Published : 03 Apr 2026, 10:36 AM
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আর্টেমিস টু মিশনটি কেবল চাঁদে ফেরার যাত্রা নয়, বরং নাসার দীর্ঘদিনের প্রচলিত ঠিকাদারনির্ভর ব্যবস্থার টিকে থাকার লড়াই।
একদিকে বোয়িং ও লকহিড মার্টিনের মতো পুরানো জায়ান্টদের কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা অন্যদিকে স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিনের মতো কোম্পানিগুলোর সাশ্রয়ী ও আধুনিক প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ, সব মিলিয়ে এ মিশনটি মহাকাশ বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।
রয়টার্স লিখেছে, নাসা কি নিজের পুরানো পথেই হাঁটবে, নাকি বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার নতুন যুগে প্রবেশ করবে এর উত্তর মিলবে আর্টেমিস টু যাত্রার সাফল্যের ওপর।
ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বৃহস্পতিবার ভোরে এ মিশনটি শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো কোনো নভোচারী দল চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসবেন। এটিই বোয়িং ও নরথ্রপ গ্রুম্যানের তৈরি স্পেস লঞ্চ সিস্টেম বা এসএলএস রকেট ও লকহিড মার্টিনের তৈরি ওরিয়ন ক্যাপসুলের প্রথম যাত্রীবাহী উৎক্ষেপণ।
এ দুটি সিস্টেম বছরের পর বছর ধরে উন্নয়ন ও যাত্রীহীন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে কেবল রকেটের উন্নয়ন কাজই শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে ও এর পেছনে খরচ হয়েছে ২৪০০ কোটি ডলারের বেশি।
আর্টেমিস টু হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন চরম ঝুঁকির মুখে রকেটের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই হবে। কারণ, এবার এতে যান্ত্রিক পুতুলের বদলে থাকছেন রক্ত-মাংসের মানুষ।
আর্টেমিস টু-এর ফলাফল ওরিয়ন ও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সক্রিয় রকেট এসএলএস-এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিতে পারে। এসএলএস রকেটটি শুরু থেকেই আকাশচুম্বী খরচ ও তুলনামূলক ধীরগতির উৎক্ষেপণ হারের কারণে কঠোর সমালোচনার মুখে রয়েছে।
‘কি-ব্যাঙ্ক ক্যাপিটাল মার্কেটর্স’-এর ইকুইটি রিসার্চ অ্যানালিস্ট মাইকেল লেশক বলেছেন, “যখনই নভোচারীরা বোর্ডে থাকেন তখন ঝুঁকি ও গুরুত্ব দুটিই বহুগুণ বেড়ে যায়।”
নাসা যখন প্রমাণিত বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিকল্পের কথা ভাবছে তখন আর্টেমিস টু তাদের জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতির মুহূর্ত’ হিসেবে কাজ করছে।
বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চ্যালেঞ্জের মুখে এসএলএসের আধিপত্য
স্পেসএক্স-এর পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ফ্যালকন ৯ রকেট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বেসরকারি রকেটগুলোর যে নতুন জোয়ার এসেছে তা নাসার চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, বিশেষ করে এসএলএস রকেটের ক্ষেত্রে। যেখানে বর্তমানে পুরো মহাকাশ শিল্প রকেটের পুনরায় ব্যবহারযোগ্যতার দিকে ঝুঁকছে সেখানে নাসা এখনও এসএলএস-এর মতো খরচসাপেক্ষ রকেট ব্যবহার করছে, যা কয়েক দশকের পুরানো ‘শাটল যুগ’-এর প্রযুক্তিরই নতুন এক রূপ।
মাস্কের স্পেসএক্স ও জেফ বেজোসের ‘ব্লু অরিজিন’-এর মতো বাণিজ্যিক বিভিন্ন কোম্পানি এরইমধ্যে নাসার এই খাতে ভাগ বসানোর জন্য প্রস্তুত।
গত সপ্তাহে ঘোষণায় নাসার প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেছেন, আর্টেমিস ফাইভ মিশনের পর নভোচারী ও রসদ পাঠানোর জন্য এসএলএস-এর একচেটিয়া অধিকার তুলে দিয়ে অন্যান্য কোম্পানির জন্য নাসা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র খুলে দেবে।
কয়েক সপ্তাহে আইজ্যাকম্যান আর্টেমিস প্রোগ্রামে যেসব বড় পরিবর্তন এনেছেন তার মধ্যে এটি একটি। তিনি এসএলএস রকেটের ওপরের অংশকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। এর বদলে বোয়িং ও লকহিড মার্টিনের যৌথ উদ্যোগ ‘ইউনাইটেড লঞ্চ অ্যালায়েন্স’কে তাদের তুলনামূলক কম শক্তিশালী ‘সেন্টর আপার স্টেজ’ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন আইজ্যাকম্যান।
‘প্রকিওরএএম’-এর সিইও অ্যান্ড্রু চ্যানিন বলেছেন, “নাসা যদি স্পেসএক্স বা ব্লু অরিজিনকে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করে তবে ভবিষ্যতে অংশীদার নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি সুযোগ পাবে। স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিন এরইমধ্যে আর্টেমিস মিশনের সঙ্গে জড়িত। এখন দেখার বিষয় তারা ভবিষ্যতে কতটা বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ পায়।”
