Published : 30 May 2026, 03:57 PM
ছায়াপথ তৈরি হওয়ার আগেই তৈরি এক সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের সন্ধান পেয়েছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ, যার মাধ্যমে মহাবিশ্বের আদি ও বিস্ময়কর এক ব্ল্যাক হোলের সরাসরি ভর পরিমাপ করেছেন বিজ্ঞানীরা।
এ আবিষ্কার ব্ল্যাক হোল তৈরি ও বিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানের বহু বছরের প্রচলিত ধারণা এবং সমীকরণকে সম্পূর্ণ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
সাধারণত ব্ল্যাক হোল এর আশপাশের ছায়াপথের উপাদান গিলে নিজের আকার বড় করে, যার আগে একটি তারা পতনের মধ্য দিয়ে যায়। তবে এ ব্ল্যাক হোলটির ক্ষেত্রে তেমন কোনো ধাপের মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রমাণ মেলেনি।
এ মহাজাগতিক ঘটনা নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণার সহ-লেখক, ‘কেমব্রিজ ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরি’ ও ‘কাভলি ইনস্টিটিউট ফর কসমোলজি’র অধ্যাপক রবের্তো মাইওলিনো বলেছেন, “ব্ল্যাক হোল কীভাবে তৈরি ও বড় হয় সেই প্রচলিত বিভিন্ন ধারণাকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে এ আবিষ্কার।”
কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণা ছিল, কোনো একটি ছায়াপথের ভেতরে থাকা বড় বড় তারার আয়ু শেষ হলে সেগুলোর পতন ঘটে এবং সেই প্রক্রিয়ায় এরা আশপাশের উপাদানগুলো গিলে খেতে শুরু করে ও ব্ল্যাক হোলের জন্ম হয়।
তবে এখন বিজ্ঞানীরা এমন ব্ল্যাক হোলের প্রমাণ পেলেন, যা আমাদের সূর্যের চেয়ে লাখ লাখ গুণ বড় এবং আশপাশের পরিবেশের ওপর কোনো ধ্বংসযজ্ঞ বা সবকিছু গিলে খাওয়া না চালিয়েই বেশ দ্রুত বড় হয়ে উঠছে।
Researchers have made the first direct mass measurement of a black hole in the early universe using #NASAWebb. The supermassive black hole in Abell2744-QSO1 seems to predate its galaxy and may have formed within the first second after the big bang: https://t.co/TiRs3ZBBnq pic.twitter.com/8fuiVQYYEV
— Space Telescope Science Institute (@SpaceTelescope) May 27, 2026
গবেষকেরা ‘লিটল রেড ডট কিউএসও১’ নামের এক মহাজাগতিক বস্তুর ওপর বিশদ পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন। এসব ছোট লাল বিন্দুগুলোর বেশিরভাগই আদি মহাবিশ্বের ঘন গ্যাসে ঘেরা একেকটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল।
এসব ছোট লাল বিন্দু সম্ভবত বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের কেবল ৭০ কোটি বছর পর তৈরি হয়েছিল। অথচ এতদিন ভাবা হত, একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল তৈরি হতে অন্তত ১০০ কোটি বছর লাগে।
এ মহাজাগতিক বস্তুটি আমাদের সূর্যের চেয়ে চার কোটি গুণ বড় এবং পৃথিবী থেকে এক হাজার তিনশ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এর মাধ্যমে বিগ ব্যাংয়ের পর প্রথম একশ কোটি বছরের মধ্যে থাকা কোনো ব্ল্যাক হোলের ভর বা ভরসংখ্যা প্রথমবারের মতো সরাসরি পরিমাপ করা সম্ভব হল।
জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ বছরের পর বছর ধরে এসব আদিম ব্ল্যাক হোলের সম্ভাব্য প্রমাণ পেয়ে আসছে। তবে এত দিন পর্যন্ত কোনো সরাসরি পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি।
এর কারণ, ‘কিউএসও১’কে ঘিরে থাকা বিভিন্ন গ্যাসের মধ্যে একটি ‘কেপ্লেরিয়ান আবর্তন’ রয়েছে, অর্থাৎ আমাদের সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ যেভাবে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে এসব গ্যাসও ঠিক একইভাবে একটি কেন্দ্রবিন্দুকে ধরে আবর্তিত হচ্ছে। কেপ্লেরিয়ান গতি সাধারণ মহাকর্ষ সূত্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় বলে বিষয়টি এ ব্ল্যাক হোলটির ভর নিখুঁতভাবে হিসাব করার সুযোগ করে দিয়েছে।
গবেষক ইগনাস জুওদবালিস বলেছেন, “এ আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, ‘কিউএসও১’ এর বেশিরভাগ ভরই কেন্দ্রের ব্ল্যাক হোলটিতে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। ভর যদি আশপাশে আরও ছড়িয়ে থাকত, যেমনটা বেশি তারা থাকলে হয় তবে এ গ্যাসের মধ্যে এমন নিখুঁত কেপ্লেরিয়ান আবর্তন দেখা যেত না।”
এ গবেষণার সহ-লেখক ড. ফ্রান্সেস্কো ডি’ইউজেনিও বলেছেন, “এর আগে, আদি মহাবিশ্বের বিভিন্ন ব্ল্যাক হোলের ভরের যত পরিমাপ হয়েছে, তার সবগুলোই ছিল পরোক্ষ। এমনটা করা হয়েছিল আমাদের কাছাকাছি থাকা মহাবিশ্বের ব্ল্যাক হোলগুলো সম্পর্কে আমরা যা জানি, সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করে।”
এ ধরনের আবিষ্কার কি বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পুরো ধারণাটাকেই নাকচ করে দেয় কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিষয়টি আসলে এমন নয়।
হ্যাঁ, জেমস ওয়েব অবশ্যই এমন কিছু সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের সন্ধান পেয়েছে, যা বিগ ব্যাংয়ের খুব বেশি দিন পর তৈরি হয়নি তবে এ গল্পের পেছনে আরও কারণ থাকতে পারে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলেস’ বা ইউসিএলএ-এর জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিয়েছেন, ডার্ক ম্যাটার হয়ত এ নির্দিষ্ট জটিল ধাঁধার সমাধান করতে পারে।
এর কারণ, ডার্ক ম্যাটার ক্ষয় হতে শুরু করলে তাত্ত্বিকভাবে ধরে নেওয়া হয় সেখান থেকে নির্গত বিভিন্ন ফোটন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যা ব্ল্যাক হোল গঠনের পুরো প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
এ সময় আশপাশের হাইড্রোজেন গ্যাস এতটাই গরম হয়ে যায় যে, মহাকর্ষ বলের টানে তা বড় মেঘের আকার ধারণ করে। এসব মেঘ আমরা সাধারণত যেভাবে দেখি তার চেয়ে অনেক দ্রুত সংকুচিত হয়ে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলে পরিণত হতে পারে।
এ পুরো বিষয়টিই এখনও একেবারেই তাত্ত্বিক। ডার্ক ম্যাটারের আসলেই কোনো অস্তিত্ব আছে কি না তা নিশ্চিতভাবে জানা নেই। ফলে এর গঠন কেমন সে সম্পর্কেও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
তবে সমীকরণ মেলাতে ও হিসাব-নিকাশ কষতে বিজ্ঞানীদের এমন কিছুর সাহায্য প্রয়োজন। সেসব বৈজ্ঞানিক হিসাব-নিকাশ এ ঘটনার পেছনের মূল হোতা হিসেবে ডার্ক ম্যাটারকেই নির্দেশ করছে।