদিন পর্যন্ত অজানা ছিল যে, সেসব গ্রহের নিজস্ব কোনো বায়ুমণ্ডল আছে কি না। নতুন এ গবেষণায় প্রমাণ মিলল, এর একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডল রয়েছে এবং এর ফলে মহাবিশ্বে এমন আরও অসংখ্য গ্রহ থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে গেল।
বিজ্ঞানীরা প্রথমে একটি তাত্ত্বিক মডেল দিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন, যেখানে ইঙ্গিত মিলেছিল, ‘এলএইচএস ১১৪০ বি’ নামের গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগ হিলিয়াম গ্যাস থাকতে পারে। সেই হিলিয়াম গ্যাস ধীরে ধীরে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য অনুসন্ধানের বড় সূত্র তৈরি করে দিয়েছে।
এ ধারণার সত্যতা যাচাই করতে গবেষকরা চিলিতে অবস্থিত ‘ম্যাজেলান অবজারভেটরি’র ‘ওয়ার্ম ইনফ্রারেড ইশেল’ নামের স্পেক্ট্রোগ্রাফ ব্যবহার করে গ্রহটি পর্যবেক্ষণ করেছেন।
এর মাধ্যমে তারা গ্রহটি থেকে হিলিয়াম গ্যাসের নিঃসরণ স্পষ্ট দেখতে পেয়েছেন, এর থেকে প্রমাণ মেলে, গ্রহটিতে সত্যিই বায়ুমণ্ডল রয়েছে।
এ গবেষণার অন্যতম সদস্য ও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি’র শ্রেয়াস ভিসাপ্রাগাদা বলেছেন, “বাসযোগ্য অঞ্চলের কোনো এক্সোপ্ল্যানেট বা বহির্গ্রহে বায়ুমণ্ডল থাকার এটাই স্পষ্ট প্রমাণ। আমরা যখন ট্রানজিট স্পেক্ট্রা বা আলোর বর্ণালী দেখছিলাম এবং ধীরে ধীরে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝতে পারছিলাম তখন আমাদের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো ছিল না।”
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর মতো ছোট ও পাথুরে গ্রহগুলোতে বায়ুমণ্ডলের খোঁজ করে এলেও বেশিরভাগ সময়ই তাদের হতাশ হতে হয়েছে।
এবারের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। সাধারণত কোনো গ্রহ এর তারার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আলোর সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখে নিচের বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতি খোঁজার চেষ্টা করা হয়।
এবার তারা টেলিস্কোপ ব্যবহার করে গ্রহটির উপরিভাগের বায়ুমণ্ডল থেকে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়া হিলিয়ামের সন্ধান করেছেন।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, গ্রহটি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা চালানো হবে, যাতে এর বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা মেলে। এ কাজে নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপও ব্যবহৃত হবে।
এক দশক আগে এ গ্রহটি প্রথম আবিষ্কার করা জেসন ডিটম্যান বলেছেন, “যেহেতু সেখানে হিলিয়াম আছে ও তা নির্গত হচ্ছে ফলে এখন মূল প্রশ্ন এটা কি কেবলই একটি উষর পাথুরে গ্রহ, যা মাঝেমেধ্যে কিছু গ্যাস তৈরি করে ও তা সঙ্গে সঙ্গে মহাকাশে হারিয়ে যায়? নাকি পৃথিবীর মতো এর স্থায়ী বায়ুমণ্ডল রয়েছে, যা থেকে প্রতিনিয়ত এমনটা ঘটছে?
“আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া তথ্য পানির সন্ধান করবে। গ্রহটির যদি বায়ুমণ্ডলে পানি পাওয়া যায়, তবে ধরে নেওয়া হবে এটি একটি স্থায়ী বায়ুমণ্ডল, যা টিকে থাকবে।”
‘হিলিয়াম এস্কেপিং ফ্রম দ্য অ্যাটমোসফিয়ার অফ এ নিয়ারবাই রকি এক্সোপ্ল্যানেট অরবিটিং ইন এ হ্যাবিটেবল জোন’ শিরোনামে গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ।