Published : 09 May 2026, 10:57 AM
পৌনে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক ও বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি হিসেবে ইলন মাস্কের ক্ষমতার দাপট এতটাই প্রবল যে, তিনি চাইলেই সিলিকন ভ্যালিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন।
তবে সব ক্ষেত্রে ক্ষমতার দাপট যে চলে না, তার প্রমাণ মিলেছে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে করা মাস্কের ১৫ হাজার কোটি ডলারের মামলায়। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার এক আদালতে এ আইনি লড়াই চলছে।
বিবিসি লিখেছে, ২০১৫ সালে মাস্ক ও ওপেনএআইয়ের বর্তমান সিইও স্যাম অল্টম্যান একসঙ্গে কোম্পানিটি গড়ে তুলেছিলেন। এর কেবল তিন বছর পরই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে মাস্ক ওপেনএআই ছাড়েন। সেই পুরানো তিক্ততা এখন প্রযুক্তি বিশ্বের দুই মহারথীর মধ্যে এক ব্যয়বহুল লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
তবে এ এজলাসে ক্ষমতার চাবিকাঠি কার হাতে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
মাস্ক ও অল্টম্যানের হাই-প্রোফাইল আইনি লড়াই এখন আদালত কক্ষে। এ জটিল মামলার রাশ শক্ত হাতে ধরেছেন বিচারক ইভন গঞ্জালেজ রজার্স। টেক্সাসের বাসিন্দা ৬১ বছর বয়সী এ ফেডারেল বিচারক আদালতে তার কঠোর ব্যক্তিত্ব ও সোজাসাপ্টা সিদ্ধান্তের জন্য সুপরিচিত।
‘মাস্ক বনাম অল্টম্যান’ মামলাটি হচ্ছে মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট বিচারক রজার্সের কাছে আসা বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির লড়াইয়ের সর্বশেষ নজির।
‘কুলি এলএলপি’তে একসময় বিচারক রজার্সের সহকর্মী ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী মাইকেল রোডস। তিনি বলেছেন, “আমার ধারণা, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাই তাকে এমন অকুতোভয় করে তুলেছে, যেখানে কোনো কিছুই এখন আর তাকে বিচলিত করতে পারে না।”
এ মামলায় মাস্কের অভিযোগ, অল্টম্যান ও ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান কোম্পানির অলাভজনক ট্রাস্টের শর্ত ভেঙে অন্যায়ভাবে লাভবান হয়েছেন। ২০১৯ সালে ওপেনএআই লাভজনক শাখা খোলার সিদ্ধান্ত নিলে মাস্ক এর বিরোধিতা করেন। এর ঠিক তিন বছর পরই বাজারে আসে চ্যাটজিপিটি, যা পুরো এআই বাজারের চেহারা পাল্টে দিয়েছে।
অন্যদিকে, ওপেনএআইয়ের দাবি, মাস্ক এ মামলাটি করেছেন কেবল তার নিজের এআই কোম্পানি এক্সএআই’কে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য।
গত সপ্তাহের শুনানিতে মাস্ক এক পর্যায়ে নিজেই নিজের উকিল হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ওপেনএআইয়ের আইনজীবী উইলিয়াম স্যাভিট যখন তাকে প্রশ্ন করছিলেন মাস্ক উল্টো অভিযোগ করেন, স্যাভিট তাকে প্ররোচনামূলক প্রশ্ন করছেন।
তবে বিচারক রজার্স মুহূর্তেই মাস্ককে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আদালত এভাবে চলে না’। মাস্ককে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, প্রতিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে স্যাভিটের এমন প্রশ্ন করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
বিচারক রজার্স মাস্ককে সোজাসাপ্টা মনে করিয়ে দিলেন, “চলুন আদালতের সবাইকে আমরা মনে করিয়ে দিই, আপনি (মাস্ক) কিন্তু কোনো আইনজীবী নন।”
মাস্কও তা স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন, “আমি আইনজীবী নই।” এরপর খানিকটা রসিকতা করে মাস্ক বলেছেন, “তবে টেকনিক্যালি, স্কুলে আমি ‘ল ১০১’ বা আইনের প্রাথমিক কোর্স পড়েছিলাম।”
তার এমন কথায় কানায় কানায় পূর্ণ আদালতের গ্যালারিতে হাসির রোল পড়ে যায়। তবে মাস্ক বিচারকের কথায় সায় দিয়ে আবারও বললেন, “হ্যাঁ, আমি কোনো আইনজীবী নই।”
এর থেকে বোঝায় যাচ্ছে, বিচারক রজার্সের রূপে মাস্ক এবার এক যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখে পড়েছেন।
প্রবীণ আদালত চিত্রশিল্পী ভিকি বেহরিঙ্গার এ বিচারকের অধীনে অনেকগুলো মামলায় ছিলেন। তিনি বলেছেন, “এ এক দারুণ বৈপরীত্য। মাস্ক বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ও সবসময় শীর্ষে থাকতেই অভ্যস্ত। তবে এই মুহূর্তে বিচারকই সবার উপরে। এখন সব নিয়ন্ত্রণ তারই হাতে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, রজার্স কঠোর হলেও একজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক। তার এজলাসে তারই পূর্ণ কর্তৃত্ব বজায় থাকে।
অতীতে মাস্ক ও ওপেনএআই উভয় পক্ষকেই আইনি সহায়তা দিয়েছেন মাইকেল রোডস। তিনি বলেছেন, “তিনি চান আইনের চোখে যেন সবাই সমান বিচার পায়।”
৯ সদস্যের জুরি বোর্ড এ মাসের শেষদিকে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে। তবে সেই সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক নয়। জুরিরা এখানে কেবল পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করছেন। চূড়ান্ত রায় বা শেষ ফয়সালা বিচারক রজার্স নিজেই দেবেন।
ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে অন্য এক মামলা লড়ছেন বাদিপক্ষের আইনজীবী জে এডেলসন। তিনি বলেছেন, “এ বিচারক পুরো দৃশ্যপটই বদলে দিয়েছেন। এ পুরো মামলাটি এখন সম্পূর্ণ বিচারকের একক নিয়ন্ত্রণে।”
বিচারক রজার্সের এজলাসে আসা মামলাগুলো সাধারণত প্রযুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও জটিল মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
এডেলসন বলেছেন, “এমন কিছু বিচারক আছেন যাদের সামনে দাঁড়ালে আপনাকে একটু বেশিই সচেতন থাকতে হয়। আপনাকে নিশ্চিত করতে হয়, সবকিছু ঠিক আছে কি না, এমনকি টাইটা সোজা বা আইনি রেফারেন্সে কোনো ভুল হচ্ছে কি না, সেদিকেও কড়া নজর রাখতে হয়।”
মাস্ক বনাম অল্টম্যান মামলা ছাড়াও বর্তমানে বড় এক আইনি লড়াইয়ের বিচারকাজ চালাচ্ছেন রজার্স, যেখানে মেটা, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক ও গুগলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্কুল ও অঙ্গরাজ্যের আনা ‘সামাজিক মাধ্যম আসক্তি’ সংক্রান্ত অনেকগুলো মামলাকে একত্রে বিচার করা হচ্ছে।
এ ছাড়া তিনি অ্যাপল ও এপিক গেইমসের মধ্যকার আলোচিত সেই ‘অ্যান্টিট্রাস্ট’ মামলারও বিচারক ছিলেন রজার্স। মামলাটি ছিল কারিগরি ও জটিল এক বিষয়, যেখানে জনপ্রিয় গেইম ফোর্টনাইট-এর নির্মাতা কোম্পানি অভিযোগ করেছিল, অ্যাপল জোরপূর্বক ডেভেলপারদের তাদের নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহারে বাধ্য করছে।
গেল বছর এ মামলার আদালত নথিতে বিচারক রজার্স লিখেছিলেন, অ্যাপলের একজন নির্বাহী শপথ নেওয়ার পরও ‘সরাসরি মিথ্যা বলেছেন’। তিনি বিষয়টি ক্যালিফোর্নিয়ার ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কাছে তদন্তের জন্য পাঠান।
উচ্চ আদালত রজার্সের আদালত অবমাননার রায় বহাল রাখলেও একটি জায়গায় ভিন্নমত জানিয়ে বলেছে, থার্ড-পার্টি পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অ্যাপল কোনো কমিশনই নিতে পারবে না– এমন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বিচারক রজার্স কিছুটা বেশি কঠোরতা দেখিয়েছেন।
এ সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট অ্যাপলের সেই স্থগিতাদেশের আবেদনটি খারিজ করে দিয়েছে। ফলে মামলাটি এখন আবারও বিচারক রজার্সের কাছে ফিরে আসবে, যাতে তিনি ন্যায্য কমিশনের হার নির্ধারণ করে দিতে পারেন।
২০১১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইভন রজার্সকে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে ফেডারেল বিচারক হিসেবে আজীবনের জন্য নিযুক্ত করেন।
তার জীবনের শুরুর দিকটা ছিল বেশ সংগ্রামের। তার নিয়োগকালীন শুনানিতে তৎকালীন সেনেটর ডায়ান ফেইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি’তে পড়ার সময় রজার্স ছুটির দিনে ও সাপ্তাহিক ছুটিতে মানুষের ঘরবাড়ি পরিষ্কার ও ঘাস কেটে নিজের পড়ার খরচ জোগাতেন।
