Published : 27 Apr 2026, 03:20 PM
অনেকের কাছে যা সাধারণ শব্দ কারো কাছে তা-ই হতে পারে প্রচণ্ড যন্ত্রণার কারণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, উচ্চ শব্দ কেবল বিরক্তিই বাড়ায় না, বরং তা সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কের গঠন ও চেতনার ওপর প্রভাব ফেলে।
আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্স প্রতিবেদনে লিখেছে, কারো যদি কখনো কোনো সহকর্মীর কিবোর্ড টাইপের শব্দে প্রচণ্ড রাগ হয় বা দূরে বেজে ওঠা সাইরেনের শব্দে বুক ধড়ফড় করে ওঠে তবে তিনি হয়ত শব্দ সংবেদনশীলতা বা ‘নয়েজ সেনসিটিভিটি’র সমস্যায় ভুগছেন।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এমন বিষয় কোনো সাধারণ বিরক্তি নয়, বরং মস্তিষ্কের বিশেষ গঠন বা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে।
‘কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটি’র সহকারী অধ্যাপক ড. ক্রিস্টিনা বাউড্রি বলেছেন, “শব্দের প্রতি এ অতি-সংবেদনশীলতার কারণে মানুষের মধ্যে শারীরিক, মানসিক ও আবেগীয় নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তীব্র সমস্যার ক্ষেত্রে, প্রতিদিনের সাধারণ শব্দগুলোও মানুষের কাছে যন্ত্রণাদায়ক মনে হয়।”
ড. বাউড্রি বলেছেন, শব্দ সংবেদনশীলতা মানে কেবল কাঁচ ভাঙার মতো বিকট শব্দে অস্বস্তি বোধ করা নয়, বরং কারো আশপাশের এমন কিছু সাধারণ শব্দের প্রতি নিয়মিত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখানো, যা সাধারণত ক্ষতিকর নয়। এ সমস্যা কারো সচেতনতা বা মানসিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেক সময় খুব মৃদু শব্দের প্রতিও শরীর বা মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। যেমন, কারো চিবিয়ে খাওয়ার শব্দ, টোকা দেওয়ার শব্দ, টাইপিং বা ক্লিক করার মতো বারবার তৈরি শব্দগুলো কোনো ব্যক্তির মধ্যে প্রচণ্ড রাগ, উদ্বেগ বা ঘৃণার জন্ম দিতে পারে, যা অন্যদের কাছে অতিরঞ্জিত বা ‘ওভাররিঅ্যাকশন’ বলে মনে হয়।
‘অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি’র মনোবিজ্ঞান ও নিউরোসায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক ড. ড্যানিয়েল শেফার্ড বলেছেন, একটি শব্দ তখনই ‘নয়েজ’ হয়ে ওঠে যখন তা কারো কাজে বাধা দেয়। যেমন বিশ্রাম, ঘুম বা চিন্তাভাবনার ব্যাঘাত ঘটায় বা, যখন কোনো শব্দ আপনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির প্রত্যাশার বাইরে হয়।
যেমন, আপনি যদি কোনো স্পা’তে বসে শান্ত সংগীত শোনেন এবং হঠাৎ একটি বিকট শব্দ, যেমন কিছু ভেঙে পড়ার শব্দ শুনতে পান এক্ষেত্রে ওই সংগীত ‘নয়েজ’ নয় তবে হঠাৎ হওয়া শব্দটি ‘নয়েজ’ হয়ে ওঠে। কারণ সেখানে এমন শব্দ তার কাছে অপ্রত্যাশিত।
“শব্দ-সংবেদনশীল ব্যক্তিদের খুব সাধারণ শব্দকেও নয়েজ হিসেবে দেখার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কারণ এসব শব্দ সহজেই তাদের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে, তারা ওইসব শব্দের প্রতি দ্রুত নেতিবাচক বা বিরক্তিকর আবেগ প্রকাশ করে ফেলেন।”
সব মানুষই বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে শব্দের প্রতি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়, যেমন ঘুমানোর সময় প্রতিবেশী ঘাস কাটার মেশিন চালালে তা কারো কাছে বিরক্তিকর হওয়াটাই স্বাভাবিক।
তবে ড. শেফার্ড বলেছেন, শব্দ-সংবেদনশীল হওয়া মানে কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দে প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, বরং যে কোনো শব্দের প্রতি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখানোর একটি প্রবণতা।
ড. বাউড্রি বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকার ফলে মানুষের মধ্যে এ সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে, যেমন নির্মাণকাজ বা সংগীত জগতে দীর্ঘদিন কাজ করা। এ ছাড়া মাথায় কোনো আঘাত পাওয়ার ফলেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।
“কিছু ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি ‘হাইপারঅ্যাকিউসিস’ নামের বিরল সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এ পরিভাষাটি দিয়ে প্রতিদিনের সাধারণ শব্দের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা বা শব্দ সহ্যের সক্ষমতা কমে যাওয়াকে বোঝানো হয়।
