Published : 14 Jul 2026, 05:06 PM
ইউরোপের শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব সংক্রান্ত উদ্বেগজনক এক প্রতিবেদনের জেরে প্ল্যাটফর্মগুলোতে শিশুদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ বা সীমিত করার পদক্ষেপ নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ।
সোমবার সংবাদ সম্মেলনে ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেছেন, শিশুদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশ রক্ষায় তারা শিগগিরই বয়স-উপযোগী নিষেধাজ্ঞা নিয়ে একটি প্রস্তাবনা পেশ করতে যাচ্ছেন।
অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ এমন আইন পাশ করেছে। তবে ইউরোপের ২৭টি দেশের এ জোট আইনটি পাস করলে তা বিশ্বের ইতিহাসে শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ওপর সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞা হবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
প্রায় ৪৫ কোটি মানুষের এই ব্লকে অনূর্ধ্ব-১৮ বছর বয়সি জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ।
কমিশনের প্রেসিডেন্ট লেয়েন বলেছেন, “বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বয়স-উপযোগী নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন। বিষয়টি এমন নয় যে, শিশুরা সামজিক মাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে কি না, বরং আসল বিষয় হচ্ছে সামাজিক মাধ্যম কখন ও কীভাবে আমাদের শিশুদের নাগাল পাবে।”
শিশু মনস্তত্ত্ববিদ ড. ইয়র্গ এম ফেগার্ট ও মহামারী বিশেষজ্ঞ ড. মারিয়া মেলচিওরের তৈরি করা ওই উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে কিছু আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ইউরোপজুড়ে শিশুরা বর্তমানে দৈনিক ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা সামাজিক মাধ্যমে ব্যয় করছে। ফলে প্রায় ৬০ শতাংশ শিশুরই সামাজিক-আবেগীয় বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং তারা ঘুম ও মনোযোগের সমস্যাসহ বিষণ্নতা ও চরম উদ্বেগের মতো মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে।
এ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা ইইউ’কে বেশ কিছু কঠোর সুপারিশ করেছেন। যেমন, ১৩ বছরের কম বয়সিদের মা-বাবা বা শিক্ষকের তত্ত্বাবধান ছাড়া সামাজিক মধ্যম ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা।
১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের জন্য অবিরাম স্ক্রলিংয়ের ফিচার বন্ধসহ বিশেষ নিরাপত্তা ফিচারওয়ালা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অনুমতি। তিন বছরের কম বয়সিদের টডলার বা একদম ছোট শিশুদের জন্য সব ধরনের স্ক্রিন টাইম পুরোপুরি বন্ধ রাখা।
বিশ্বজুড়ে শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ বা সীমিত করার প্রবণতা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার পর ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনের মতো দেশও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে।
এর আগে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য ১৪ বছরের কম বয়সিদের জন্য মা-বাবার অনুমতি ছাড়া সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।
সমালোচকরা বলছেন, বয়স লুকিয়ে বা ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে শিশুরা সহজেই এ নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে পারে। এ ফাঁকি বন্ধ করতে অস্ট্রেলিয়া সরকার সম্প্রতি তাদের ন্যূনতম বয়সসীমা আইন লঙ্ঘনকারী সামাজিক মধ্যম কোম্পানিগুলোর সর্বোচ্চ জরিমানা দ্বিগুণ করে ৯ কোটি ৯০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার করার ঘোষণা দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইউরোপে এ ধরনের আইন কার্যকর করতে হলে জোটের ২৭টি দেশেরই সম্মতি ও দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হবে, যা বেশ সময়সাপেক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের এ নতুন প্রতিবেদনটিকে বড় পরিবর্তনের মুহূর্ত বা ‘টিপিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, “আমরা যত বেশি জানতে পারছি এবং শিশুদের ওপর এর প্রভাব যত বেশি দেখছি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ‘শুরুর বয়স’ নির্ধারণের যুক্তি ততটাই জোরালো হচ্ছে।”
ইইউ কমিশন এখন এ প্রতিবেদন ও এর সুপারিশগুলো পর্যালোচনা এবং আগামী গ্রীষ্মের পর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা পেশ করবে।