Published : 05 Jun 2026, 01:38 AM
হাম ও এই রোগের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর যে তথ্য প্রতিদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিচ্ছে, তাতে সঠিক চিত্র উঠে আসছে? এ প্রশ্ন আর আলোচনার মধ্যেই মোট মৃত্যু ছাড়িয়ে গেছে ছয়শ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ‘নিশ্চিত’ হামের চেয়ে ‘সন্দেহজনক’ হামে মৃত্যু পাঁচ গুণের বেশি।
সরকারের তরফে ‘সন্দেহজনক’ হামে মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তাকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাহলে হামে কত শিশু মারা গেছে? এ প্রশ্ন যখন সামনে আসছে, তখন উত্তর পেতে মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা বা ডেথ রিভিউ করার বিষয়ে জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানুয়ারিতে প্রথম হাম রোগী শনাক্ত হয়, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ রোগে মৃত্যু, আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ ও সংরক্ষণ শুরু করে।
সে দিন থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারাদেশে ৯ হাজার ২৬০ জন আক্রান্তের তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, তাদের বুলেটিন অনুযায়ী, এ সময়ে আক্রান্তদের মধ্যে ৯১ জন মারা গেছে, এ রোগের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৫১৪ জন।
এর আগে গত ২০ বছরে হামে এতো আক্রান্ত দেখেনি বাংলাদেশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুসারে, ২০০৫ সালে ২৫ হাজারের বেশি শিশু রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছিল। এরপর আর এত বেশি শিশু কোনো বছরই আক্রান্ত হয়নি।
গেল ১২ এপ্রিল ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (নাইট্যাগ) এবং ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির (এনভিসি) যৌথ সভায় বিশেষজ্ঞরা হামের মৃত্যুর বিষয়ে সবাই একমত হন যে, দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় হামের উপসর্গ থাকলে সবই হাম রোগে মৃত্যু।
এনভিসির চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “দেশে হামের যে পরিস্থিতি তাতে আর উপসর্গে নয় বরং যাদের শরীরে ন্যূনতম হামের উপসর্গ দেখা দিয়ে মারা যাচ্ছে তারাও ‘নিশ্চিত’ হাম রোগে মারা যাচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কেন ‘সন্দেহজনক’ মৃত্যু বলছে, সেটা জানা নেই।”

যেভাবে ভয়াবহ প্রকোপ
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথম কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাম শনাক্ত হয়েছিল। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাম উপসর্গের রোগী দেখা যায়। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজশাহী অঞ্চলে হাম রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি জানা যায়।
রাজশাহীতে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউ সংকটে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তা সবাইকে নাড়িয়ে দেয়। মৃতদের মধ্যে ১০ জনের বেশি শিশু হামে আক্রান্ত ছিল বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসে।
১৮ মার্চের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে ৪৪ শিশুর শরীরে সংক্রমণ নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য বিভাগ। এর মাঝে ময়মনসিংহেও হামের সংক্রমণ দেখা যায়।
রাজশাহীতে ১১ দিনে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ২৮ মার্চ ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, “১১ দিনে ৩৩টা শিশু—৩৩টা বেবি মারা গেছে আমার! অথচ আমাদের জানানো হয়নি যে ভেন্টিলেটর নেই এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাকে (রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক) ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানো উচিত।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ইনস্টিটিউটের একজন চিকিৎসক বলেন, চলতি বছরের শুরুতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ও পরে ঢাকার বস্তিতে এই রোগে প্রথম শিশুদের আক্রান্তের কথা জানা যায়।
মার্চের মাঝামাঝি দেশে হামে ও হামের লক্ষণ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। পরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সংক্রমণ।
গেল ২৩ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতির মূল্যায়ন তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয় বাংলাদেশ হামের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে; ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়ানোর কথা বলা হয় সংস্থার তরফে।
এছাড়া টিকাদানের অভাবে হাম প্রতিরোধ সক্ষমতার ঘাটতির বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কর্মকর্তা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা বলছেন, বিগত বছরগুলোতে পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়া, অপুষ্টিসহ বেশকিছু কারণেই নতুন করে হামের এ প্রকোপ দেখা দিয়েছে।
৯ থেকে ১৫ মাস বয়সি শিশুদের হামের দুটি টিকা দেওয়া হলেও অতিরিক্ত হিসাবে প্রতি চার বছর পরপর অতীতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হতো। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার বছর ২০২৪ সালে তা হয়নি।
এর আগে ২০২০ সালে কোভিড মহামারীর কারণে ওই বিশেষ কর্মসূচি হয়নি। আর অস্থিরতার সময়ে ২০২৪ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিও ব্যাহত হয়।
হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বাড়তে থাকায় সমালোচনার মুখে ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় জরুরি ভিত্তিতে হাম-রুবেলার টিকাদান শুরু হয়। প্রথম ধাপে প্রায় ১২ লাখ ৩ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল। এই উদ্যোগে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সি (৫৯ মাস পর্যন্ত) সব শিশুকে এই টিকার আওতায় আনা হয়।
পরে ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান শুরু হয়। তারপর থেকে ২০ মে পর্যন্ত টিকাদান কর্মসূচিতে সারাদেশে ১ কোটি ৮৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
টিকাদান কর্মসূচির শেষ দিনে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, টিকার ঘাটতি নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছেন তারা এবং বৈঠক হয়েছে অন্তত ১০টি।
বাংলাদেশে টিকার ‘আসন্ন ঘাটতির’ কথা তুলে ধরে জাতীয় নির্বাচনের দুইদিন আগে ১০ ফেব্রুয়ারিও তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন রানা ফ্লাওয়ার্স।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এই চিঠি পাঠানো হলেও এমন চিঠি সেটিই প্রথম ছিল না বলে দাবি করেছেন তিনি।
২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় টিকা আনত সরকার। এতে অর্থায়ানের মূল উৎস ছিল দাতাদের সহায়তা। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে টিকা কেনার ব্যয় রাজস্ব বাজেটের খরচের আওতায় এনে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার পথে এগোয় মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
হামের টিকা না কেনায় মুহাম্মদ ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিচার দাবি করে বিক্ষোভ হয়েছে।

