Published : 12 Jun 2026, 05:08 PM
দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের তলদেশে এ যাবৎকালের সবচেয়ে প্রাচীন ও গভীরতম তিমির সমাধিক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা।
সমুদ্রের প্রায় সাত কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত এ রহস্যময় সমাধিক্ষেত্রে প্রায় ৫০ লাখ বছরের পুরানো জীবাশ্মের পাশাপাশি পচনশীল তিমির কঙ্কালকে কেন্দ্র করে বড় ও বৈচিত্র্যময় প্রাণীকুলের সন্ধান মিলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
মৃত তিমি সমুদ্রের তলদেশে তলিয়ে গেলে বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘হোয়েল ফল’। এমন ঘটনা সচরাচর ঘটলেও এর আগে পাওয়া বেশিরভাগ মৃত তিমিই সমুদ্রের চার কিলোমিটারেরও কম গভীরতায় মিলেছিল।
তবে নতুন খোঁজ পাওয়া তিমির সমাধিক্ষেত্রটি সমুদ্রের সাত কিলোমিটারেরও বেশি গভীরতায় অবস্থিত, যা সমুদ্রের তলদেশে শত শত মাইল জুড়ে বিস্তৃত। এখানে থাকা পচনশীল বিভিন্ন তিমির কঙ্কালকে কেন্দ্র করে বড় পরিসরে প্রাণের সমারোহ বা নতুন জীবনব্যবস্থা গড়ে উঠতে দেখেছেন গবেষকরা।
এ গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ পিসা’র ড. জিওভানি বিয়ানুচ্চি বলেছেন, “আমাদের এ আবিষ্কার প্রমাণ করেছে, সমুদ্রের এ চরম ভাবাপন্ন ও অনাবিষ্কৃত পরিবেশগুলো এমন সব প্রজাতি ও বাস্তুতন্ত্রের আবাসস্থল, যা বিজ্ঞানের কাছে এখনও সম্পূর্ণ অজানা। পৃথিবীর প্রকৃত জীববৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্রে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি।
“গবেষণায় আরও ইঙ্গিত মিলেছে, আলোহীন ও প্রচণ্ড চাপের মতো চরম পরিবেশেও জীবন কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে ও বিকশিত হতে পারে। সেইসঙ্গে গবেষণাটি রহস্যময় স্বভাবের চঞ্চুওয়ালা তিমির মতো প্রাণীদের সম্পর্কে অনন্য কিছু তথ্য দিয়েছে।”
এ গবেষণার ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত এক নিবন্ধে আমেরিকার ‘ক্যালভার্ট মেরিন মিউজিয়াম’-এর স্টিফেন জে গডফ্রি এ সমাধিক্ষেত্রটিকে ‘অনন্য এক আবিষ্কার’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তার ভাষায়, স্থানটি থেকে ভবিষ্যতে আরও অনেক রোমাঞ্চকর তথ্য বা সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
“গবেষণাটি আমাকে যেন, কোনো এক মহাকাব্যিক সিনেমা সিরিজের প্রথম পর্বের ট্রেইলারের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।”
দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের খাড়াই ও খাঁজকাটা অঞ্চল ‘ডায়াম্যান্টিনা ফ্র্যাকচার জোন’ নামে পরিচিত। জায়গাটি খুঁজে দেখতে ডুবোজাহাজ বা সাবমার্সিবল ব্যবহার করেছেন চীন, ইতালি ও নিউজিল্যান্ডের একদল গবেষক।
প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি বছর আগে অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ দুটি একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার সময় এ অঞ্চল তৈরি হয়েছিল।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ।
‘ডায়াম্যান্টিনা ফ্র্যাকচার জোন’-এর গভীরতম বিন্দুর কাছাকাছি প্রায় ৭ হাজার ২ মিটার গভীরতায় তিমির এসব জীবাশ্মের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। এরপর সমুদ্রের তলদেশে তারা আরও ৩২ বার ডুব দিয়ে সেখানে ৪৮৫টি তিমির খোঁজ পেয়েছেন।
পাশাপাশি আধুনিক সময়ের আরও পাঁচটি তিমির মৃতদেহও দেখতে পেয়েছেন তারা, যেগুলো পচনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
