Published : 22 Jul 2026, 12:58 AM
দেশে অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন বা ৭ লাখ ৬৩ হাজার কোটি ঘনফুট। আর দেশে চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে ১১৪ কোটি ঘনফুট।
ঘাটতি সামাল দিতে অতিরিক্ত দামে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও আমদানি নির্ভরতা ৯২ শতাংশ।
এর মধ্যে ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জেরে পশ্চিম এশিয়ায় সৃষ্ট অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় নতুন করে সামনে এসেছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন।
এ অবস্থায় দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোকে বড় পথ হিসেবে দেখছে সরকার। কিন্তু দেশীয় উৎসে গ্যাস অনুসন্ধান বা উৎপাদনে বাপেক্সের যে সক্ষমতা, সেটা আরো বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সংসদে দেওয়া মন্ত্রণালয়ের জবাব এবং সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির কার্যবিবরণীতে কূপ খনন, সাইসমিক জরিপ, ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনা, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, অনশোর-অফশোর বিডিং এবং জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দীন খানের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সংসদে জানান, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মজুদকৃত বা অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাস আছে ৭ লাখ ৬৩ হাজার কোটি ঘনফুট।
আটটি গ্রাহক শ্রেণিতে অনুমোদিত গ্যাস লোড অনুযায়ী, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের বর্তমান চাহিদা দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে সরবরাহ হয়েছে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট।

সে হিসাবে দৈনিক ঘাটতির পরিমাণ ১১৫ কোটি ঘনফুটের মতো। মন্ত্রণালয়ের তথ্য ধরে হিসাব করলে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ৩০ শতাংশ; সরবরাহ হচ্ছে চাহিদার ৭০ শতাংশের মতো।
জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জানায়, দেশীয় উৎসের পাশাপাশি দৈনিক প্রায় ৯০ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস আমদানির প্রয়োজন পড়ে।
কমিটির কার্যবিবরণীতে এপ্রিল-মে সময়ের এলএনজি আমদানি ব্যয়ের হিসাবও এসেছে। সেখানে বলা হয়, এপ্রিল মাসে ৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা। মে মাসে ১১টি কার্গো আমদানিতে ব্যয় ধরা হয় ৭ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা।
তখনকার তিন মাসের হিসাবে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ২২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আয় ১০ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা।
এলএনজি আমদানির এই ব্যয়ই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর যুক্তিকে সামনে আনছে।
১৫০ কূপে সরকারের ভরসা
সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা নিয়েছে। সংসদে দেওয়া মন্ত্রী বলেন, এর মধ্যে ২৮টি কূপের খনন ও ওয়ার্কওভার শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট কূপের জন্য ডিপিপি অনুমোদনসহ অন্যান্য কার্যক্রম মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা ও কোম্পানি পর্যায়ে চলমান।
বিশেষ কমিটির কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, এসব কূপের মধ্যে যেগুলোর খনন ও ওয়ার্কওভার শেষ হয়েছে, সেখানে প্রত্যাশিত ৩৩ কোটি ঘনফুট গ্যাসের বিপরীতে ২৫ কোটি ঘনফুট নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।
১৫০টি কূপ খনন শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে আরো অন্তত ১৮৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
নতুন কূপ খননের স্থান চিহ্নিত করতে সাইসমিক জরিপের কাজও হাতে নিয়েছে সরকার।