এ ছাড়া গত ১৯ মে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্তে কেন কমিশন গঠনের নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে হাই কোর্ট।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম আশরাফুল ইসলাম গত ১৭ মে এ রিট আবেদন করেছিলেন।
আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
হামে মৃত্যু ও টিকার সংকটের পেছনে কারো গাফিলতি ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরুর কথা বলেছেন স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে ‘স্বাধীন তদন্ত’ করার জন্য সরকার অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে, এমন খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
মৃত্যু আসলে কত?
সারাদেশে ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৮১ দিনে হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে ৬০৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাম আক্রান্তদের মধ্যে মারা গেছে ৯১ জন। আর ‘সন্দেহজনক’ হামে ৫১৪ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে ৪ মে এবং ২৫ মে ১৭ জন করে শিশু মারা গেছে। এই হিসাবে গড়ে প্রতিদিন ৭ জনের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে ‘সন্দেহজনক’ হামে মৃত্যুর তথ্য নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন একাধিক বিশেষজ্ঞ।
গত ১২ এপ্রিলের সভায় এনভিসি এবং নাইট্যাগের বিশেষজ্ঞরা সব মৃত্যুকে হামে মৃত্যু বলার পক্ষে মত দেন।
বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি এবং সংস্থার মতের বাইরে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখনো আলাদা করে ‘সন্দেহজনক’ হামে মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করায় ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে এ রোগে এ পর্যন্ত কতজন মারা গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। ১৫ মার্চের আগে যে শিশুরা মারা গেছে সরকারের এই খাতায় তা যোগ হয়েছে কি হয়নি, সে আলোচনাও সামনে এসেছে।
এনভিসি ও নাইট্যাগের ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন, এমন একজন বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা অনেকবার বলেছি, এখন হামের উপসর্গ থাকা সব শিশুর মৃত্যুকে হামের মৃত্যু বলতে হবে। এটিই মহামারীর সময়ের ‘রেজুলেশন’। কিন্তু কেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ বিষয়টি স্পষ্ট না করে ভিন্নভাবে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করছে জানা নাই।”
‘সন্দেহজনক’ মৃত্যুর তথ্যকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ।

ডা. বেনজির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হামের সময় যারা বিভিন্ন লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়ে মারা যায়, তারাও মূলত হামেই মারা যাচ্ছে। তবে বর্তমানে যেহেতু ‘ল্যাব টেস্ট’ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিছু বলছে না, তাই এখানে ‘সম্ভাব্য’ হাম বলা যেতে পারতো।
“তবে কেন সেটি না করে ‘সন্দেহজনক’ বলা হচ্ছে, সেটি জানা নেই।”
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমরা আসলে পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ‘নিশ্চিত হামে মৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করছি। আর অনেকে হাম বা হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসছে, তারপর হাম থেকে সেরেও উঠছে।
“পরবর্তীতে বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, তাদের তো হামে মৃত্যু বলা যেতে পারে না। তাই আমরা ‘সন্দেহজনক মৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করছি।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ যুক্তির বিষয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআরের সাবেক উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন।
তার মতে, এই মৃত্যুকে ‘সম্ভাব্য’ মৃত্যু বলা যেতে পারে।

মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা হবে?
এর আগে দেশে করোনাভাইরাস মহামারীর সময় মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা বা ‘ডেথ রিভিউ’ হয়েছে। এটি মূলত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমন্বয়ে করা হয়েছিল। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনার নজিরও রয়েছে।
তবে এবার হামে মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনার কোনো কাজ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
তাহলে সন্দেহজনক হামে যে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে, তারা হাম আক্রান্ত হয়ে নাকি অন্য কোনো রোগে মারা গেল, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে কীভাবে?
গাজীপুরের মো. সোহেল বলছিলেন, তার মেয়ে ৭ বছরের সামিয়া মারা গেছে মে মাসের শুরুর দিকে।
“তার ‘মৃত্যু সনদ’ এ কারণ লেখা হয়েছে ‘নিউমোনিয়া’। তবে হাম নিয়ে তিন দিনের বেশি সময় আইসিইউতে থাকার পর বাচ্চা মারা গেছে। ডাক্তাররা হাম বললেও, আমি হাম পরীক্ষার ফলাফল জানি না। মেয়ে আসলে কোন রোগে মারা গেছে, সেটি অবশ্যই জানতে চাই।”
হামের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৬০ শিশুর মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে।
সে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ছেলে ৩১ ও মেয়ে ২৯টি; ঢাকায় মারা গেছে ৪৮টি শিশু, বাকি ১২টি শিশু ঢাকার বাইরে।