গবেষক দলটি বলেছে, “উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব অক্ষ বরাবর ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এসব মৃত তিমির সারি সম্ভবত ‘হোয়েল-ফল কমিউনিটি সুপারকোরিডোর’ বা তিমি-পতনের এক বড় সংযোগ পথ তৈরি করেছে, যা এর আগে কখনোও আমাদের নজরে আসেনি।”
গবেষকদের মাধ্যমে আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় মৃতদেহটি ছিল অ্যান্টার্কটিক মিঙ্কে তিমির পাঁচ মিটার লম্বা কঙ্কাল। তারা কিছু বিলুপ্ত প্রজাতির অবশিষ্টাংশেরও দেখা পেয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে প্রায় ৫৩ লাখ বছর পুরানো ‘টেরোসেটাস বেঙ্গুয়েলে’ নামের চঞ্চুওয়ালা তিমির মাথার খুলির জীবাশ্ম।
এ ছাড়া গবেষক দলটি আরেকটি জীবাশ্ম খুলি খুঁজে পেয়েছেন, যা তিমির সম্পূর্ণ নতুন এক প্রজাতি। গবেষক দলটি এর নাম দিয়েছেন ‘টেরোসেটাস ডায়াম্যান্টিন’।
সমুদ্রের তলদেশে পচনশীল তিমির এসব মৃতদেহ ‘ক্রাস্টেসিয়ান’ বা কাঁকড়া বা চিংড়ি জাতীয় জলজ প্রাণী, মলাস্ক বা শামুক-ঝিনুক জাতীয় প্রাণী, হাড়খেকো কৃমি ও ব্রিটল স্টারসহ এক বৈচিত্র্যময় প্রাণীকুলের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছিল।
গবেষকরা বলেছেন, এখানকার অনেক প্রজাতিই সম্ভবত বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ নতুন হতে পারে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ সাউদাম্পটন’-এর সমুদ্র অন্বেষণ ও বিজ্ঞান যোগাযোগ বিষয়ের অধ্যাপক জন কপলি বলেছেন, “এমনটা রোমাঞ্চকর ও বিরল আবিষ্কার, যা কেবল গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে গভীরতম হোয়েল-ফল কলোনিই নয়, বরং নির্দিষ্ট এ স্থানে বর্তমান ও প্রাচীন যুগের তিমির জীবাশ্মের বড় এক সমাহার। বিষয়টি সত্যিই দারুণ।”
এসব মৃত তিমি গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের জন্য দ্বীপের মতো বাসস্থান হিসেবে কাজ করেছে। সমুদ্রের তলদেশের উষ্ণপ্রসবণ বা হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের কাছাকাছি যেসব প্রাণী বেঁচে থাকে এদের অনেক আত্মীয় প্রজাতিও তিমির এসব অবশিষ্টাংশকে আহার বানিয়ে এখানে টিকে থাকে।
তবে কপলি বলেছেন, সমুদ্রের তলদেশের গরম পানির ঝরনাগুলোর মতো এসব হোয়েল ফল বা তিমির সমাধিক্ষেত্রে দূর থেকে কোনো প্রযুক্তির সাহায্যে শনাক্ত করা যায় না। ফলে এগুলো খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন।
“প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৮০০টি কঙ্কাল থাকা তিমির এমন সমাধিক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া সত্যিই বিস্ময়কর। বিভিন্ন প্রজাতির তিমির এ সমাধিক্ষেত্রটি গবেষকদের জন্য এক বড় ধাঁধা।”
কারণ, এ সমাধিক্ষেত্রে যেমন মিঙ্কে তিমির মতো অগভীর পানিতে ডুব দেওয়া ও ছাঁকন পদ্ধতিতে খাবার খাওয়া প্রজাতি রয়েছে তেমনই আবার চঞ্চুওয়ালা তিমির মতো বহু গভীর পানির শিকারি তিমির হাড় ও জীবাশ্মও রয়েছে।
কপলি বলেছেন, “গবেষকদের ধারণা, সমাধিক্ষেত্রেটি সম্ভবত ছাঁকন পদ্ধতিতে খাবার খাওয়া তিমিদের অভিবাসন বা যাতায়াতের পথের ওপর অবস্থিত হওয়ার কারণেই তৈরি হয়েছে। জায়গাটি শিকারি প্রজাতির তিমিদের জন্য সমুদ্রের গভীরে গিয়ে স্কুইড শিকার করারও আদর্শ জায়গা।
“তবে সমুদ্রের তলদেশের এ গভীর ফাটল বা খাঁজে নেমে শিকার করতে গিয়ে তারা সম্ভবত নিজেদের শারীরিক সক্ষমতার চরম ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমার মুখোমুখি হয়েছিল, যা এদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।”