সংসদে সরকারের তরফে জানানো হয়, ব্লক-৭ ও ৯-এ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক সাইসমিক ডেটা আহরণ করে উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের কাজ চলছে।
হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনা গ্যাসক্ষেত্র সংলগ্ন ১ হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ত্রিমাত্রিক সাইসমিক ডেটা আহরণের কার্যক্রম শিগগির শুরু হবে।
এর বাইরে ভোলার চরফ্যাশনে ৬৬০ বর্গকিলোমিটার, জামালপুরে ৬৫০ বর্গকিলোমিটার, তিতাস, হবিগঞ্জ ও নরসিংদী গ্যাসক্ষেত্র সংলগ্ন ৬৩২ বর্গকিলোমিটার এবং লামিগাঁও, লালাবাজার, গোয়াইনঘাট, কৈলাশটিলা সাউথ ও ফেঞ্চুগঞ্জ ওয়েস্ট স্ট্রাকচারে ৮৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ত্রিমাত্রিক সাইসমিক জরিপের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বাপেক্সের সক্ষমতা কতটুকু
দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সকে শক্তিশালী করার কথা সরকারের পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। সংসদে দেওয়া জবাবে বলা হয়েছে, বাপেক্সের জন্য দুটি নতুন রিগ কেনার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে একটি ২ হাজার হর্স পাওয়ার এবং অন্যটি ১ হাজার ৫০০ হর্স পাওয়ার ক্ষমতার।
কিন্তু বিশেষ কমিটির বৈঠকে জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, অভিজ্ঞতার অভাবে বাপেক্স অফশোর বিডিংয়ে অংশ নিতে পারছে না। বাপেক্সকে শক্তিশালী করার জন্য একটি বিজনেস প্ল্যান করা হয়েছে। শুরুতে জয়েন্ট ভেঞ্চারে কাজ করা এবং কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বলেন, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে কূপ খননের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে ২ হাজার হর্স পাওয়ার ও দেড় হাজার হর্স পাওয়ার ক্ষমতার দুটি রিগ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে অর্থায়নকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন না তিনি। তার মতে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় কিছু ঘাটতি থাকলেও মূল বিষয় সময় ও প্রক্রিয়া।
আব্দুল মান্নান বলেন, “অর্থায়নের ঘাটতি বলা ঠিক হবে না। প্রযুক্তির ঘাটতি ধরেন একটু তো আছেই। বাপেক্স তো এতটা অভিজ্ঞতা এখনও ওভাবে অর্জন করেনি। আর এ কাজটা এত দ্রুত সময়ে করা যায় না।”
একটি কূপ খননে প্রায় এক বছরের মতো সময় লাগে জানিয়ে তিনি বলেন, মাটির নিচের গ্যাস নিশ্চিত করতে আগে জরিপ, সম্ভাবনা যাচাই ও সিদ্ধান্তের ধাপ পেরোতে হয়।
অনশোর বিডিংয়ের উদ্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “পরিকল্পনা আছে; বাস্তবায়নের পর্যায়ে গেলে তা দেখা যাবে।”
ভোলার গ্যাসের পথ কত দূর
ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সরকার ভোলা-বরিশাল-জাজিরা-মাওয়া-আমিনবাজার পাইপলাইন নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ কমিটির কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ভোলার গ্যাসকূপ থেকে বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা ১৮২ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে ১২২ এমএমসিএফডি সরবরাহ হচ্ছে এবং ৩০ এমএমসিএফডি উদ্বৃত্ত রয়েছে।
ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনতে তিনটি পাইপলাইন বসানোর পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো, ভোলা-বরিশাল, ভোলা-খুলনা ও ভোলা-ঢাকা। ভোলা-বরিশাল অংশের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে।
কমিটিকে জ্বালানি সচিব জানিয়েছেন, ভোলা থেকে বরিশাল পর্যন্ত ৯৬ কিলোমিটার সাব-সি পাইপলাইন নির্মাণে কমপক্ষে সাড়ে তিন বছর সময় লাগবে। এতে আনুমানিক ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।

সমুদ্রে ২৬ ব্লকে বিডিং
সমুদ্রে ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য গত ২৪ মে ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’ আহ্বান সংক্রান্ত বিড নোটিস প্রকাশের কথা সংসদে জানানো হয়েছে।
এর মধ্যে ১৫টি গভীর সমুদ্র এবং ১১টি অগভীর সমুদ্র ব্লক। সরকার বলছে, বিডিং সফল হলে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক সাইসমিক জরিপ এবং গ্যাসকূপ খনন করা হবে।
দেশের স্থলভাগের কিছু এলাকার জন্য অনশোর বিডিং রাউন্ড আহ্বানের প্রাথমিক কার্যক্রমও চলছে।
আমদানি চাপ কমাতে নিজস্ব গ্যাসে জোর
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের’ প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বাড়ানো জরুরি। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনেও জোর দিতে হবে।
“পৃথিবীর সব দেশই নিজেদের জ্বালানি উৎস কাজে লাগাতে চায়। বাংলাদেশেও নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকলে সেটি কাজে লাগানো উচিত।”
তার মতে, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ দিনের চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে রাতের চাহিদা, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতার জন্য গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা থাকবে।
“সেই গ্যাস দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গেলে আমদানি করা এলএনজি ও জ্বালানি তেলের ওপর চাপ কমবে,” বলেন শফিকুল আলম।