Published : 09 Jul 2025, 05:15 PM
উচ্চ রক্তচাপ সাধারণত হৃদরোগের সমস্যা হিসেবে পরিচিত হলেও নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, মানুষের ব্যক্তিত্ব, চিন্তাভাবনা ও অনুভূতি বা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে এটি।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ‘ডায়াস্টলিক প্রেশার’ বা রক্তচাপের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে ‘নিউরোটিসিজম’ নামের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের।
নিউরোটিসিজম এমন এক ধরনের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য, যেখানে মানুষ সাধারণত বেশি দুশ্চিন্তা করে, আবেগপ্রবণ বা মানসিক চাপ বেশি অনুভব করেন ও সহজেই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন।
গবেষকরা বলছেন, যারা বেশি ‘নিউরোটিক’ তারা সাধারণত বেশি দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ অনুভব করেন। পাশাপাশি সমালোচনাকে খুব সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। এ ধরনের মানুষদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যেমন উদ্বেগ বা বিষণ্নতায় ভোগার ঝুঁকিও বেশি থাকে।
গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, ডায়াস্টলিক রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যকেই সুরক্ষা দেয় না, বরং মানুষকে মানসিকভাবে আরও স্থিতিশীল রাখতে ও চাপের কারণে অতিরিক্ত ভেঙে পড়া ঠেকাতেও সাহায্য করতে পারে।
এ সম্পর্কটি বোঝার জন্য ‘মেন্ডেলিয়ান র্যান্ডমাইজেশন’ নামের এক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। এ পদ্ধতিতে মানুষের জিন বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, একটি স্বাস্থ্য সমস্যা সরাসরি আরেকটি সমস্যার কারণ হতে পারে কি না।
এ গবেষণায় রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন জিনগত বৈশিষ্ট্য মানুষের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত কি না তা খতিয়ে দেখেছেন গবেষকরা। কারণ, একজন মানুষের রক্তচাপের প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ জিনের কারণে হয়ে থাকে। কারণ ও ফলাফলের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না তা খুঁজে দেখতে গবেষকদের সাহায্য করেছে এ পদ্ধতি।
এজন্য ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মানুষের ওপর করা আটটি বড় গবেষণার জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করেছে গবেষক দলটি। তারা বলছেন, যাদের ডায়াস্টলিক রক্তচাপ বেশি তাদের মধ্যে নিউরোটিসিজম বা মানসিক অস্থিরতার মাত্রাও বেশি।
এ মানসিক অস্থিরতা বা নিউরোটিসিজমের সঙ্গে রক্তচাপের যে সম্পর্ক মিলেছে তা বিশেষভাবে ডায়াস্টলিক রক্তচাপ থেকে এসেছে, সিস্টলিক রক্তচাপ থেকে নয়। সিস্টলিক হচ্ছে এমন এক ধরনের রক্তচাপ, যা হৃদস্পন্দনের ফাঁকে হার্ট যখন বিশ্রামে থাকে তখন ধমনীতে যে চাপ পড়ে তা মাপে।
গবেষকরা বলছেন, রক্তচাপ সরাসরি উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার কারণ হয়– এমন কোনও শক্তিশালী প্রমাণ পাননি তারা। তবে নিউরোটিসিজম বা মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা করার প্রবণতার সঙ্গে রক্তচাপের স্পষ্ট সম্পর্ক মিলেছে। আর এ মানসিক অস্থিরতার সঙ্গে রক্তচাপের যে সম্পর্ক রয়েছে তার ৯০ শতাংশেরও জন্য দায়ী ডায়াস্টলিক চাপ।
এ ঘটনার কারণ এখনও পুরোপুরি বোঝা যায়নি। তবে বিজ্ঞানীদের অনুমান, হার্ট ও মস্তিষ্ক এ দুটির ওপরই প্রভাব ফেলে রক্তচাপ। যদি ডায়াস্টলিক রক্তচাপ দীর্ঘ সময় ধরে খুব বেশি থাকে তবে তা মস্তিষ্কের কাজে প্রভাব ফেলতে পারে। যার কারণে মানুষ মানসিকভাবে বেশি সংবেদনশীল বা চাপ অনুভব করতে পারেন।
গবেষকরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ কেবল হার্টের জন্যই খারাপ নয়, বরং এটি মানুষকে আরও বেশি নেতিবাচক চিন্তা করতে ও চাপের প্রতি বেশি সংবেদনশীল বা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ সংযোগের আরেকটি দিকও আছে। যারা বেশি নিউরোটিক তারা সাধারণত বেশি সময় ধরে চাপ বা উদ্বেগ অনুভব করেন, যা রক্তচাপ বাড়াতে পারে। এতে এমন এক চক্র তৈরি হয়, যেখানে উচ্চ রক্তচাপ আর মানসিক চাপ একে অপরকে প্রভাবিত করে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য দুটোকেই খারাপ করে তোলে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা কেবল হৃদরোগের জন্য নয়, মনের জন্যও উপকারী। ডায়াস্টলিক রক্তচাপকে স্বাস্থ্যকর মাত্রায় রাখা আপনাকে মানসিকভাবে আরও স্থিতিশীল, কম উদ্বিগ্ন ও নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘জেনারেল সাইকিয়াট্রি’তে।
গবেষকরা বলছেন, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত তা নিয়ে চিন্তাভাবনার নতুন এক পথ খুলে দিয়েছে এ গবেষণা। একটির যত্ন নিলে সঙ্গে সঙ্গে অন্যটিরও যত্ন নেওয়া হয়ে যায়।