Published : 08 May 2026, 03:23 PM
মাছির ক্ষিপ্রতা ও মস্তিষ্কের কর্মপদ্ধতি ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বড় ধরনের বিপ্লব আসতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকরা।
তাদের দাবি, এ প্রাকৃতিক কৌশলটি কাজে লাগিয়ে অটোনমাস গাড়ি ও রোবটকে আরও নির্ভুল ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এমন করে গড়ে তোলা সম্ভব, যা এআই দুনিয়ায় নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফলের মাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের ‘বিদ্যুৎ গতির’ ক্ষিপ্রতা স্বয়ংক্রিয় বা অটোনমাস গাড়ির মতো এআই ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ শেফিল্ড’-এর গবেষকরা মাছির মস্তিষ্ক ও চোখের কার্যপদ্ধতি বিশ্লেষণ করে ‘টার্বো বুস্ট’ এর মতো এক বিশেষ সক্ষমতার সন্ধান পেয়েছেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘হাই-ফ্রিকোয়েন্সি জাম্পিং’।
বিবিসি লিখেছে, এ বিশেষ গুণের কারণে পতঙ্গরা বিস্ময়কর গতিতে ও নিখুঁতভাবে যে কোনো পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
এ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রোবট ও অটোনমাস গাড়িগুলোকে আরও কার্যকর ও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী করে তোলা সম্ভব। এক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের জন্য এসব গাড়ি কেবল কম্পিউটারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের নড়াচড়াকে কাজে লাগিয়েই আশপাশের পরিস্থিতি বুঝতে পারবে।
‘স্কুল অফ বায়োসায়েন্সেস’-এর অধ্যাপক মিক্কো জুসোলা বলেছেন, “আমাদের এ গবেষণাটি মস্তিষ্ক কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করে সে সম্পর্কে প্রচলিত চিন্তাধারায় এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।”
এ গবেষণায় উঠে এসেছে, সাধারণ ঘরের মাছি বা ফলের মাছিরা কেবল নিষ্ক্রিয়ভাবে দৃশ্য দেখে না, বরং এদের দৃশ্যমান তথ্য প্রক্রিয়াজাতের পদ্ধতিটি আগের ধারণার চেয়ে বেশি সক্রিয় ও উন্নত।
কেবল জগতকে অবলোকন বা দেখার পরিবর্তে, কীটপতঙ্গরা যা দেখে এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের দেহকে অবিরাম কাঁপাতে বা স্পন্দিত করতে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অতি ক্ষুদ্র ও ঝাঁকুনিপূর্ণ নড়াচড়া, যেমন চোখের মণির দ্রুত স্পন্দন বা চলন যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্যাকাডস’ বলে তা এদের মস্তিষ্ককে আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ও দ্রুত তথ্য পেতে সহায়তা করে।
‘বিস্ময়কর গতি’
গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো পতঙ্গ তীক্ষ্ণভাবে মোড় নেওয়ার সময় এদের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও উচ্চ শক্তিতে বা ‘হায়ার গিয়ার’-এ চলে যায়।
অধ্যাপক জুসোলা বলেছেন, এমনটি পতঙ্গকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুতগতিতে ঘটে যাওয়া তথ্যের ওপর পূর্ণ মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।
এ বিশেষ মেকানিজম বা কার্যপদ্ধতিটি কীটপতঙ্গকে এদের শারীরিক ও স্নায়বিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে, যা না থাকলে এদের দেখার বা বোঝার সক্ষমতা সীমিত হত।
কীটপতঙ্গের এমন প্রাকৃতিক আচরণ এদের উচ্চ গতিতে ওড়া ও শিকারির আক্রমণ থেকে নিজেদের দ্রুত বাঁচানোর মতো কাজগুলোতে সহায়তা যোগায়।
গবেষণার প্রধান লেখক অধ্যাপক জুসোলা বলেছেন, “আমরা দেখেছি, অতি ক্ষুদ্র বিভিন্ন মস্তিষ্কও কীভাবে বিস্ময়কর গতিতে জটিল সব সমস্যার সমাধান করতে পারে।”
ড. জৌনি তাকালো বলেছেন, গতিবিধি ও অভিযোজনযোগ্য তথ্য প্রক্রিয়াকরণের এসব নীতি গ্রহণ করলে ভবিষ্যতের এআই সিস্টেম, বিশেষ করে রোবোটিক্স, অটোনমাসগাড়ি ও রিয়াল-টাইম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যাবে।
এ গবেষণার মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত বায়োফিজিক্যাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল মডেলটি তৈরির নেতৃত্ব দিয়েছেন তাকালো।
তিনি বলেছেন, “আমাদের এ প্রাপ্তি স্নায়বিক প্রক্রিয়াকরণের প্রচলিত বিভিন্ন মডেলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, যেখানে মনে করা হত তথ্য নির্দিষ্ট পথে চলে এবং এর মধ্যে কিছু সহজাত বিলম্ব থাকেই।
“এর পরিবর্তে, আমাদের ফলাফল নতুন এক কাঠামোর পথ দেখাচ্ছে, যেখানে দৃষ্টিশক্তি হচ্ছে পতঙ্গের নড়াচড়া, তার দেখার ইনপুট ও মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়ার সমন্বিত এক প্রচেষ্টা।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ সাময়িকীতে।