তিন মাস বয়সি চারজন, চারমাস বয়সি পাঁচজন, পাঁচ মাস বয়সি দুইজন, ছয়মাস বয়সি চারজন, সাত মাসের সাতজন, আট মাসের সাতজন রয়েছে মৃতদের এ তালিকায়।
নয় মাস বয়সি তিনজন, ১০ মাস বয়সি আটজন এবং ১১ মাস বয়সি চারজন শিশু মারা গেছে। ১২ মাস বয়সি দুইজন, ১৩ মাস বয়সি দুইজন, ১৫ মাস বয়সি দুইজন এবং ১৬ মাস বয়সি একজন শিশু মারা গেছে।
দুই বছর বা ২৪ মাস বয়সি একজন, ২৭ মাস বয়সি দুইজন, ৩০ মাস বয়সি একজন, তিন বছর বা ৩৬ মাস বয়সি দুইজন, ৪২ মাস বয়সি একজন, ৫১ মাস বয়সি একজন এবং নয় বছর বা ১০৮ মাস বয়সি একজন শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মৃত্যুর যে তথ্য দিয়েছে, সেখানে তারিখ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভর্তির দিনই পাঁচটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ভর্তির এক দিনের মধ্যে মারা গেছে নয় শিশু। ভর্তির দুই দিনের মধ্যে মারা গেছে নয় শিশু।
মৃত শিশুদের তালিকায়, বরিশালে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে মারা যাওয়া পাঁচজনের মৃত্যু তারিখ রয়েছে। তবে তারা কবে ওই হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছিল, সেই তারিখ নেই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, “যাদের সন্দেহজনক মৃত্যুর কথা বলা হচ্ছে, তাদের মৃত্যুর কারণ অবশ্যই পর্যালোচনা হওয়া উচিত। কারণ মহামারীর সময়ে যাদের মৃত্যু হয় তাদের যত বেশি তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করা যায়, তা ভবিষ্যতের জন্য ভালো। এর মাধ্যমে মৃত্যুও ঠেকানো সম্ভব হয়।
“বর্তমান মৃত শিশুদের টিকাদান, পুষ্টি, শারীরিক অবস্থাসহ বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত। এতে অনেক মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করা খুব সহজ বিষয় নয়। তবে আমরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করে রাখছি। এ বিষয়ে আমাদের পরামর্শক সংস্থা নাইট্যাগ বা অন্যরা কোনো কিছু জানায়নি।
“তাই এ বিষয়ে অধিদপ্তর বিশেষভাবে কোনো কাজ করছে না। তবে আইসিডিডিআর,বি হাম নিয়ে কাজ করছে।”

সংক্রমণ কি আরও প্রলম্বিত হবে?
গেল ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৭২। বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা ৬১ হাজার ১৯৪। তবে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৭৫ হাজার।
‘সন্দেহজনক ও নিশ্চিত’ রোগী মিলিয়ে ঢাকা বিভাগে মোট রোগীর সংখ্যা ৩৫ হাজার ৫৮০, মোট মৃত্যু ২৬৫ জন, হাসপাতালে ভর্তি রোগী মোট ২৫ হাজার ৫১৬ হাজার জন। রাজশাহী বিভাগে মোট রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৬৮১, মোট মৃত্যু ৮৭, হাসপাতালে ভর্তি মোট রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৬০৬ জন। সিলেট বিভাগে মোট রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৮১০, মোট মৃত্যু ৬৪, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৩৬২।
বরিশাল বিভাগে মোট রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৯৪৪, মোট মৃত্যু ৫৬ জন, আর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ২৫৯। চট্টগ্রাম বিভাগে ১২ হাজার ৪৫৪ রোগীর মধ্যে মারা গেছে ৫৬ জন। সেখানে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৬০৫।
ময়মনসিংহ বিভাগে মোট রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ২৬১, মৃতের সংখ্যা ৪৯, হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ২ হাজার ৯৩১। খুলনা বিভাগে মোট রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৫৭৩; তাদের মধ্যে মারা গেছে ২২ শিশু, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৪৭। রংপুর বিভাগে মোট ১ হাজার ৪৭৭ রোগীর মধ্যে মারা গেছে ৭ জন। সেখানে হাসপাতালে ভর্তি রোগী সংখ্যা ৭৬৮।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশের সব জায়গার শিশুদের টিকার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এখন একটু সাবধানতা অবলম্বন করলেই দ্রুত হামের প্রকোপ কমে যাবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, বর্তমানে হাম সংক্রমণের ‘পিক’ সময় যাচ্ছে, সর্বোচ্চ সতর্ক না হলে এই সময় আরো প্রলম্বিত হতে পারে।