Published : 19 Jun 2026, 02:13 PM
ইউটিউব প্রিমিয়ামের ক্রমাগত খরচের কারণে অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন যে আসলেই প্লাটফর্মটি অর্থ দিয়ে ব্যবহারের যোগ্য কি না। তবে স্রেফ বিজ্ঞাপন এড়ানো ছাড়াও এ সেবায় রয়েছে এমন কিছু লুকানো ও আধুনিক ফিচার, যা সঠিকভাবে কাজে লাগালে পয়সার পুরোটাই তুলে নেওয়া সম্ভব।
ইউটিউব প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশনটির সঙ্গে থাকা বাড়তি বিভিন্ন সুবিধার মধ্যে রয়েছে ভিডিও দেখার মান কিছুটা উন্নত করা থেকে শুরু করে নানা বিষয়। ব্যবহারকারী কত অর্থ দিচ্ছেন তার ওপরেও বিষয়টি নির্ভর করে। কারণ অনেক সময় অন্য পণ্য বা সেবার সঙ্গে প্যাকেজ হিসেবে এতে ছাড় মেলে।
ইউটিউব ‘প্রিমিয়াম লাইট’ নামে সাশ্রয়ী সংস্করণও এনেছে, যেখানে মাসে ৯ ডলারের বিনিময়ে কিছু সুবিধা বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এ প্রতিবেদনটি প্রযুুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট ইউটিউব প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন সেবাটি নিয়েই তৈরি করেছে, যার খরচ শুরু হয় মাসে প্রায় ১৬ ডলার থেকে।
ইউটিউব প্রিমিয়াম থেকে কীভাবে পুরো পয়সা উসুল করা যায় তারই কয়েকটি উপায় নিচে দেওয়া হল–
‘ইউটিউব প্রিমিয়াম’ অফার খুঁজুন
ব্যবহারকারী যদি নতুন স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট কেনার কথা ভেবে থাকেন তবে এর সঙ্গে কোনো ইউটিউব প্রিমিয়ামের অফার বা ক্রেডিট মিলছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখুন। নির্দিষ্ট কিছু দোকানে কেনাকাটার সময় বা নির্দিষ্ট কোনো মোবাইল অপারেটরের সংযোগ নেওয়ার সময়ও একই কথা প্রযোজ্য।
অনেক পণ্য ও সেবার সঙ্গেই এখন বেশ কয়েক মাসের জন্য বিনামূল্যে ইউটিউব প্রিমিয়াম ব্যবহারের সুযোগ বা অফার দেওয়া হয়। নিজের কেনাকাটার ধরন বুঝে চললে ব্যবহারকারী হয়ত কোনো সাবস্ক্রিপশন ফি না দিয়েই দীর্ঘদিন এই সেবা উপভোগ করতে পারবেন।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় অফারগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘গুগল ফাই’-এর সংযোগ, যেখানে পুরো ছয় মাসের জন্য বিনামূল্যে গুগল প্রিমিয়াম বা ইউটিউব প্রিমিয়াম পাবেন। গুগলের মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরের ‘আনলিমিটেড প্রিমিয়াম’ প্ল্যানের নতুন সাবস্ক্রিপশনের সঙ্গে এ সুবিধাটি দেওয়া হচ্ছে।
গুগল নিজেদের নতুন ‘পিক্সেল ১০এ’ স্মার্টফোন কেনার ওপরও বর্তমানে তিন মাসের ফ্রি অফার দিচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী একাধিক অফার একসঙ্গে জুড়ে নিতে পারেন। তবে এর জন্য বিভিন্ন শর্তাবলী ভালো করে পড়ে নেওয়া উচিত। কারণ, পিক্সেল ফোনের অফারটির শর্তে স্পষ্ট বলা আছে, এটি কেবল নতুন ইউটিউব প্রিমিয়াম গ্রাহকদের জন্যই প্রযোজ্য।
ইউটিউব বলেছে, এসব ফ্রি অফারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ব্যবহারকারী সাবস্ক্রিপশন চালু রাখলে বা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সাবস্ক্রিপশন বাতিল করে দিলে কোনো বাড়তি জরিমানা গুণতে হয় না। ব্যবহারকারী যদি অফার শেষ হওয়ার পরও সেবাটি চালু রাখেন তাহলেও তার সার্বিক খরচ অনেকটাই কমে যাচ্ছে।
