Published : 19 Jul 2026, 11:55 AM
মানুষের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে– এমন অভিনব এক ড্রোন উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা।
‘ফ্যান্টম টুইস্ট’ নামের ড্রোনটি প্রতি সেকেন্ডে ২৫ বার পর্যন্ত ঘুরতে বা স্পিন করতে পারে। এ ঘূর্ণন গতি এতটাই তীব্র যে সাধারণ মানুষের পক্ষে খালি চোখে ড্রোনটিকে দেখা অসম্ভব বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
দীর্ঘদিন ধরেই গবেষকেরা এমন ড্রোন ও রোবট তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা সহজেই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে সামরিক যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে।
আগের বিভিন্ন প্রচেষ্টার বেশিরভাগই ছিল ড্রোনকে এর আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ওপর ভিত্তি করে, যেখানে স্বচ্ছ উপাদান ব্যবহার বা আলোর গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কৌশল অবলম্বন করা হত।
নতুন ড্রোনে সম্পূর্ণ ভিন্নটি পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন গবেষকরা, যেখানে ড্রোনটি আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাওয়ার জন্য কোনো স্বচ্ছ উপাদান ব্যবহার না করে নিজের ঘূর্ণন গতিকে কাজে লাগায়।
তীব্র গতিতে ঘোরার কারণে ড্রোনটি আবছা অবয়ব বা ধোঁয়ায় পরিণত হয়, যা ব্যাকগ্রাউন্ড বা আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে নিমিষেই মিলে যায়।
এ গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া ‘নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি’র বিজ্ঞানী মাইকেল রুবেনস্টাইন বলেছেন, “ড্রোন লুকিয়ে রাখার বেশিরভাগ প্রচেষ্টাই সেটিকে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের মতো রূপ দেওয়ার ওপর ফোকাস করে।
“তবে আমরা চিন্তা করলাম, মানুষের গতি অনুভবের সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে ড্রোনটিকে অন্যভাবে ডিজাইন করা যায় কি না। অনবরত ঘূর্ণন গতির মাধ্যমে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার এ ধারণাটি নিয়ে এর আগে খুব কম মানুষই কাজ করেছেন।”
গবেষকরা বলছেন, এ উদ্ভাবনটি এমন ড্রোন তৈরিতে সাহায্য করবে, যা কোনো ধরনের চাক্ষুষ উপস্থিতি ছাড়াই বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ বা পরিবেশগত নজরদারির কাজ নিখুঁতভাবে করতে পারবে।
সামরিক ব্যবহার ও বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণের মতো ক্ষেত্রগুলোতে ড্রোনের দৃশ্যমানতা বড় সমস্যা। কারণ, যখন কোনো পশু বা মানুষ বুঝতে পারে যে তাদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে, তখন তাদের আচরণ বদলে যায়। ফলে নজরদারির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
নতুন ড্রোনটি তৈরির জন্য বিজ্ঞানীদের কম্পিউটেশনাল মডেল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করতে হয়েছে, যার মাধ্যমে ড্রোনের এমন কিছু সংস্করণ তৈরি ও পরীক্ষা করা সম্ভব, যা আকাশে স্থিতিশীলভাবে ওড়ার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
পরবর্তীতে গবেষকরা সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ড্রোনগুলোকে ১০০টি বাস্তবসম্মত ব্যাকগ্রাউন্ডের সামনে ওড়ানোর সিমুলেশন বা কৃত্রিম পরীক্ষা চালান।
মানুষের দৃষ্টিশক্তির আদলে তৈরি এক বিশেষ মডেলের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে, বাস্তব জগতেও এসব ড্রোন আসলেই অদৃশ্য হয়ে যাবে কিনা।
সবচেয়ে কার্যকর সিমুলেটেড ড্রোনটি বেছে নেওয়ার পর বিজ্ঞানীরা সেটির বাস্তব রূপ তৈরি করেছেন। তারা বলছেন, ড্রোনটি আসলেই খালি চোখে প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
অধ্যাপক রুবেনস্টাইনের সহকর্মী ও কম্পিউটার ভিশন বিশেষজ্ঞ এমা আলেকজান্ডার বলেছেন, “মানুষের চোখ যে কোনো দৃশ্য বা সংকেত গ্রহণ করতে কিছুটা সময় নেয়, যা অনেকটা ক্যামেরার এক্সপোজার টাইমের মতো। যখন কোনো বস্তু দ্রুত গতিতে ঘোরে তখন আমাদের চোখ সেটিকে একটি আবছা ধোঁয়া হিসেবে দেখে, যার ফলে তার সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলো আর বোঝা যায় না।
“যেহেতু নতুন ড্রোনটির বেশিরভাগ অংশই স্বচ্ছ ফলে এর অল্প কিছু অস্বচ্ছ বা দৃশ্যমান অংশ পারিপার্শ্বিক ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায়, যা দেখে কেবল হালকা কুয়াশা বা আবছা ধোঁয়া মনে হয়।”
নতুন ড্রোনটিতে এখনও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ওড়ার সময় এটি শব্দ তৈরি করে। গবেষকরা এখন এর নতুন সংস্করণ তৈরির আশা করছেন, যেখানে শব্দ কমানোর জন্য আরও শান্ত প্রপালশন সিস্টেম এবং সামান্য দৃশ্যমান অংশগুলোকে পুরোপুরি দূর করতে আরও উন্নত স্বচ্ছ উপাদান ব্যবহৃত হবে।