Published : 09 Mar 2026, 12:06 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের উন্মাদনার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে দেখা দিচ্ছে স্পষ্ট মতভেদ। পুরুষরা যেখানে এআই’কে কাজের সুযোগ হিসেবে দেখছেন, সেখানে নারীদের বড় একটি অংশই এআইকে দেখছেন সন্দেহের চোখে।
কর্মক্ষেত্রে এই মানসিকতার পার্থক্য ভবিষ্যতে বড় ধরনের লিঙ্গবৈষম্য তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি’র পঞ্চম বার্ষিক ‘উইমেন অ্যাট ওয়ার্ক’ জরিপে এমন প্রবণতা উঠে এসেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬৯ শতাংশ পুরুষের ধারণা, এআই ‘গুরুত্বপূর্ণ সহকারী ও সহযোগী’, যেখানে এর সঙ্গে একমত হয়েছেন ৬১ শতাংশ নারী।
জরিপে অর্ধেক নারীই এআই’কে সন্দেহের চোখে দেখেন এবং ধারণা করেন, ‘কাজে এআই ব্যবহার করা অনেকটা প্রতারণা করার মতো’। অন্যদিকে, এ ধারণার সঙ্গে একমত হয়েছেন কেবল ৪৩ শতাংশ পুরুষ।
১০ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬ হাজার ৩৩০ জনের অংশগ্রহণে এ জরিপটি পরিচালিত হয়। ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি চালুর মাধ্যমে জেনারেটিভ এআইয়ের যে জোয়ার শুরু হয়েছিল তার ঠিক তিন বছর পর এ জরিপটি সামনে এল।
চ্যাটজিপিটি আসার পর থেকেই বিভিন্ন চ্যাটবট দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর ধারাবাহিকতায় এআই জেনারেটেড ছবি ও ভিডিও পরিষেবা, কোডিং এজেন্ট এবং নানা ধরনের টুল এসেছে। ফলে, এখন সামান্য কিছু টেক্সট প্রম্পট আর মাউসের ক্লিকেই এখন অ্যাপ তৈরি করা সহজ হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট বা বিনিয়োগকারীরা বাজি ধরছেন, এআই প্রচলিত অনেক এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যারের জায়গা দখল করে নেবে। এ কারণে গত এক বছরে বিভিন্ন সফটওয়্যার কোম্পানির শেয়ারের দামে বড় ধস দেখা গেছে।
কর্মক্ষেত্রে নারীদের তুলনায় পুরুষরাই বেশি এআই ব্যবহার করছেন। জরিপে উঠে এসেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৪ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে কখনোও এআই ব্যবহার করেননি, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার কেবল ৫৫ শতাংশ।
যারা নিয়মিত বা খুব বেশি এআই ব্যবহার করেন তাদের মধ্যেও পুরুষদের সংখ্যা বেশি। ১৪ শতাংশ পুরুষ বলেছেন, তারা দিনে ‘একাধিকবার’ এআই ব্যবহার করছেন, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার কেবল ৯ শতাংশ।
‘জেপিমরগান চেজ’-এর সিইও জেমি ডিমন এআই’কে ‘কোম্পানির ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
২০২৬ সালের ‘ইনভেস্টর ডে’তে তিনি বলেছেন, তাদের কোম্পানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মী এখন অভ্যন্তরীণ কাজে ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ বা এলএলএম ব্যবহার করছেন। এআই অনেক কর্মসংস্থান কমিয়ে দেবে। ফলে বিভিন্ন কোম্পানির উচিত কর্মীদের নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
পুরুষরা এআই ব্যবহারে এগিয়ে থাকলেও তাদের ধারণা, এ বিষয়ে তাদের আরও শেখা প্রয়োজন। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৫৯ শতাংশ পুরুষ বলেছেন, কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের জন্য তাদের আরও প্রশিক্ষণ দরকার।
এছাড়া, ৩৯ শতাংশ পুরুষ এ প্রযুক্তিকে গ্রহণ না করলে পিছিয়ে পড়ার ভয়ে ভুগছেন, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, ৪২ শতাংশ নারী এ ধারণার সঙ্গে ‘দৃঢ়ভাবে দ্বিমত’ পোষণ করেছেন যে, এআই গ্রহণ না করলে তারা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বেন, যেখানে পুরুষদের মধ্যে এই হার ৩৬ শতাংশ।
নারীরা যদি পুরুষদের মতো সমান গতিতে এআই প্রশিক্ষণে অংশ না নেন তবে এর ফলাফল কী হতে পারে? এ প্রশ্নটি নিয়ে গেল ডিসেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে আলোচনা করেছেন ‘লিন ইন ডট অর্গ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও মেটা’র সাবেক অপারেটিং চিফ শেরিল স্যান্ডবার্গ।
“আমরা জানি, এআই চাকরির ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। যারা এসব টুল ব্যবহার করতে জানবে না তাদের জন্যই চ্যালেঞ্জটা সবচেয়ে বেশি।”
নারীদের তুলনায় পুরুষরা যদি বেশি এআই ব্যবহার করে, বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তবে তা লিঙ্গবৈষম্য বা জেন্ডার গ্যাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এমন সময়ে এটি ঘটছে যখন নারীরা প্রায়ই ম্যানেজার পদে প্রথম পদোন্নতি পাওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে থাকেন, যার দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব তাদের পুরো ক্যারিয়ারের ওপর পড়তে পারে।
স্যান্ডবার্গ বলেছেন, “আমরা এর একপেশে বা অসম প্রভাব দেখতে পাব, যা আমাদের বিভিন্ন কোম্পানির জন্য লজ্জাজনক ও আমাদের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে।”