ইউটিউব মিউজিক-এর সুবিধা
ব্যবহারকারী যদি সচল ইউটিউব প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন থাকে তবে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ‘ইউটিউব মিউজিক’ ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছেন। কেউ যদি স্পটিফাই বা অ্যাপল মিউজিকের মতো অন্য কোনো আলাদা মিউজিক সার্ভিসের জন্য অর্থ দিয়ে থাকেন তবে কিছু অর্থ বাঁচানোর জন্য একবার ইউটিউব মিউজিক ব্যবহার করে দেখতে এবং অন্যান্য মিউজিক সাবস্ক্রিপশন বাতিল করতে পারেন।
ইউটিউবে আগে গান শোনার সেই ইতিহাস থাকার কারণে ইউটিউব মিউজিক শুরু থেকেই ব্যবহারকারীর পছন্দ-অপছন্দ বেশ ভালোভাবেই ধরে নিতে পারবে। কারো কাছে যদি নিজের সংগ্রহে থাকা অডিও ফাইলের বড় লাইব্রেরি থাকে তবে পথ চলতে চলতে সেগুলো শোনার জন্য ইউটিউব মিউজিক চমৎকার মাধ্যম।
কম্পিউটার থেকে সরাসরি ব্রাউজারভিত্তিক অ্যাপে বিভিন্ন গান ‘ড্র্যাগ’ করে ছেড়ে দিতে পারেন। একবার আপলোড ও প্রসেস হয়ে গেলে যে কোনো ডিভাইসে ব্যবহারকারীর নিজস্ব লাইব্রেরিতে সেগুলো চলে আসবে। অ্যাপল মিউজিকের মতো অন্যান্য সার্ভিসে লোকাল ফাইল আপলোডের সুবিধা থাকলেও ইউটিউব মিউজিকের মোবাইল অ্যাপে একটি সুবিধাজনক ‘আপলোডস’ ট্যাব রয়েছে। ফলে স্ট্রিম করা গানের লাইব্রেরি থেকে নিজের ব্যক্তিগত গানের সংগ্রহকে আলাদা রাখা যায়।
অফলাইন ডাউনলোডের সুবিধা
ইউটিউব প্রিমিয়ামের আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল অ্যাপের পাশাপাশি ব্রাউজারভিত্তিক ডেস্কটপ সংস্করণেও অফলাইনে দেখার জন্য ভিডিও জমা রাখা যায়। ব্যবহারকারীর যদি আনলিমিটেড মোবাইল ডেটা ও ভালো নেটওয়ার্ক থাকে তবে এমনটা করতে পারেন।
ব্যবহারকারী যদি নিয়মিত প্লেন, সাবওয়ে বা পাতাল রেলে যাতায়াত করেন বা এলাকায় নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকে তবে এ সুবিধাটি দারুণ কাজে আসবে। ওয়াই-ফাই বা ফোরজি/ফাইভজি মোবাইল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগ থাকা অবস্থায়, যে কোনো ভিডিওর পাশে থাকা থ্রি-ডট মেনু থেকে ভিডিও ডাউনলোড করে নিতে পারেন।
ডাউনলোড করা এসব ভিডিও দেখতে অ্যাপের নিচে ডানদিকের ‘ইউ’ ট্যাবে ট্যাপ করে ‘ডাউনলোডস’ অপশনটি বেছে নিন। এরইসঙ্গে সম্পৃক্ত আরেকটি ফিচার হচ্ছে ‘স্মার্ট ডাউনলোডস’। ব্যবহারকারী যখনই ওয়াই-ফাইয়ের সঙ্গে যুক্ত হবেন ইউটিউবের অ্যালগরিদম তার পছন্দ অনুসারে যেসব ভিডিও দেখাবে এবং এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাউনলোড করে দেবে।
ডাউনলোড করা কোনো ভিডিও দেখা শেষ হয়ে গেলে, ডিভাইসের স্টোরেজ খালি করার জন্য অ্যাপটি নিজে থেকেই তা মুছে দেয়। প্রিমিয়াম গ্রাহকদের জন্য ‘স্মার্ট ডাউনলোডস’ ফিচারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চালু থাকে, যা অনেক ব্যবহারকারীর বিরক্তির কারণ হতে পারে। ফলে অ্যাপের সেটিংস মেনুর ‘ডাউনলোডস’ সেকশনে গিয়ে ফিচারটি সহজেই বন্ধ করে রাখা যায়।
ইউটিউবকে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ’ হিসেবে ব্যবহার করুন
