Published : 27 Mar 2026, 10:37 AM
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি ও আসক্তি তৈরির দায়ে মেটা ও গুগলকে মোটা অংকের জরিমানা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের এক আদালত। ঐতিহাসিক রায়কে দেখা হচ্ছে টেক জায়ান্টদের জন্য বড় ধাক্কা হিসাবে।
বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য ‘গেইম চেঞ্জিং’ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যতে ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব ব্যবহারের ধরনে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে আসলেই কি এ রায় টেক জায়ান্টদের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটাবে?
বিবিসি লিখেছে, বৃহস্পতিবার লস অ্যাঞ্জেলেসের এক জুরি বোর্ড বিশ্বের দুটি জনপ্রিয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে কঠোর রায় দিয়েছে।
আদালতের রায়ে উঠে এসেছে, এসব অ্যাপ আসক্তি তৈরি করে ও সেভাবেই এগুলো তৈরি করা হয়েছে। শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এসব অ্যাপের মালিকপক্ষ চরম অবহেলা করেছে।
সিলিকন ভ্যালির জন্য এটি এক বিষাদময় মুহূর্ত ও এর প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে। এ মামলার কেন্দ্রে থাকা কেইলি নামের তরুণীকে ৬০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মেটা ও গুগলকে।
কেইলির দাবি, এসব প্ল্যাটফর্ম তাকে শারীরিক হীনম্মন্যতা, বিষণ্নতা ও নিজের জীবনাবসানের মতো চিন্তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তবে উভয় কোম্পানিই এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পরিকল্পনা করছে।
মেটার দাবি, টিনএজারদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের জন্য এককভাবে কোনো অ্যাপকে দায়ী করা যায় না। অন্যদিকে গুগল বলছে, ইউটিউব কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়।
‘জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি’র আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মেরি ফ্র্যাঙ্কসের মতে, এ রায়ের মানে হচ্ছে ‘অব্যাহতির দিন শেষ’। সামাজিক মাধ্যমের জন্য আদালতের এ রায়কে বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে আদালতের এ রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য কতটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
সামনে যাই ঘটুক না কেন নিশ্চয়ই উচ্চ আদালতে আপিল হবে এবং আরও আইনি প্রক্রিয়া চলবে। তবে এই রায় পুরো চিত্রটি বদলে দিতে পারে। বর্তমানে মানুষ যেভাবে সামাজিক মাধ্যমকে চেনেন তার শেষ পর্বের শুরুও হতে পারে এ রায়।
অনেকে একে সিগারেট শিল্পের সেই ‘বিগ টোব্যাকো’ মুহূর্তের (যখন তামাক কোম্পানিগুলো প্রথম বড় আইনি ধাক্কা খেয়েছিল) সঙ্গেও তুলনা করেছেন।
যারা সারাদিন ফোনে নেতিবাচক খবর বা স্ক্রল করে সময় কাটান তারা হয়ত এই রায়ে খুব একটা অবাক হননি। তবে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিশ্চিতভাবেই বড় ধাক্কা খেয়েছে।
এ মামলা লড়তে গিয়ে মেটা ও গুগলকে মোটা অংকের আইনি খরচ গুনতে হয়েছে। এ মামলা ও এর মতো আরও অনেক মামলা যে তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা এখন স্পষ্ট।
এ বিচারের সঙ্গে জড়িত অন্য দুই কোম্পানি টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের মালিকরা আদালতে যাওয়ার আগেই বিষয়টি মিটমাট করে নিয়েছে। প্রযুক্তি অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে, আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের ছিল না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো শিশুদের সুরক্ষায়, বিশেষ করে অভিভাবকদের জন্য কত ধরনের টুল বা সুবিধা দিচ্ছে সে বিষয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ব্রিফিং হলেও শেষ পর্যন্ত আদালত রায় দিয়েছে, তাদের এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
ইনস্টাগ্রামের সাবেক কর্মী আরতুরো বেজার বলেছেন, বেশ কয়েক বছর আগেই তিনি মার্ক জাকারবার্গকে শিশুদের ওপর এর বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
বৃহস্পতিবার বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, “বিষয়টি এমন এক পণ্য থেকে রূপান্তরিত হয়েছে, যা আপনি ব্যবহার করতেন। আর এখন এটিই আপনাকে ব্যবহার করছে।”
তবে তার এই দাবি অস্বীকার করেছে মেটা।
কিছু বিশেষজ্ঞ এ রায়কে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য তামাক শিল্পের সেই ‘বিগ টোব্যাকো’ মুহূর্তের সাথে তুলনা করেছেন। সেই সময় তামাক শিল্পের কী অবস্থা হয়েছিল তা সবারই জানা। তবে সেই পদক্ষেপ মানুষকে ধূমপান থেকে পুরোপুরি বিরত করতে পারেনি।
এখন প্রশ্ন উঠেছে ফোনের স্ক্রিনেও কি স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা দেখা যাবে? বিজ্ঞাপন বা স্পনসরশিপের সুযোগ কি সীমিত হয়ে আসবে?