উচ্চ উৎপাদন খরচ এসএলএসের ভবিষ্যৎকে সংকটে ফেলছে
বিশ্লেষকদের মতে, এসএলএস প্রোগ্রামটি ব্যয়বহুল। নিয়মিত ও সাশ্রয়ীভাবে চাঁদে যাতায়াতের জন্য নাসার কাছে দীর্ঘমেয়াদে এমনটি খুব একটা লাভজনক বিকল্প হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ফলে, আর্টেমিস টু মিশনটি এ প্রোগ্রামের সঙ্গে যোগ থাকা বিভিন্ন ঠিকাদার কোম্পানির জন্য নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের এক অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, বাজারে আসা নতুন ও কম খরুচে বিভিন্ন রকেট এরইমধ্যে তাদের নিজস্ব নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করতে শুরু করেছে।
প্রতিটি এসএলএস উৎক্ষেপণে আনুমানিক ২০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলার পর্যন্ত খরচ হয়। এর বিপরীতে, স্পেসএক্স-এর স্টারশিপ ও ব্লু অরিজিনের নিউ গ্লেন রকেট অনেক সাশ্রয়ী। মিশনের জটিলতা অনুসারে এই খরচ কয়েক কোটি ডলার এদিক-সেদিক হতে পারে।

২০২৫ সালে একটি প্রাথমিক নিউ গ্লেন ফ্লাইটের জন্য নাসা কেবল ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার দিয়েছিল। আবার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুসারে, স্পেস স্টেশন কোম্পানি ‘ভয়েজার’ তাদের পরিকল্পিত স্টারশিপ উৎক্ষেপণের জন্য ৯ কোটি ডলার খরচ করেছে।
২০২৩ সালে নাসা এসএলএস-এর খরচ কমানোর চেষ্টা করলেও তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। সে সময় বোয়িং ও নরথ্রপ যৌথ এক উদ্যোগ গঠন করেছিল, যার মাধ্যমে নাসা রকেটের মালিকানা এসব কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিতে চেয়েছিল, যাতে তারা বাণিজ্যিকভাবে তা বিক্রি করতে পারে।
নাসা এরইমধ্যে নিজেদের আর্টেমিস মিশনে বাণিজ্যিক বিভিন্ন সিস্টেমকে যোগ করতে শুরু করেছে। যেমন, চাঁদে অবতরণের যান তৈরির প্রধান দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিনকে।
ভবিষ্যতের বিভিন্ন মিশনে এ নির্ভরশীলতা আরও বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত আর্টেমিস প্রোগ্রামের মূল ভিত্তি হিসেবে এসএলএসের টিকে থাকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলছে।
পুরানো কোম্পানিগুলোর রাজনৈতিক শক্তি
এত কিছুর পরেও সবাই এখনই পুরানো এসব ব্যবস্থাকে বাতিলের খাতায় ফেলতে রাজি নন। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, বড় কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রভাব ও তাদের দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা এখনও বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে।
‘ক্যানাকর্ড জেনুইটি’র ইক্যুইটি রিসার্চ ডিরেক্টর অস্টিন মোয়েলার বলেছেন, “এসএলএস-এর প্রতি এখনও মার্কিন কংগ্রেসের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে, যার ফলে এ প্রোগ্রামটি সহজে বন্ধ করা যাবে না।”
২০২৩ সাল থেকে স্টারশিপ ১১ বার পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ চালালেও এখন পর্যন্ত কক্ষপথে কোনো মালামাল পাঠাতে পারেনি। অন্যদিকে, এসএলএস ও ওরিয়ন ২০২২ সালেই সফলভাবে যাত্রীবিহীন অবস্থায় চাঁদের চারপাশ ঘুরে এসে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
স্পেসএক্স ও বাণিজ্যিক চুক্তিনির্ভর সংস্কৃতির সমর্থকরা বছরের পর বছর ধরে এসএলএস বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে তাদের বেশ কিছু চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের বাজেট প্রস্তাবে আর্টেমিস ৩-এর পর এসএলএস বন্ধের কথা বলা হয়েছিল। তবে সেনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন কমিটির চেয়ারম্যান টেড ক্রুজ, যার নিজের অঙ্গরাজ্য টেক্সাসে অসংখ্য বোয়িং কর্মী ও এসএলএস সরঞ্জাম সরবরাহকারী রয়েছে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে একটি বিল পাসের মাধ্যমে আর্টেমিস ৫ পর্যন্ত এই রকেটের ভূমিকা নিশ্চিত করেছেন।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগানের প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক সংগঠন ‘প্ল্যানেটারি সোসাইটি’র মহাকাশ নীতি প্রধান কেসি ড্রায়ার বলেছেন, “প্রস্তাবটি এর চেয়ে দ্রুত গতিতে বাতিল হতে পারত না।
“বিভিন্ন কোম্পানি রকেটগুলো কম খরচ ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার প্রমাণ দিলেও এসএলএস-কে আঁকড়ে ধরে রাখার বিষয়টি আসলে পুরোপুরি রাজনৈতিক।”