ইউটিউব প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশনের সবচেয়ে দরকারী সুবিধাগুলোর একটি ‘ব্যাকগ্রাউন্ড প্লে’। সাধারণত আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েডের সাধারণ ইউটিউব অ্যাপ থেকে বের হয়ে গেলে ভিডিও বন্ধ হয়ে যায়। তবে ব্যবহারকারী যদি ইউটিউব প্রিমিয়াম থাকে তবে ফোন বা ট্যাবলেটে অন্য কাজ করার সময়ও ব্যাকগ্রাউন্ডে ভিডিওর অডিও বা শব্দ সচল থাকবে।
কিছুদিন আগেও ফ্রিতে এ সুবিধা পাওয়ার চতুর উপায় ছিল, যেমন ক্রোম বা অন্য ব্রাউজারে ইউটিউব চালানো। তবে গুগল এ বছরের শুরুতে সেই সুযোগটি পুরোপুরি বন্ধ করেছে।
যারা পডকাস্ট শুনতে ভালোবাসেন তাদের জন্য ব্যাকগ্রাউন্ড প্লে ফিচারটি দারুণ কাজের, বিশেষ করে ব্যবহারকারী যদি ভিডিওর দিকে না তাকিয়ে থালা-বাসন ধোয়ার মতো ঘরের কাজের সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে নিজের প্রিয় বক্তাদের কথা শুনতে চান তবে ফিচারটি বেশ সুবিধাজনক।
তবে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের ব্যাটারি সাশ্রয় করার কঠোর নিয়মের কারণে বেশি চার্জ শেষ করা ইউটিউব অ্যাপটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকা অবস্থায় সিস্টেম প্রায়ই সবার আগে বন্ধ করে দেয়। ফলে ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকা ভিডিওটি হঠাৎ থেমে যেতে পারে, যা ঠেকাতে ব্যবহারকারীকে আবার অ্যাপটি খুলে প্লে বাটন চাপতে হবে।
ফ্রি ব্যবহারকারীদের আগেই নতুন ফিচারগুলো ব্যবহার করুন
যারা পকেট থেকে অর্থ খরচ করে ইউটিউব প্রিমিয়াম কেনেন তারা ইউটিউবের বিভিন্ন পরীক্ষামূলক ও বিটা সংস্করণের বিভিন্ন ফিচার সবার আগে ব্যবহারের সুযোগ পান। এসব ফিচারের বেশিরভাগই এআই সম্পর্কিত। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের বেছে নেওয়ার জন্য একমাত্র ফিচার গুগলের জেমিনাই এআই মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘আস্ক ইউটিউব’ সার্চ মোড।
এপ্রিলে ইউটিউব প্রিমিয়াম ব্যবহারকারীদের জন্য ‘অটো স্পিড’ ফিচারটি চালু করেছে। দীর্ঘ ভিডিওগুলোর প্লেব্যাক স্পিড বা গতি বাড়িয়ে দেখার অভ্যাস থাকলে এ ফিচারটি ব্যবহারকারী জন্য গেইম-চেঞ্জার হতে পারে, যা ভিডিওর গতি ঢালাওভাবে নির্দিষ্ট হারে না বাড়িয়ে ভিডিওতে কী ঘটছে তার ওপর ভিত্তি করে গতি পরিবর্তন করে।
প্রিমিয়াম ব্যবহারকারীদের জন্য আরেকটি চমৎকার ফিচার হচ্ছে ‘জাম্প অ্যাহেড’ নামের বাটন। ভিডিও ১০ সেকেন্ড স্কিপ করার জন্য ব্যবহারকারী যখন স্ক্রিনে ডাবল ট্যাপ করবেন তখন প্লেয়ারের নিচে ডান কোণায় এ বাটনটি ভেসে উঠবে, যেখানে ট্যাপ করলে ভিডিওটি সরাসরি সেই অংশে চলে যাবে, যেখানে বেশিরভাগ দর্শক স্কিপ করে চলে গেছেন। ফলে ব্যবহারকারী খুব সহজেই স্পনসরড বা বিজ্ঞাপনী অংশগুলো এড়াতে পারবেন, যা তার ভিডিও দেখার অভিজ্ঞতাকে সত্যিকার অর্থেই বিজ্ঞাপনমুক্ত করে তুলবে।
নিন্দুকেরা ইউটিউব প্রিমিয়ামকে কেবল ‘বিজ্ঞাপন থেকে বাঁচতে অর্থ দেওয়ার ফাঁদ’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও এসব ফিচারের মাধ্যমেই পয়সা উসুল করা সম্ভব।