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ‘সেকশন ২৩০’ নামের এক আইনের কারণে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি আইনি সুরক্ষা পায়, যা তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত কোনো কনটেন্টের দায়ভার থেকে মুক্তি দেয়।
অন্যান্য মিডিয়া কোম্পানি এ সুবিধা পায় না। বলা হয়ে থাকে, এ সুরক্ষা ছাড়া প্রযুক্তি শিল্প টিকে থাকাই কঠিন। তবে এ সুরক্ষা কবচ নিয়ে এখন সন্দেহ বাড়ছে এবং বুধবার এ বিষয়ে মার্কিন সেনেট কমার্স কমিটিতে আলোচনাও হয়েছে।

প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বেশ সুসম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি এই খাতের প্রসারে ভূমিকা রেখেছেন।
তবে ট্রাম্পও এখনও পর্যন্ত এসব প্রযুক্তি কোম্পানিকে রক্ষায় এগিয়ে আসেননি।
আরেকটি সম্ভাবনা হচ্ছে, মানুষকে দীর্ঘক্ষণ অ্যাপে আটকে রাখার জন্য তৈরি করা এসব ফিচার সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হতে পারে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো।
তবে এ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাণশক্তি হচ্ছে ‘এনগেজমেন্ট’ বা ব্যবহারকারীদের সক্রিয় রাখা।
এসব কৌশল, যেমন একটানা স্ক্রলিং, অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পছন্দসই ভিডিও বা পোস্ট দেখানো ও অটো প্লে বন্ধ করে দেওয়া হয় তবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের অভিজ্ঞতা একদম বদলে যাবে এবং এর পরিধিও অনেক সীমিত হয়ে পড়বে।
বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর সাফল্য নির্ভর করে মানুষের আনাগোনার ওপর। যত বেশি সংখ্যক মানুষকে যত বেশিক্ষণ অনলাইনে আটকে রাখা যাবে এবং ব্যবহারকারীরা যতবার ফিরে আসবে তত বেশি তাদের কাছে বিজ্ঞাপন পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এভাবেই এসব কোম্পানি অর্থ আয় করে।
যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু অঞ্চলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নির্দেশ দিয়েছে শিশুদের এসব বিজ্ঞাপনের করা যাবে না।
তবে আজকের শিশুরাই আগামীর প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি। ফলে টেক কোম্পানিগুলোর আদর্শ লক্ষ্য, শিশুরা যেন ১৮ বছর হওয়ার আগেই নিয়মিত ব্যবহারকারী হিসেবে গড়ে ওঠে।
মেটার মালিকানাধীন কোম্পানি ফেইসবুককে প্রায়ই ঠাট্টা করে ‘বুড়োদের প্ল্যাটফর্ম’ বলা হয়। তবে ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে, বিশ্বজুড়ে এর প্রায় অর্ধেক ব্যবহারকারীর বয়সই ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
সামনে আরও চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর এমন আরও অনেক মামলার বিচার হওয়ার কথা রয়েছে এবং কেইলির এ জয় টেক জায়ান্টদের জন্য দ্বিতীয় বড় পরাজয়।
‘সিডনি ইউনিভার্সিটি’র ড. রব নিকোলস বলেছেন, “এ ঐতিহাসিক রায়টি থেকে ইঙ্গিত মেলে, প্ল্যাটফর্মের ডিজাইন বা কৌশলগুলো এখন আদালতের কাছে স্রেফ প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, বরং আইনি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।”
আদালতের এ রায় এখন সেসব সামাজিক মাধ্যম বা প্রযুক্তি সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথ খুলে দিয়েছে, যারা ব্যবহারকারীর মানসিক স্বাস্থ্যের বিনিময়ে কেবল নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ বা ‘এনগেজমেন্ট’ বাড়ানোর চেষ্টা করে।
ড. নিকোলসের দেশ অস্ট্রেলিয়া এরইমধ্যে এ পদক্ষেপ নিয়েছে। গেল ডিসেম্বরে দেশটি ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বড় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে।
যুক্তরাজ্যসহ আরও অনেক দেশ এখন এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে এবং আদালতের এ রায় তাদের সেই যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করল।
যেসব অভিভাবক এরইমধ্যে এ সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন তাদের কাছে শিশুদের জন্য এসব প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করা খুবই স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।
সম্প্রতি সন্তানহারা ব্রিটিশ মা এলেন রুম বলেছেন, “এখনই সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ কার্যকর করুন।”
২০২২ সালে অনলাইন চ্যালেঞ্জের শিকার হয়ে তার ১৪ বছর বয়সী ছেলে জুলস সুইনি মারা যায়। এরপর থেকেই তিনি সামাজিক মাধ্যমে পরিবর্তনের দাবিতে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন।
তবে এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত তা নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এখনও বিভক্ত।
‘চিলড্রেন’স স্কুল অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং বিল’-এর এক প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে হাউজ অফ লর্ডস ও হাউজ অফ কমন্স বর্তমানে তর্ক-বিতর্ক ও ফাইল চালাচালি করছে।
এ সংশোধনীর মাধ্যমে মন্ত্রীদের এক বছর সময় দেওয়া হবে নির্ধারণের জন্য যে, ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য কোন কোন প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করা উচিত।
আদালতের এ নতুন রায় এখন রাজনীতিবিদদের একমত হতে সাহায্য করবে। আর বিষয়টি কেবল যুক্তরাজ্যেই নয়, গোটা বিশ্বেই প্রভাব ফেলতে পারে।
মানুষ কি একদিন ইতিহাসের এই সময়ের দিকে ফিরে তাকিয়ে অবাক হবে যে, কেন তারা শিশুদের এভাবে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সামাজিক মাধ্যমে বিচরণ করতে দিয়েছিলেন?
ভবিষ্যতই এ প্রশ্নের উত্তর দেবে।
আরও পড়ুন…