“হাইপারঅ্যাকিউসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কেবল শব্দের প্রতি সংবেদনশীলই হন না, বরং অন্যদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয় এমন শব্দ শুনলেও তারা কানে ব্যথা, চাপ বা অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন।”
মানুষের মধ্যে ‘ফনোফোবিয়া’ বা শব্দ-ভীতিও তৈরি হতে পারে, যা নির্দিষ্ট কিছু শব্দ মানুষের মধ্যে ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ বা লড়াই করো নয়ত পালাও ধরনের মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ বা আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ যখন কোনো বিপদ টের পায় তখন তা এ প্রতিক্রিয়াটি চালু করে দেয়।
এতে শরীর থেকে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়, হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং পেশিতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। জীবন বাঁচানোর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মস্তিষ্ক তখন এর যৌক্তিক চিন্তাভাবনা বন্ধ করে দিয়ে ইন্দ্রিয়গুলোকে সজাগ করে তোলে।
‘অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অডিওলজি’র সহযোগী অধ্যাপক ড. ডেভিড ওয়েলচ বলেছেন, এ ধরনের মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া স্বল্প সময়ের জন্য উপকারী। কারণ, আমাদের শোনার সক্ষমতা টিকে থাকার লড়াইয়ের মাধ্যমেই বিবর্তিত হয়েছে। যেমন, শিকারি প্রাণীর এগিয়ে আসার মতো বিপজ্জনক শব্দ শনাক্ত করা আমাদের পূর্বপুরুষদের বেঁচে থাকার জন্য জরুরি ছিল।
তবে ওয়েলচ বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। ড. শেফার্ডের সঙ্গে লেখা তার এক গবেষণা প্রবন্ধে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, বিষণ্নতা বা উদ্বেগের মতো সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
ড. শেফার্ড বলেছেন, যারা আশপাশের অপ্রয়োজনীয় শব্দ এড়িয়ে চলতে পারেন তাদের মস্তিষ্ক অপ্রাসঙ্গিক বিভিন্ন তথ্য ছেঁকে ফেলার ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে বেশি দক্ষ। ফলে তারা খুব দ্রুত বিরক্ত বা দিশেহারা হন না।
এ ধরনের ব্যক্তিদের স্নায়ুতন্ত্র সাধারণত শান্ত থাকতে বেশি কার্যকর, যার ফলে বিশ্রাম নেওয়ার সময় তাদের হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি কম থাকে। সহজ কথায়, মানুষের মস্তিষ্কের ‘নয়েজ ফিল্টার’ যত ভালো হবে তার দেহ মানসিক চাপের পরিস্থিতিতে তত বেশি শান্ত থাকতে পারবে।
ড. শেফার্ড বলেছেন, “এমনটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয় যে, অধিকাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যেমন উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা সিজোফ্রেনিয়া এবং মস্তিষ্কের আঘাতের সঙ্গে কেবল দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়াই জড়িত নয়, বরং এগুলোর সঙ্গে শব্দ-সংবেদনশীলতারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অটিজমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।”
ড. বাউড্রি বলেছেন, যদি কারো শব্দ-সংবেদনশীলতা থাকে তবে তার চিকিৎসায় ‘সাউন্ড থেরাপি’ ব্যবহার করা যেতে পারে।
এ পদ্ধতিতে হালকা ও আরামদায়ক শব্দ ব্যবহৃত হয়, যাতে মানুষের শোনার বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ধীরে ধীরে প্রতিদিনের পরিবেশের শব্দে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো কমিয়ে দেয়।
“এর মূল লক্ষ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের প্রতি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়াকে নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়া। জটিল ক্ষেত্রে ‘কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি’ বা অন্যান্য কাউন্সেলিং পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, যাতে শব্দজনিত কষ্ট কমানো যায়।
“এসব পদ্ধতিতে ‘মাইন্ডফুলনেস’ বা সচেতনতা এবং ধীরে ধীরে শব্দের সংস্পর্শে আসার মতো কৌশল ব্যবহৃত হয়, যা বিরক্তিকর শব্দের প্রতি নেতিবাচক আবেগ কমাতে সাহায্য করে।”