আইন নিয়ে পড়াশোনার পর এক দশকেরও বেশি সময় ব্যক্তিগতভাবে ওকালতি এবং একটি ল-ফার্মের পার্টনার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন রজার্স। এরপর তৎকালীন গভর্নর আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার তাকে স্থানীয় সুপিরিয়র কোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন।
এপ্রিলের শেষদিকে ‘মাস্ক বনাম অল্টম্যান’ মামলা শুরুর পর থেকেই বিচারক রজার্স আদালত কক্ষকে এক কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে রেখেছেন। প্রতিদিন ঠিক সকাল ৮টায় তিনি বিচারকাজ শুরু করেন। দুপুরে খাওয়ার জন্য আলাদা কোনো বিরতি দেওয়া হয় না, পুরো দিনে কেবল ২০ মিনিটের দুটি ছোট বিরতি বরাদ্দ থাকে।
জুরি সদস্যদের প্রতি তিনি বেশ সদয়। নাগরিক দায়িত্ব পালন ও শুনানিতে গভীর মনোযোগ দেওয়ার জন্য তিনি নিয়মিত তাদের ধন্যবাদ জানান। একবার তো তিনি রসিকতা করে তাদের বললেন, “বাড়িতে গিয়ে পরিবারের ওপর মেজাজ খারাপ করলে বুঝবেন যে সেটা আসলে ক্লান্তির কারণে হচ্ছে।”
রজার্সকে ‘দারুণ রসিক’ মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তার সাবেক সহকর্মী মাইকেল রোডস। বিচারক রজার্স নিজের রসিকতা নিয়ে মাঝেমধ্যে নিজেই মজা করেন।
সম্প্রতি আদালতে তিনি বলছিলেন, তার ছেলেমেয়েরা সবসময় তাকে মনে করিয়ে দেয় তার কৌতুকগুলো একদমই ভালো নয়, ‘আর আইনজীবীরা হাসে কেবল তাদের হাসতে হয় বলে’।
গত সপ্তাহে আদালতের একটি মাইক্রোফোন হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেলে তার এক মন্তব্যে পুরো আদালত কক্ষ হাসিতে ফেটে পড়ে। নিখুঁত টাইমিং বজায় রেখে তিনি বলেছিলেন, ‘আর কী বলব আপনাদের? আমাদের অনুদান তো দেয় ফেডারেল সরকার (ফলে এমনই হবে)!”
তবে মামলার দুই পক্ষ ও তাদের আইনজীবীদের ব্যাপারে তিনি আপসহীন।
বিচারের প্রথম সপ্তাহেই বিচারক রজার্স মাস্ককে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স-এর সাম্প্রতিক কিছু পোস্টের জন্য সাবধান করেছেন, সেখানে ওপেনএআই ও অল্টম্যান সম্পর্কে কটু কথা লিখেছিলেন মাস্ক, অল্টম্যানকে তিনি ‘স্ক্যাম অল্টম্যান’ বা প্রতারক অল্টম্যান বলেও সম্বোধন করেছেন।
রজার্স তাকে প্রশ্ন করেন, “আদালতের বাইরে পরিস্থিতি আরও খারাপ না করে আমরা কি এ বিচারকাজটি শেষ করতে পারি না?” উত্তরে মাস্ক বলেছেন, তিনি কেবল এ মামলা নিয়ে ওপেনএআইয়ের দেওয়া প্রকাশ্য বক্তব্যের জবাব দিচ্ছিলেন।
তখন বিচারক তাকে প্রস্তাব দিয়েছেন, “সবকিছু কি নতুন করে শুরু করা যায়? আজ থেকেই?” মাস্ক তাতে সম্মতি জানিয়ে বলেন, “হ্যাঁ।”
তবে এ অনুরোধ কেবল মাস্কের মধ্যেই সীমিত ছিল না। এরপর তিনি অল্টম্যান ও ব্রকম্যানকেও একইভাবে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “চলুন আমরা চেষ্টা করে দেখি, এভাবে আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারি কি না।”
গেল মার্চে মামলার এক প্রাক-শুনানিতে বিচারক রজার্স সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, এ মামলার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কোনো বিশেষ সুবিধা পাবেন না, কেবল বাস্তবতার খাতিরে তিনি কিছুটা নমনীয় হয়েছেন।
যেমন, মাস্ক ও অন্যান্যদের সাধারণ নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়েই যেতে হয় ঠিকই তবে তাদের জন্য ভবনের এমন এক প্রবেশপথ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষ ব্যবহার করেন না। ফলে আদালতের বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিক ও কৌতূহলী জনতার ভিড় তারা এড়াতে পারছেন।
এ ছাড়া, আজকাল এআই নিয়ে সবারই নানা মত থাকলেও বিচারক চেষ্টা করছেন আদালতের ভেতর যেন বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনা না ঢোকে।
একবার মাস্ক যখন এআই’কে ‘টার্মিনেটর’ সিনেমার সঙ্গে তুলনা করছিলেন তখন জুরিরা কক্ষ থেকে চলে যাওয়ার পর রজার্স মাস্ককে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “আপনি কেবল আপনার বক্তব্য দিয়েছেন। তবে বিষয়টি ওইটুকুই, এর বেশি কিছু নয়।”